তা সে কখনো খোলেনি। তবে সে মাঝে মাঝে লক্ষ্য করত লোহার কবচটা কিরকম সোনার মতো জ্বলজ্বল করছে। তখনই তার মাথাটা কিরকম ঝিমঝিম করে উঠত। তারপর আবার ঠিক হয়ে যেত। সে এও লক্ষ্য করেছে যখনই কোনো বিপদে পড়েছে তখনই ওটা রঙ বদলাতো। বিপদ কেটে গেলে আবার আগের মতো ম্যাড়ম্যাড়ে লোহা।
তারপর একদিন
ঘড়িতে ঢং ঢং করে একটা বাজল। বাইরে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। হঠাৎ তার মনে হলো লোকটা তো পাশের ঘরেই আছে। কী করছে দেখা যাক।
টনি বিছানা থেকে উঠল। পার্টিশনটা অনেক ফঁকফোকর। সেই ছিদ্র দিয়ে ঘরের মধ্যে দেখতে লাগল। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। শুধু অন্ধকার। সে অন্ধকারটাও কেমন ভয়ঙ্কর। মনে হলো ঘরভর্তি যেন আলকাতরা ঠাসা।
একটু পরে অন্ধকারে যখন দৃষ্টি সয়ে গেল তখন সে দেখে অবাক হলো–বিছানায় কেউ নেই।
লোকটা গেল কোথায়? অথচ দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ।
আশ্চর্য! লোকটা ঘর থেকে উবে গেল নাকি? ম্যাজিক-ট্যাজিক জানে?
হঠাৎ সে চমকে উঠল। দেখল মাটিতে কিছু একটা যেন নড়ছে। ফুটোর ওপর আরও ঝুঁকে পড়ল টনি। তখনই যে দৃশ্যটা দেখল তাতে সে ভয়ে শিউরে উঠল।
দেখলো খাটের তলা থেকে কেউ যেন গড়িয়ে গড়িয়ে বেরিয়ে আসছে।
হ্যাঁ, সে মিস্টার গুর্গে।
কিন্তু বিছানা থাকতে চৌকির নিচে মাটিতে শুয়েছিল কেন?
এই কথাটা মনে হতেই তার যেন শিরদাঁড়া বেয়ে একটা বরফের স্রোত বয়ে গেল।
বুঝতে পারল লোকটা তাহলে ধুলোতেই শোয়। তার ঐ যে দেহটা, ওটা বিছানায় শোবার জন্য নয়।
টনির মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। মনে হলো এখনি অজ্ঞান হয়ে যাবে। কিন্তু অসাধারণ মনের জোরে সামলে নিল। দেখতেই হবে লোকটা কী করে?
লোকটা উঠে দাঁড়াল। তার গায়ে এখনও সেই সন্ধের পোশাক। শুধু ওয়াটারপ্রুফটা যেন একটু বেশি দীর্ঘ বলে মনে হচ্ছে।
লোকটা দরজা খুলে ভেতরের ডাইনিং হলের দিকে এগোতে লাগল। তার অস্বাভাবিক লম্বা ওয়াটার প্রুফটার একটা অংশ মাটিতে লুটোচ্ছে।
কিন্তু একী! লোকটা বাবার ঘরের দিকে যাচ্ছে। তার প্রতি পদক্ষেপ একটা অস্বাভাবিক শব্দ হচ্ছে খস্ খস্ খস্।
লাফিয়ে উঠল টনি। সোয়েটারটা গায়ে দিতে গেল আর তখনই কবচটা তার বাহুতে খচ করে লাগল। লোহার কবচটা ধীরে ধীরে রঙ বদলাচ্ছে।
বুকে অমিত সাহস নিয়ে টনি বেরিয়ে এল ঘর থেকে। এসে দাঁড়াল একেবারে সেই লোকটার সামনে।
আঙ্কেল!
চমকে ফিরে তাকাল মিস্টার গুর্গে। দুচোখে যেন আগুন ঝরছে।
আঙ্কেল, আপনি এত রাতে এখানে?
