টনি একটা অদ্ভুত কথা বলল, জান মামণি, আমি গেলে ওরা খুব খুশি হয়। আমার সঙ্গে ওরা ইশারায় কথা বলে।
না না, ওখানে খবরদার যাস নে।
কিন্তু টনি শোনে না। শুধু হাসে। সত্যিই ছেলেটা অদ্ভুত।
পাদ্রীবাবা বলেছিলেন, এর দিকে নজর রেখো। ওর অযত্ন করো না। ও অন্য ধরনের ছেলে।
অনেকদিন পর পাদ্রীবাবার কথা মনে পড়ল। ঋষিতুল্য লোক। ওঁর দয়াতেই তো—
ঠং করে ঘড়িতে একটা বাজল।
নিশুতি রাত। বাইরে এখনও টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। আবার সেই বেড়ালের কান্না। এই বৃষ্টিতে রাস্তায় বেড়াল কোথা থেকে এল?
হঠাৎ টনির মার কান দুটো সজাগ হয়ে উঠল। কোনো কিছুর শব্দ হলো কি? এ ঘরে নয়। ওদিকের ঘরে…।
টনি ভালো করে দরজায় খিল দিয়েছে তো?
এই সময়ে জনার্দন এপাশ ওপাশ করল।
ঘুমোওনি?
জনার্দন অস্ফুট স্বরে বললে, না। ঘুম আসছে না।
আমারও। একটু থেমে বলল, আমি ভালো বুঝছি না।
বুঝে দরকার নেই, বললে জনার্দন। সকালে যদি না যায় ওকে এড়িয়ে থেকো।
এই বলে জনার্দন উঠল। অন্ধকার ঘর। মালতীও হঠাৎ উঠে বসল। কোথায় যাচ্ছ?
বাথরুমে।
আমার মনে হচ্ছে আমাদের দরজার কাছে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে।
.
টনির সংশয়
আজকের সন্ধেটা টনির বেশ ভালোই লাগছিল। শীতকাল তার খুব পছন্দ। তার ওপর যদি সন্ধে থেকে বৃষ্টি হয় তাহলে তো কথাই নেই। একটাই আনন্দ কখন লেপের তলায় ঢুকবে। আজ আবার গরম খিচুড়ি আর ডিম ভাজা। তোফা!
কিন্তু দরজায় কড়া নাড়াটাই সব গণ্ডগোল করে দিল। হ্যাঁ, এইরকম সন্ধায় হঠাৎ কেউ এলে একটু ভয়-ভয় করে বৈকি। কিন্তু তার ভয় করেনি। সে ভেবেছিল নিশ্চয় কোনো আশ্রয়প্রার্থী। আর ক্ষুধার্ত মানুষকে যে দুমুঠো খেতে দেয় কিংবা আশ্রয়প্রার্থীকে যে আশ্রয় দেয়, ঈশ্বর তাকে ভালোবাসেন। তাই শুধু মানুষ কেন, একটা কুকুর-বেড়াল হলেও সে তাড়িয়ে দেয় না।
দরজাটা সে খুলে দিতে গেল। কিন্তু বাবা গেল না। বাবা শক্তসমর্থ মানুষ। তবুও বাড়িতে এক এক সময়ে কেমন যেন অন্যমনস্ক থাকে। সব সময়ে কী যেন ভাবে।
বাবা দরজা খুলতে গেল না। আশ্চর্য! বাবা ভয় পেল।
মুশকিল! বাবাও যদি কাউকে দেখে ভয় পায় তাহলে বিপদের সময় কে সাহস দেবে? অথচ বাবা কখনোই ভীতু নয়। ভয় পাবার অবশ্য কারণ ছিল।
লোকটার মুখ ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না। তাকে আশ্রয় দেওয়া হলো কিন্তু তার কোনো কৃতজ্ঞতাবোধ নেই। খসখসে গলায় শুধু শুকনো ধন্যবাদ দিল।
সে কফি খেল দূরে বসে। ডাইনিং টেবিলে এল না। কোনো গেস্ট এলে সে কি তফাতে বসে?
