বাবা, কোথায় যাচ্ছ?
জনার্দন কেমন থতমত খেয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, আমি? না, আমি তো কোথাও যাইনি।
টনি হেসে বলল, যাওনি কী? এই তো যাচ্ছ?
জনার্দন ফ্যালফ্যাল করে চারিদিকে তাকাল। যেন বুঝতে পারল না কোথায় যাচ্ছে।
কি হলো? দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? চলো।
জনার্দন যেন ঘুমের ঘোরের মধ্যে বলল, কোথায়?
টনি হাসল। বলল, যেখানে যাচ্ছিলে, কবরখানায়। দেখবে কী চমৎকার জায়গা।
হঠাৎ জনার্দন চমকে উঠল। ভয়ানক ভয় পেল। চেঁচিয়ে বলল, না না, আমি ওখানে যাব না। বলেই হনহন করে বাড়ির দিকে ফিরে চলল।
টনি অবাক হয়ে ভাবতে লাগল বাবার হলো কী! কেনই বা অফিস যাব বলে বেরিয়ে কবরখানার দিকে যাচ্ছিল, কেনই বা অমন করে ফিরে যাচ্ছে? যাই হোক সেও বাবার পিছুপিছু রাড়ি এসে ঢুকল।
সে রাত্রেও ওরা ভয়ে ভয়ে বিছানায় শুলো। না জানি আজ আবার কোনো শব্দটব্দ শোনা যায় কিনা।
না, তেমন কিছু হলো না। মাঝে মাঝে শুধু পিছনের মাঠে একটা বেড়ালের কান্না শোনা যাচ্ছিল। তারপর একসময়ে তাও থেমে গেল। এক ঘুমেই রাত কাবার। সকালে জনার্দন চুপচাপ তার কাজ করল। কিন্তু বড়ো গম্ভীর। বেলা বারোটার মধ্যে নাওয়া-খাওয়া শেষ। তারপরেই জনার্দন ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
মালতী জিজ্ঞেস করল, আজও কাজে যাবে না?
জনার্দন বললে, না, শরীরটা ভালো নেই। বলে পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করল।
….একদিন গভীর রাতে জনার্দনের গড়িয়ার বাড়ির দরজায় টোকা পড়ল।
এত রাতে কে এল? জনার্দন ভয় পেল। তবু সে সাবধানে বেরিয়ে এল। দরজা খুলে দেখল রতিকান্ত।
আমার খুব বিপদ। তুমি শিগগির এসো।
বাড়িতে কিছু না বলে সে তখনই রতিকান্তর সঙ্গে বেরিয়ে এল। একটু ভয়-ভয় করছিল। কী এমন বিপদ যে এত রাত্রে তাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে? লক্ষ্মীনারায়ণের মুখোমুখি হতে হবে না তো?
রতিকান্তর বাড়ি এসে জনার্দন দেখল রতিকান্তর বৌটা মরে পড়ে আছে। ভীষণ ভয়ে সে বলে উঠল, এ কী কাণ্ড!
চুপ করো। একটি কথাও জিজ্ঞেস করো না। এখন বলল কি করা উচিত।
জনার্দন সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোমার ছেলে কোথায়?
জানি না। আমাদের অশান্তির জন্যে দুদিন বাড়ি ঢোকেনি। যাই হোক এখন যা করার তুমি করো।
একটু থেমে বলল, জানই তো আমি মোটেই পুলিশের সুনজরে নেই। ব্যাটারা আমাকে দেখলেই পাকড়াবে। তারপরে ঘরে বৌয়ের লাশ দেখলে আর রক্ষে নেই। একেবারে কঁসিকাঠের ব্যবস্থা পাকা হয়ে যাবে।
রতিকান্ত আবার একটু থামল। তারপর বলল, ঐ পাসটা রাখো। টাকা আছে। ঐ দিয়ে লাশটার গতি করো।
হ্যাঁ, বন্ধুর জন্যে জনার্দন চমৎকারভাবে সব ম্যানেজ করল। কাকপক্ষীতে টের পেল। তারপর
মালতী এসে বলল, ওঠো ওঠো। চা হয়ে গেছে।
জনার্দন ধীরে ধীরে উঠে চায়ের টেবিলে গিয়ে বসল।
টনি বলল, আজও অফিস গেলে না। কি হয়েছে?
শরীরটা ভালো নেই।
চলো একটু বেড়িয়ে আসি। তাহলেই শরীর ঠিক হয়ে যাবে।
কোথায় যাবি?
