পরের দিন সকালে ঘুরতে ঘুরতে বেলা একটা নাগাদ টনি কবরখানায় ঢুকল। কিছু ফুল তুলে নিল। তারপর সার সার সমাধিগুলোর ওপর সেগুলো ছড়িয়ে দিল। সে অনুভব করল একটা স্নিগ্ধ বসন্তবাতাস যেন তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সে হাত জোড় করে অশরীরী আত্মাদের উদ্দেশে প্রণাম করল।
তারপর একটা গাছের তলায় গিয়ে বসল। ঘটনাগুলো ঘটার পর তার কাছে এখন অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে গেছে। বুঝতে পেরেছে মিস্টার গুর্গে আসলে একটা দুষ্ট প্রেতাত্মা। মানুষের রূপ ধরে তাদের, বিশেষ করে বাবার ক্ষতি করতে এসেছে। তাকেও সহ্য করতে পারে না। এখন কয়েকটি প্রশ্ন
১। কেন ক্ষতি করতে আসা? বাবা কী এমন অপরাধ করেছে? ২। বাবা কেন কাল ইদ্রিশ আলি লেনে গেল? ৩। আজ এতদিন পর এই বাগানবাড়িতে আসার পরই প্রেতহানা কেন? ৪। আর বাবাই বা কেন হঠাৎ এই বাগানবাড়িটা পছন্দ করল?
নাঃ সব প্রশ্নের মীমাংসা করা এখনই সম্ভব নয়। মাথাটা কিরকম গরম হয়ে উঠেছে। শরীরটা দুর্বল ঠেকছে। ও উঠে পড়ল।
এক জায়গায় দেখল অনেকগুলো নতুন কবর। অবশ্য অন্যগুলোর তুলনায় নতুন। এগুলো বাঁধানো নয়। বোধহয় এগুলো বেওয়ারিশ লাশ। সম্ভবত সমাজবিরোধীরা খুন করে রাতারাতি এই পরিত্যক্ত কবরখানায় পুঁতে দিয়ে গেছে।
হঠাৎ একটা কবরের কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। এটা অপেক্ষাকৃত নতুন কবর। কিন্তু মনে হলো যেন মাটিটা ফাঁপা। কেউ যেন মাটিগুলো সরিয়ে আবার পরে চাপিয়ে দিয়েছে।
এরকম কেন?
কেউ কি এখান থেকে মড়া তুলে নিয়ে গেছে? এরকম নাকি যায় কিছু লোক কঙ্কালের ব্যবসা করার জন্য। হয়তো তাই হবে।
তাহলে অন্যগুলো থেকে তোলেনি কেন?
হয়ত আগেই তোলা হয়ে গেছে।
হঠাৎ একটা বিশ্রী গ্যাস কবরটা থেকে উঠে এল। কিরকম যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাতাসটাও ভারী হয়ে উঠেছে। সেদিন যে ঘরে মিঃ গুর্গে ছিলেন সে ঘরে এইরকম ভারী বাতাস অনুভব করেছিল। কিন্তু এখানকার বাতাসটা যেন আরও তীব্র, আরও
এ কী দম বন্ধ হয়ে আসছে যে!
হঠাৎ তার নজরে পড়ল কবরের ওপরের মাটিগুলো যেন কাঁপছে। এখনই যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।
তখন বেলা দেড়টা। খাঁ খাঁ করছে কবরখানা। কাছে জনমানুষ নেই। একটা কাক বিকট চোখ করে তাকে দেখছে।
টনি কেমন ভয় পেল। গেটের দিকে এগোতে লাগল। কিন্তু পা দুটো এত ভারী লাগছে। কেন? আর কবচটা আবার হাত থেকে পড়ে যাবার জন্যেই যেন নেমে নেমে আসছে। কবচটা হাতের বাহুতে তুলে সে জোরে হাঁটতে লাগল। কিন্তু
কেউ কি তার পিছন পিছন আসছে? সে প্রাণপণে ছুটতে লাগল। ঐ তো ওদের বাড়িটা দেখা যাচ্ছে। টনি ছুটছে…ছুটছে…ছুটছে…
এত ছুটেও বাড়ি পৌঁছচ্ছে না কেন সে? হঠাৎই তার খেয়াল হলো সে কোথায় কত দূরে এসে পড়েছে। সামনে একটা খাল….একটা নৌকো..মনে হলো যেন কেউ নৌকোটার ওপর বসে আছে। নৌকোটা এগিয়ে আসছে তার দিকে। নৌকোতে যে রয়েছে সে আর কেউ নয়, স্বয়ং মিস্টার গুর্গে।
টনি বুঝতে পারল তার শরীরটা কেমন করছে।জ্ঞান হারাচ্ছে। কবচটা আবার বাহু থেকে কজিতে নেমে আসছে। ও প্রাণপণে সেটা ওপরের দিকে ঠেলে দিয়েই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল।
.