আরও ব্যাপার আছে। কফি খাবার জন্যেও পকেট থেকে হাত বের করছিল না। সে সময়ে হঠাৎ লণ্ঠনটা নিভে যায়। সেই অন্ধকারের মধ্যে লোকটা কফি খেয়ে নেয়। খেয়েই সে হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে দেয়।
কেন? তার হাতে কি পোলিও হয়েছে? না কি কুষ্ঠ?
আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, অত গরম কফি এক মিনিটে খেল কী করে? ম্যাজিক?
এই ছোটো ছোটো ব্যাপারগুলো তাকে ভাবিয়ে তুলেছে। যতই ভাবছে, ততই তার কৌতূহল বাড়ছে। বেশ মজার। ধীরে সুস্থে মাথা খেলাবার মতো একটা জিনিস পেয়েছে।
আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার–লোকটা এ বাড়িতে এসে নিজের পরিচয় ভালো করে দিল না। এ বাড়ির কর্তারও কোনো পরিচয় জানতে চাইল না। যেন সে এ বাড়ির লোকদের চেনে।
সত্যিই কি চেনে?
সে নিজের নাম পর্যন্ত বলেনি। তাই বাধ্য হয়ে টনি নিজেই নাম জিজ্ঞেস করল। হয়তো এটা ছোটো মুখে বড় কথা। তবু কৌতূহল। কিন্তু লোকটা অযথা তার ওপর রেগে গেল। কেন?
আচ্ছা, কাল রাত্তিরে জানলায় অমন শব্দ হলো কেন? কেউ কি সত্যিই জানলা ঠেলছিল? তার সঙ্গে আজকের এই লোকটার কি কোনো সম্পর্ক আছে? ভাবতে ভাবতে টনির মাথাটা কিরকম গরম হয়ে উঠল।
ওদিকের ঘড়িতে ঢং ঢং করে বারোটা বাজল। এত রাত পর্যন্ত সে কখনও জাগে না। আজ ভেবেছিল বই-খাতা গুটিয়ে, খিচুড়ি খেয়ে তাড়াতাড়ি লেপের মধ্যে ঢুকবে। কিন্তু তা আর হলো না। ঐ লোকটা এসে সব নষ্ট করে দিল।
তার ঘরে তার একটা ছবি ছিল। সেটার দিকে চোখ পড়তেই সে যেন একটু আরাম পেল। সে ছবির কথা ভেবে ভয় ভুলে থাকতে চেষ্টা করল। তার চার-পাঁচ বছরের ছবি। ছবিটা তুলেছিলেন পাদ্রীবাবা চার্চের চাতালে বসিয়ে। ছবি তোলা সে কখনও দেখেনি। সেই প্রথম ছবি ভোলা দেখল। নিজের ছবি দেখে অবাক।
সেই ছবিটার দিকে চোখ পড়তেই তার ছোটোবেলার কথা মনে পড়ল। তখন সে খুবই ছোটো। তার মা-বাবার কথা মনে নেই। চন্দনপুর গ্রামের একটা চার্চের চাতালে সে বসেছিল। কী করে সে এখানে এল তা সে জানে না।
সেই চার্চের এক দয়ালু পাত্রী তাকে একা দেখে নিজের কাছে নিয়ে রাখেন। পাদ্রীর কাছে সে মাস ছয় ছিল। এইটুকু বয়েস থেকেই সে পাদ্রীর সঙ্গে রোজ চার্চে যেত। প্রেয়ার শুনত। আর প্রভু যিশুর কথা ভাবত। সেই থেকে তার মনটাই কেমন উদাস হয়ে গেল। আর সেই সঙ্গে বেড়ে গেল সাহস। মনের জোর।
তাকে যখন পাদ্রীবাবা তার কাছে নিয়ে আসেন তখন প্রবল শীতে তার পরনে একটা ময়লা হাফপ্যান্ট আর ছেঁড়া হাফশার্ট ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আর ছিল একটা লোহার কবচ কালো কারে বাঁধা। কবচটা তার রোগা রোগা হাতের তুলনায় বেশ ভারী। পরে থাকতে কষ্ট হতো। পাদ্রীবাবা সেটা প্রায়ই দেখতেন। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি মনে আছে কবচটা তোমায় কে দিয়েছিল? সে জানিয়েছিল মনে নেই। পাদ্রী বলেছিলেন, তুমি যেখানে যে অবস্থাতেই থাক কবচটা কখনো খুলো না।