বাথরুমটা—
বাথরুম তো আপনার ঘরের পাশেই। মা তো দেখিয়ে দিয়েছে।
ও! ঠিক আছে। বলে টনির দিকে বিষাক্ত তীরের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল।
ঠিক তখনই দরজা খুলে বেরিয়ে এল টনির মা। কি হয়েছে টনি?
কিছু না। তুমি ঘুমাও গে।
.
দু’বছর আগের একটি ঘটনা
ভোরবেলা।
তখনও জনার্দন ওঠেনি। টনির মা অতিথির জন্যে চায়ের জল চাপিয়ে দিয়েছে। একটা দীর্ঘ কালো ছায়ার মতো মিস্টার গুর্গে এসে দাঁড়াল বেশ একটু তফাতে। সন্ধেবেলার সেই একই পোশাক। ওয়াটাবপ্রুফটা শুধু কাঁধের ওপর একটা বিরাটাকার মরা শকুনির মতো ঝুলছে।
আমি এখন যাচ্ছি। খসখসে গলায় বলল গুর্গে।
সে কি! চা খেয়ে যাবেন না?
না।
এই সময়ে জনার্দন ঘুম চোখে বেরিয়ে এল। টনিও এসে দাঁড়িয়েছে। তার কৌতূহলের শেষ নেই।
চললেন নাকি? জনার্দন জিজ্ঞেস করল।
গুর্গে বিশ্রীভাবে মিনিটখানেক তাকিয়ে রইল জনার্দনের দিকে। তারপর বলল, হ্যাঁ। আবার আসছি। দেখা হবে। কাজ বাকি আছে।
কী কাজ আর জানতে চাওয়ার সাহস হলো না জনার্দনের।
একটা অভদ্র দুর্বিনীত লোকের মতো গুর্গে বেরিয়ে যাচ্ছিল, টনিকে দেখে বলল, এই যে তুমিও রয়েছ। আমার সঙ্গে এসো তো। খালের ধারে আমার গাড়িটা রয়েছে। একটু ঠেলার দরকার হবে।
লোকটার একটু উপকার করার জন্য টনির মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠল। তা ছাড়া ভাবল লোকটাকে হয়তো ভালো করে জানাও যাবে, কী তার উদ্দেশ্য। তাই সে রাজি হলো। মা তখন রান্নাঘরে। ইচ্ছে করেই মাকে কিছু বলল না। হয়তো মা যেতে দেবে না।
কিন্তু মায়ের প্রাণ, হঠাৎ অজানা একটা ভয়ে ছটফট করে উঠল। এদিকে টনি তখন দরজা খুলে গুর্গের পিছু পিছু বেরোচ্ছে, তার হাতের কবচটা রঙ বদলাচ্ছে। কবচটা কেমন ভারী হয়ে উঠছে।
এখন হচ্ছে কেন? টনির মনে দুশ্চিন্তা। তবে কি কোনো বিপদ
আর তখনই ওর মা ছুটে এসে ডাকল, টনি, কোথায় যাচ্ছ? সকালবেলা পড়াশোনা নেই?
অগত্যা টনিকে ফিরতে হলো। একবার পিছন ফিরে দেখল মিস্টার গুর্গে যেন একটা বাজ-পড়া তালগাছের মতো জ্বলছে।
গত রাতে গুর্গের ঘরে উঁকি মেরে দেখে টনির যা অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে তার সংশয় আরো বেড়ে গেল। লোকটা যেই হোক, গভীর রাতে বাবার শোবার ঘরের দরজার পাশে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে ছিল কেন? তবে কি বাবার ওপর আক্রোশ আছে? কিসের জন্য আক্রোশ? টনি ঠিক করল এটার একটা ফয়শালা করতে হবে।
বেলা নটা। জনার্দন তার ঘরে বসে কী সব হিসেবপত্র করছিল, টনি এসে দাঁড়াল।
একটা কথা জানতে ইচ্ছে করছে। বলবে?
জনার্দনের মেজাজটা ভালো ছিল না। ভুরু উঁচিয়ে টনির দিকে তাকালো।
তুমি কি ওই লোকটাকে চেনো?
ঐ লোকটাকে? না, কখনোই না।
মিস্টার ওর্গে যেন তোমায় চেনে বলে মনে হলো।
কী সব পাগলের মতো বকছ! যাও! কাজ করতে দাও।
