অগত্যা জনার্দন গড়গড় করে ঠিকানাগুলো বলে গেল।
ঠিকানাগুলো লক্ষ্মীনারায়ণ নোট করে নিল। তারপর বললে, আর?
আর নেই।
উঁহু। আরও আছে। খিদিরপুরের কাছাকাছি ওর আরও একটা ডেরা আছে না?
হ্যাঁ আছে। জনার্দন জানে রতিকান্ত প্রায়ই সেখানে গিয়ে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু ওর সে ঠিকানা কিছুতেই বলা যাবে না। জনার্দন মন শক্ত করে রইল।
কি হলো, বোবা হয়ে গেলে যে?
লক্ষ্মীনারায়ণের পাথরের মত ভোতা কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে জনার্দন ভড়কে গেল।
…বাবা, আমরা তো ডায়মন্ড হারবার রোডে এসে পড়েছি না?
হ্যাঁ।
একটা বাস এসে দাঁড়াল। ওরা উঠে পড়ল। মিনিট দশেকের মধ্যেই ওরা খিদিরপুর ব্রিজের কাছে এসে নামল।
টনি জিজ্ঞেস করল, বাবা, এই রাস্তাটা কোথায় গেছে?
এসপ্ল্যানেড।
এখান থেকে আমাদের গড়িয়ার বাড়ি কতদূর?
অনেক দূর।
কিসে করে যেতে হয়?
এসপ্ল্যানেড থেকে বাস আছে।
আর এদিকটা?
জনার্দন অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিল, এটা গেছে মেটিয়াব্রুজের দিকে।
ডকটা কোথায়?
ঐ দিকে।
বাবা, একদিন ডকটা দেখাবে?
জনার্দনের কাছে থেকে তখনই উত্তর পাওয়া গেল না।
জনার্দন কি ভাবছে?
ও বাবা!
অ্যাঁ।
ডকটা একদিন দেখাবে?
দেখাব।
ওখানে অনেক জাহাজ আছে, না?
হ্যাঁ।
টনি ফুটপাতে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক দেখতে লাগল। জনার্দন নিজের মনেই বলল, ইদ্রিশ আলি লেনটা যেন কোন দিকে?
একজনকে জিজ্ঞেস করল। সে বলতে পারল না। তারপর একটা পান-বিড়ির দোকানে জিজ্ঞেস করলে বলল, ডকের দিকে মিনিট দশেক হাঁটতে হবে।
জনার্দন হাঁটতে শুরু করল।
টনি জিজ্ঞেস করল, বাবা, ইদ্রিশ আলি লেনে কি আছে?
কিছু না। এমনিই।
টনি একটু ভাবল। এমনি এমনি কেউ একটা অচেনা রাস্তা খোঁজে? বাবা নিশ্চয় তাকে বলতে চাইছে না।
মিনিট পনেরো হাঁটার পর ডকের কিছু আগে একটা বাঁহাতি রাস্তায় ঢুকল। তারপর আরও কিছুদূর গিয়ে সরু একটা গলি। এটাই ইদ্রিশ আলি লেন। জনার্দন হিসেব করে দেখল এই রাস্তাটা ডায়মন্ড হারবার রোডের সমান্তরাল। অর্থাৎ ডায়মন্ড হারবার রোড থেকে খিদিরপুর না এসে বাঁ দিকেই এই রাস্তাটা। জানা ছিল না বলে এত ঘুরপথে আসা।
ইদ্রিশ আলি লেনের কাছে এসে জনার্দন দাঁড়িয়ে পড়ল। তখন সন্ধ্যে হয় হয়। জায়গাটা খুবই নির্জন। কিছু গরিব মুসলমানের বস্তি। কোনো যানবাহন নেই। লোক চলাচলও কম।
তুমি এখানে একটু দাঁড়াও। আমি আসছি।
কোথায় যাচ্ছ?
ঐ গলির মধ্যে আমার এক বন্ধু থাকত। সেই বাড়িটা একবার দেখতে ইচ্ছে করছে।
সে বন্ধু এখন নেই?