টনি কোথায় গেল?
বেলা দুটো বেজে গেল তবু টনি ফিরল না। মালতীর মন ছটফট করতে লাগল। কোথায় গেল ছেলেটা? এত বেলা পর্যন্ত তো বাইরে থাকে না। ওর কি তবে কোনো বিপদ হলো? বিপদ একটাই হতে পারে। আর সে কথা ভেবে তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
মালতী অনেক বার দরজায় দাঁড়িয়ে দেখল। কয়েকবার টনি টনি করে চেঁচিয়ে ডাকল। শেষে আর থাকতে পারল না। দরজায় তালা দিয়ে টনিকে খুঁজতে বেরোল।
টনির যাবার জায়গা একটাই–কবরখানা। সকালে-বিকালে ওখানেই যায়। গিয়ে বসে থাকে। বিদেহী আত্মারা নাকি তাকে ভালোবাসে। শুনলেও বুকের রক্ত জল হয়ে যায়।
মালতী সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কবরখানায় গেল। সারা জায়গাটা খুঁজল। কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া গেল না। এবার কি করবে? বাড়িই ফিরতে হয়। কিন্তু বাড়ি গিয়েও যদি দেখে টনি ফেরেনি? তাহলে? তখন কি করবে? কর্তাও বাড়ি নেই যে খোঁজ করে দেখবে। এমনিতে রাত করে ফেরে। তবে আজ পইপই করে বলে দিয়েছে যেন সন্ধের আগে বাড়ি ঢোকে। কিন্তু সন্ধের তত ঢের দেরি। এখন?
ভাবতে ভাবতে মালতী বাড়ি ফিরে এল। না, টনি ফেরেনি।
মালতী তালা খুলল। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল।
ঘরে ঢুকতেই কেমন হাঁপ ধরল। সারা ঘরে যেন কুয়াশার মতো হালকা ধোঁওয়া। ঘরে ধোঁওয়া এল কোথা থেকে?
ডাইনিং হলটা পেরিয়ে ডান দিকে টনির ঘর। টনির ঘরটা উঁকি দিয়ে দেখল। বৃথাই দেখা। দরজা তো তালাবন্ধ ছিল।
এবার সে নিজের ঘরে ঢুকতে গেল। থমকে দাঁড়াল। দরজায় শেকল দিয়ে গিয়েছিল না? তাহলে শেকল খুলল কে? দরজা হাট করে খোলা। তাহলে বোধহয় ভুল করেই দরজা খুলে রেখে গেছে।
মালতী ঘরে ঢুকল। এ কী! ট্রাঙ্ক স্যুটকেস খোলা পড়ে আছে। জিনিসপত্র লণ্ডভণ্ড।
কে করল এমন? চোর এসেছিল? নিশ্চয় চোর এসেছিল। টাকা-পয়সা খুঁজছিল। কিন্তু চোর ঢুকল কী করে? বাইরের দরজা তো তালাবন্ধ ছিল।
এ তো বড়ো অদ্ভুত ব্যাপার। দিন-দুপুরে চোর। চিৎকার করে লোক ডাকতে ইচ্ছে করল। কিন্তু লোক কোথায়?
মালতী কী করবে এই মুহূর্তে ভেবে পেল না। কিন্তু সে কেমন করে যেন বুঝতে পারল বিপদ এখনো কাটেনি। আরও কিছু ঘটতে যাচ্ছে। তখনই সে ঠিক করল বাড়িতে তার একদণ্ড একা থাকা উচিত নয়, বেরিয়ে যাবে। এই বলে ঘরের বাইরে আসতেই সে কাঠ হয়ে গেল। দেখল পর্দার আড়ালে ডাইনিং টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে মিস্টার গুর্গের পৈশাচিক মূর্তি।
