এইভাবে ছ বছরের টনি তার কোল জুড়ে বসল।
আজ দেখতে দেখতে প্রায় সাত বছর কেটে গেছে। মালতীর ভয় ছেলেটা যেরকম উদাসী কোনোদিন সন্ন্যাসী হয়ে না যায়।
আর ঐ কবচটা? সত্যিই কি ওর তেমন কোনো গুণ আছে? তবে কবচটার কালো কারটা ক্রমশ পল্কা হয়ে যাচ্ছে। ওটা বদলাতে হবে।
কিন্তু আজ হঠাৎ টনির খিদিরপুর যেতে ইচ্ছে করল কেন? কর্তাও এককথায় রাজি হয়ে গেল। হয়তো কিছুই নয়। তবু
মালতীর কেমন ভয় করতে লাগল। এখানে এসে এই কদিনেই সে কিরকম যেন ভীতু হয়ে গেছে।
.
ইদ্রিশ আলি লেন
ধুলোভরা কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটছিল জনার্দন। ডায়মন্ড হারবার রোড একটু দূরে। সেখানে থেকে বাস ধরে তবে খিদিরপুর।
হ্যাঁ, খিদিরপুর!
তখনই তার আবার সেই দিনকার কথা মনে পড়ল।
…রতিকান্তর স্ত্রীর মৃত্যুর দিন দশেক পর জনার্দনের নিজস্ব ছোটোখাটো অফিসটায় ফোন বাজল।
হ্যালো।
আমি রতিকান্ত।
রতিকান্তর নামটা শুনেই জনার্দনের বুকটা ছ্যাৎ করে উঠেছিল। মনে হয়েছিল ও তো সর্বনাশের পথে এগিয়ে চলেছেই, তাকেও ঐ পথে টেনে নিয়ে যাবে।
ভয়ে ভয়ে বলল, কী বলছ বলো।
খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর এল, বিশেষ দরকার। আজ সন্ধেবেলায় তুমি আসবে।
এ যেন আদেশ। রতিকান্ত তার একমাত্র বন্ধু ঠিকই। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তার হাত থেকে নিস্তার পেলেই বাঁচে। কিন্তু অত সহজে নিস্তার পাওয়া যায় না। এদিক দিয়ে সে দুর্বল প্রকৃতির।
যথাসময়ে জনার্দন গেল। দরজা ভালো করে বন্ধ করে দিয়ে রতিকান্ত গম্ভীর মুখে একটা চিঠি বের করে দেখাল। চিঠিটা লিখছে ওর একমাত্র ছেলে বাসু।-তোমার কাছে থাকতে আর ইচ্ছে করে না। তোমার ড্রয়ারে টাকা ছিল। নিয়ে চললাম। আমার খোঁজ করা বৃথা চেষ্টা।
যাঃ! ছেলেটাও কেটে পড়ল। বৌ তো আগেই মরেছে। তাহলে তুমি তো এখন মুক্ত পুরুষ হে!
না জনার্দন, বৌ গেছে যাক। কিন্তু ছেলেটাই আমার সব ছিল। ও ওর মায়ের মৃত্যুর জন্যে আমাকেই দায়ি করেছে। সে যাই হোক, এখন বলি যে জন্যে তোমায় ডাকা। ব্যাপারটা খুব গোপনীয়। বিশ্বসংসারে একমাত্র তুমিই জানবে।
একটু থেমে বলল, এদিকে আমি আর একটা ব্যাপারে ফেঁসে গেছি। পুলিশ এখনও টের পায়নি। পেলেই আমায় ধরবে। এখন তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। তাই
এমনি সময়ে দরজায় কড়া নাড়া। রতিকান্তর মুখ শুকিয়ে গেল। পুলিশ?
