একবার টনি ভাবল বলে ফেলে সাবধান হও। সামনে ভয়ঙ্কর বিপদ। কিন্তু বলল না। বলে লাভ নেই। বাবা বিশ্বাস করবে না। বিমর্ষ মনে টনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
টনি চলে গেল কিন্তু জনার্দন আর কাজে মন বসাতে পারল না। তার কেবলই মনে হতে লাগল কেন টনি ঐ কথা বলল। গুর্গেকে সে সত্যিই চেনে না। কখনো ঐ রকম কাউকে দেখেনি। গুর্গেই বা তাকে চিনবে কী করে? তবু কেন টনি ও কথা বলল? কিসে তার ঐরকম উদ্ভট চিন্তা মাথায় এল?
জনার্দন গুম হয়ে বসে ভাবতে লাগল। গড়িয়ায় নিজের বাড়িতে এতকাল থেকেছে, নিজের কন্ট্রাক্টরি কাজ নিয়ে অনেকের সঙ্গেই মেলামেশা করতে হয়েছে। কিন্তু মনে রাখার মতো ঘনিষ্ঠ লোক…হা, দুজন ছিল।
মনে পড়ল, প্রায় দুবছর আগে একদিন
সন্ধেবেলায় গড়িয়ার বাড়িতে একটি ছেলে এল। ছেলেটির বয়স আঠারো-উনিশ। সুন্দর স্বাস্থ্য, ফর্সা রঙ, মুখে শান্ত ভাব। তাকে দেখে জনার্দন অবাক হলো।
কাকে চাই?
আপনাকে।
আমাকে! আমাকে তুমি চেন?
ছেলেটির মুখে হাসি নেই। যেন এক বোঝা দুশ্চিন্তা মাথায় করে এসেছে। বলল, আপনি তো জনার্দনবাবু। আমার বাবা রতিকান্ত–
ও! আচ্ছা, তুমি রতিকান্তর ছেলে? বেশ বেশ। আমি তো কখনো তোমায় দেখিনি।
কিন্তু আমি আপনাকে দেখেছি অনেকবার। আমাদের বাড়ি গিয়ে বাবার সঙ্গে দরজা বন্ধ করে গল্প করতেন।
জনার্দন একটু থতমত খেয়ে গিয়েছিল। সামলে নিয়ে বলল, হ্যাঁ, ও-ই আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে ওর ঘরে বসাতো। বিজনেসের কথাবার্তা হতো। তা বলো কী ব্যাপার?
কাকাবাবু, বাড়িতে বাবা-মার মধ্যে কেবলই ঝগড়া অশান্তি হচ্ছে। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে কোনোদিন কিছু একটা বড়ো ধরনের বিপদ ঘটে যাবে।
জনার্দন একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিচু গলায় বললে, তোমার কাকিমা এখন ব্যস্ত। চা খাওয়াতে পারছি না। তাছাড়া এসব ব্যাপার বাড়িতে আলোচনা করা ভালো নয়। চলো, রাস্তায় দাঁড়িয়ে শুনি।
দুজনে রাস্তায় নেমে একটা নিরিবিলি জায়গায় এসে দাঁড়াল।
তা আমায় কী করতে বল?
আপনি বাবার একমাত্র বন্ধু। বাবাকে বোঝান যেন মায়ের ওপর অত্যাচার না করে।
তা না হয় বলব। কিন্তু কেন অত্যাচার করে তা তো জানি না।
ছেলেটি এবার চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালো। কাকু, সত্যিই কি আপনি জানেন না?
জনার্দন ঢোঁক গিলে বলল, না, ঠিক জানি না। তা ছাড়া অন্যের পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে
বাবা যে লোক ভালো নয় তা তো জানেন। বাবার অনেক কুকীর্তি আছে। মা তা সহ্য করতে পারে না। তারপর লক্ষ্মীনারায়ণ আবার আমাদের বাড়িতে যাওয়া-আসা শুরু করেছে।
লক্ষ্মীনারায়ণ!