খিদিরপুর চলো না। জায়গাটা আমি দেখিনি। ওখানে ডক আছে। না?
খিদিরপুর শুনেই জনার্দন চমকে উঠল। তারপর কী ভেবে বলল, আচ্ছা, চলো।
চা খেয়ে দুজনে বেরিয়ে যাচ্ছিল, মালতী জনার্দনের হাতে টর্চটা দিয়ে বলল, এটা রাখো। আর তাড়াতাড়ি ফিরো। বাড়িতে আমি একা।
তবে থাক। যাব না।
মালতী তাড়াতাড়ি বললে, না না, ঘুরে এসো। সবসময়ে তো বাড়িতেই বসে আছ।
.
চন্দনপুরের পাদ্রীবাবা
বিকেলে জনার্দন আর টনি বেরিয়ে গেল। মালতী লক্ষ্য করল মানুষটা আজ বড়ো অন্যমনস্ক। সবসময়ে কী যেন ভাবছে। অবশ্য ভাবাটা কিছু অস্বাভাবিক নয়। গুর্গে নামে লোকটা সবাইকেই ভাবিয়ে তুলেছে। সবচেয়ে ভয়ের কথা লোকটার আচরণ। পরশু রাতদুপুরে কেন লোকটা তাদের শোবার ঘরের দরজার কাছে এসে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়েছিল? বাথরুম খুঁজছিল এটা মিথ্যে কথা।
আর টনি? টনিকে নিয়েই এখন তার যত দুর্ভাবনা। বড্ড বেশি সাহস ওর। আর বড্ড বোকা। নইলে ঐ লোকটা গাড়ি ঠেলবার জন্যে ডাকতেই যেতে চাওয়া উচিত হয়েছিল? তার মায়ের প্রাণ অশুভ কিছু ঘটবে টের পেয়েছিল। তাই আটকে ছিল।
হ্যাঁ, মায়ের মন……
.
শূন্য সংসারে যখন বুকচাপ কান্না গুমরে গুমরে উঠত তখনই বুঝি ভগবান মুখ তুলে চাইলেন। চন্দনপুর গ্রামে শিবের মেলায় সন্তানকামনায় হত্যে দিতে গিয়েছিল একাই। ফেরার পথে যখন জল তেষ্টায় কাতর তখন এক বৃদ্ধ পাদ্রীর সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, মা, আমি খ্রিস্টান। তুমি হিন্দু নারী। পুজো দিয়ে ফিরছ। আমার হাতে কি জল খাবে?
সে হেসে বলেছিল, বাবা, জল-বাতাস তো ঈশ্বরের দান। মানুষের হাতে কি তার পবিত্রতা নষ্ট হতে পারে?
পাদ্রী খুশি হয়ে তাকে নিজের কোয়ার্টারে নিয়ে গেলেন। সেখানেই প্রথম দেখল টনিকে। এক নজরেই মায়া পড়ে গেল। তারপর যখন শুনল ওর মা-বাবা কেউ নেই, কেউ তাকে চার্চের চাতালে ফেলে রেখে গিয়েছিল তখন সে তাকে চাইল।
পাদ্রী খুশি হয়ে বললেন, ছেলেটি খুবই ধর্মপ্রাণ। এইটুকু ছেলের ঈশ্বরভক্তি দেখে আমি অবাক হই। এই ছেলে বড়ো হলে একদিন যদি মহাপুরুষ হয়, আমি আশ্চর্য হবো না, তবে মা, আমি বুড়ো হয়েছি। কবে মরে যাব, কে তখন ওকে দেখবে ভেবে দুশ্চিন্তায় থাকি। এখন তুমি যখন ওকে নিতে চাইছ তখন আমি নিশ্চিন্ত।
তারপর তার হাতের কবচটা দেখিয়ে বললেন, এই কবচ ওকে কে দিয়েছিলেন জানি না। তবে এটা সাধারণ কবচ নয়। ঐ দ্যাখো কবচে একটা পঞ্চশূল আঁকা। এই চিহ্ন আগে তান্ত্রিকরা ব্যবহার করতো। যাই হোক দেখো, এই কবচ যেন ও কখনো না খোলে। এটা সম্ভবত ওকে অনেক বিপদ থেকে রক্ষা করবে। আর মাঝে মাঝে ওকে নিয়ে আমার কাছে আসবে। মন খারাপ করলে ওকে দেখতে ইচ্ছে করবে। তোমার ঠিকানাও রেখে যাও।