দরজা খোলো।
না পুলিশ নয়। এ গলা লক্ষ্মীনারায়ণের। সাক্ষাৎ যমদূত।
রতিকান্ত ফিসফিস করে বলল, তুমি আজ যাও। কাল এই সময়ে অবশ্য আসবে।
জনার্দন বেরোতেই লক্ষ্মীনারায়ণের সঙ্গে মুখোমুখি। কটমট করে জনার্দনের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনারায়ণ বলল, তুমিই ছিলে এখানে! এতক্ষণ কী শলাপরামর্শ হচ্ছিল? শায়েস্তা করে দেব। বলেই লক্ষ্মীনারায়ণ লাথি মেরে দরজাটা ভালো করে খুলে ঘরের মধ্যে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
শায়েস্তা করে দেব কথাটা তখনও জনার্দনের কানের কাছে বিশ্রী শব্দ করে ঘুরছিল। বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠল। তবু, সে চলে গেল না। কী কথা হচ্ছে জানার জন্যে দরজায় কান পেতে রইল।
সব কথা শোনা গেল না। মাঝে মাঝে রাগের মাথায় চেঁচিয়ে যে কথাগুলো বলছিল সেগুলোই শুনতে পেল। যেমন–তুমি পালাবার মতলব করেছ? আগে আমার সব টাকা একেবারে শোধ করো নইলে তোমার কাছে যে জিনিসটা আছে ওটা আমায় দাও।
ওটা আমার কাছে নেই।
কোথায়?
বাসু নিয়ে গেছে।
কোথায় গেছে?
জানি না।
মিথ্যে কথা।
মা কালীর দিব্যি।
জিব ছিঁড়ে ফেলে দেব। বলো সেটা কোথায়?
বলছি তো আমার কাছে নেই। ইচ্ছে করলে খুঁজে দেখতে পারো।
ঠিক আছে। সাত দিন পর আবার আসব। তোমার ছেলের কাছেই রাখ আর তোমার ঐ জনার্দনের কাছেই রাখ, সেদিন ওটা আমার চাই। নইলে লাশ ফেলে দেব…
জনার্দনের শরীর কেঁপে উঠল। তাড়াতাড়ি পালিয়ে এল।
পরের দিন সন্ধ্যায় কথামতো দুরুদুরু বক্ষে জনার্দনকে যেতে হলো। রতিকান্ত অপেক্ষা করছিল। তার ঝোড়ো কাকের মতো বিভ্রান্ত অবস্থা দেখে জনার্দন ভয় পেল।
সময় সংক্ষিপ্ত। যে কোনো মুহূর্তে লক্ষ্মীনারায়ণ হানা দিতে পারে। তাই কথা না বাড়িয়ে একটা পেতলের বাক্স খুলে বার করল একটা সোনার মুকুট। আলো পড়ে মুকুটটা ঝলমল করে উঠল। জনার্দনের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় রতিকান্ত বলল, এটা আমাদের বংশের মুকুট। এটার ওপর লক্ষ্মীনারায়ণের শকুনির দৃষ্টি। তোমায় বিশ্বাস করে এটা রাখতে দিলাম। খুব সাবধানে রাখবে। আমার ছেলে ফিরে এলে তাকে দেবে।
একটু থেমে বলল, আর একটা কথা, আমার গোপন ডেরা একমাত্র তুমিই জানো। যত চাপেই পড় না কেন সেখানকার ঠিকানা কাউকে দেবে না। বিশ্বাসঘাতকতা করলে বন্ধু বলে খাতির করব না।
শপথ করে জনার্দন মুকুট নিয়ে চলে এসেছিল। দিন চারেক পরে তার গড়িয়ার বাড়িতে স্বয়ং লক্ষ্মীনারায়ণ এসে হাজির। জনার্দনের বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল।
তোমার বন্ধু পালিয়েছে। তুমি জান ও কোথায় গেছে?
না।
ওর ছেলে কোথায় জান?
না।
জানি এই উত্তরই তুমি দেবে। ঠিক আছে। আমি মানলাম তুমি কিছুই জান না। এখন বল দিকি ও কোথায় কোথায় থাকতে পারে।
জনার্দন বলতে চায়নি। কিন্তু লক্ষ্মীনারায়ণ খুব অল্প কথার মানুষ। ঠান্ডা মাথায় বললে, জনার্দন, বৌ ছেলে নিয়ে ঘর কর। শুধু শুধু জীবন বিপন্ন করবে কেন? ঠিকানাগুলো দাও।