জনার্দনের মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। ছেলেটার তা লক্ষ্য এড়াল না। বলল, লক্ষ্মীনারায়ণকে তাহলে আপনিও চেনেন?
হ্যাঁ, চিনি বৈকি। সে তো সাংঘাতিক লোক?
সেই লক্ষ্মীনারায়ণ বাবাকে একেবারে হাতের মুঠোর মধ্যে পুরে ফেলেছে। বাবা বোধহয় অনেক টাকা ধার করেছে ওর থেকে।
শোধ করছে না?
করছে অল্প অল্প করে। কিন্তু
থামলে কেন? বলো।
আসলে লক্ষ্মীনারায়ণের মতলব অন্যরকম। আমাদের বাড়িতে একটা খুব মূল্যবান জিনিস আছে। সেটা লক্ষ্মীনারায়ণ হাতাতে চায়। কিন্তু মা প্রাণ থাকতে তা দেবে না। বাবা প্রাণের দায়ে সেটা লক্ষ্মীনারায়ণকে বেচে দিতে চায়।
.
…এ কী ঘুমোচ্ছ! অফিস যাবে না? জনার্দন যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল। এমনি ভান করে তাকাল।
ওঃ তাইতো অনেক বেলা হয়ে গেছে। কাল রাত্তিরে ভালো ঘুম হয়নি। তাই
আজ হবে তো? ম্লান হাসল মালতী। তিনি তো আবার আসবেন বলে গেছেন।
জনার্দনের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
.
আরও রহস্য
গুর্গে নামে লোকটা চলে যাবার পর টনি ঐ ঘরটায় ঢুকল। ভাবল ঘরে তেমন কিছু পাওয়া যায় কিনা দেখতে হবে। সে তন্নতন্ন করে সারা ঘর খুঁজছিল। কিন্তু গত রাত্রে যে এই ঘরে কেউ ছিল তার কোনো চিহ্ন দেখতে পেল না। তবে একটা জিনিস অনুভব করল ঘরের ভেতরের বাতাসটা যেন বড্ড ভারী। আর গুমোট ভাব। দম আটকে আসে। অথচ এই ঘরে সে তো আগেও এসেছে, তখন এমন মনে হয়নি।
ফিরে আসবার সময়ে হঠাৎ ওর কী খেয়াল হলো চৌকির তলাটা হেঁট হয়ে দেখল। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠল। ওগুলো কী? অর্ধেক মেঝে জুড়ে কালো কালো কী নড়ে বেড়াচ্ছে?
ভালো করে ঠাওর করে দেখল একঝাঁক মাছি। এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘরে এত মাছি এল কোথা থেকে?
গা-টা শিউরে উঠল টনির। সবই মিলে যাচ্ছে–কেন বিছানা থাকতেও মাটিতে ধুলোয় শোয়, কেনই বা তার শোবার জায়গায় মাছি ভনভন করে!
টনি সকালের চ-জলখাবার খেল। কিন্তু খুবই অন্যমনস্ক। কিছুতেই মন শান্ত করতে পারছে না। লোকটা সত্যিই কি প্রেতাত্মা? মানুষের চেহারা ধরে এসেছে তাদের ক্ষতি করতে? ঠিকমতো জবাব পায় না।
মনটা এরকম উতলা হলেই ও চলে যায় কবরখানায়। ওখানে নিরিবিলিতে বসে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে পারে। আজও তাই সে কবরখানার দিকে চলল।
কবরখানার কাছাকাছি যখন গিয়েছে তখন দেখল একটা লোক কবরখানার দিকে যাচ্ছে। খুব আশ্চর্য হলো। যে কবার সে এখানে এসেছে কখনো সে কাউকে এদিকে আসতে দেখেনি। এ আবার কে?
আরও একটু এগোতেই সে চমকে উঠল। বাবা!
টনি খুব খুশি হলো বাবাকে কবরখানার দিকে যেতে দেখে। সে অমনি ছুটল। কাছে গিয়ে ডাকল, বাবা!
জনার্দন চমকে পিছন ফিরে তাকাল।