না। তুমি দাঁড়াও। আমি এখুনি আসছি।
জনার্দন টনিকে একলা দাঁড় করিয়ে রেখে গলির মধ্যে ঢুকল। টনি অবাক হলো।
গলিটা সরু। দুপাশে টালির ঘর। জনার্দন কিসের নেশায় যেন টালির ঘরগুলো দেখতে দেখতে চলল।
তারপর ডান দিকে একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। হ্যাঁ, এই তত পেয়ারা গাছটা। ঐ যে সিমেন্ট বাঁধানো রক। সামনেই দরজা। দরজায় শেকল ভোলা। কিন্তু তালা লাগানো নেই। ঘরটার পিছনে ঝোপঝাপ, তার পরে পোড়ো জমি।
হ্যাঁ, এই বাড়িটায় মাত্র একবার এসেছিল। পরিবেশটা ভালো লাগেনি। ওখানে যারা ছিল তারা ভদ্রলোকের সঙ্গে মেশার অযোগ্য। তাই আর সে এখানে আসেনি। আজ দুবছর পর জনার্দন এল। কেন এল তা সে নিজেও জানে না।
তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে। জনার্দন একবার এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে শেকলটা খুলল। ঝনাৎ করে লোহার শেকলটা দরজার ওপর আছড়ে পড়ল। দুহাতে দরজা ঠেলল জনার্দন। দুবছর আগে দেখা লক্ষ্মীনারায়ণের মুখটা মনে পড়ল জনার্দনের। সেই পাথরের মতো ভোতা মুখটা। জিজ্ঞেস করেছিল, খিদিরপুরে রতিকান্তর একটা ঠিকানা আছে না?
দরজাটা বিশ্রী শব্দ করে খুলে গেল। একটা ভ্যাপসা গন্ধ। ইস্! টর্চটা টনির কাছে রেখে এসেছে। টর্চটা থাকলে একবার জ্বেলে দেখত। কি দেখত? দেখবার আজ আর কি আছে?
কিছুই না। তবু
জনার্দন অন্ধকার ঘরে দুপা এগোল। আর সঙ্গে সঙ্গেই তার পা দুটো আটকে গেল। দেখল একটা ভাঙা চেয়ারে কেউ একজন বসে আছে।
জনার্দন স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। না পারছে এগোতে, না পারছে বেরিয়ে যেতে।
মিনিট দুই চুপ করে থেকে জনার্দন অতিকষ্টে দুটো কথা মাত্র উচ্চারণ করল, কে তুমি?
লোকটা উত্তর দিল না। উঠে দাঁড়াল। তারপর এক পা এক পা করে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মতো এগিয়ে আসতে লাগল। জনার্দন ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল। সেই ভয়াবহ মূর্তিটা তখন একেবারে কাছে এসে পড়েছে। জনার্দন পালাতে গেল কিন্তু অন্ধকারে দরজাটা খুঁজে পেল না।
এমনি সময়ে অন্ধকার ঘরে টর্চের আলো এসে পড়ল।
বাবা, এখানে কি করছ? বলে টনি এসে দাঁড়াল। তার হাতের কবচটা ভারী হয়ে উঠল। আর সোনার মতো জ্বলজ্বল করতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে মূর্তিটা জনার্দনকে ছেড়ে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
টনির সমস্ত শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। টর্চের আলোয় মুহূর্তের জন্য যাকে দেখল, কে সে?
ফেরার পথে জনার্দন একটি কথাও বলল না। শুধু বাড়ি ঢোকার মুখে ক্লান্ত স্বরে বলল, টনি, মাকে এসব কথা বোলো না।
টনি বলল, আচ্ছা।
.
পরিত্যক্ত কবরখানায় নতুন কবর
সেদিন রাত্রে টনি ভালো করে ঘুমোতে পারল না। কেবলই ইদ্রিশ আলি লেনের ঘটনাটা মাথায় ঘুরতে লাগল।
সেই পরিত্যক্ত টালির ঘরে লোকটা কে ছিল? ও কি মানুষ, না অন্য কিছু? ও কি বাবার জন্য অপেক্ষা করে ছিল? ও কি জানত বাবা ওখানে যাবেই? আর বাবাই বা হঠাৎ কেন ওখানে গেল, যাবার তো কথা ছিল না। সে বাবা বলে ঢোকামাত্র লোকটা পালালো কেন? এসব কথা নিয়ে কারো সঙ্গে আলোচনা করা যাবে না।
