ডাইনিং হলের ডান দিকে ছোটো ঘরটার মাপে একটা ঘর। এখানে টনি শোয়। তার গায়েই আর একটা ঘর বাইরের দিকে। দুঘরের মধ্যে আগের ঘরের মতোই কাঠের পার্টিশান। কাঠ জীর্ণ হয়ে ফেটেফুটে গেছে। এটা গেস্টরুম। বড়ো একটা ব্যবহার হয় না বলে তালা দেওয়া থাকে।
জনার্দন চুপচাপ শুয়েছিল। পাশে মালতী। সেও চুপচাপ। বাইরে তখনও টিপ টিপ বৃষ্টি পড়েই চলেছে।
এই আগন্তুকটি আসার পর থেকে জনার্দনের অস্বস্তির শেষ নেই। সবটাই যেন কেমন রহস্যজনক। হঠাৎ বৃষ্টির সন্ধ্যায় লোকটা এল। সে নাকি ডায়মন্ড হারবার থেকে গাড়ি নিয়ে আসছিল। ভুল করে এই পরিত্যক্ত রাস্তায় ঢুকে পড়েছে। কিন্তু ভুল হওয়ার কারণ নেই। ডায়মণ্ড হারবার রোড পিচঢালা পাকা রাস্তা। সেই পথ ছেড়ে ভুল করে এই ধুলোভরা কাঁচা রাস্তায় এসে পড়বে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
তারপর কোথায় যাবে তাও স্পষ্ট নয়। এখানে এসে জায়গাটা পছন্দ হয়েছে। খুব ভালো কথা। কিন্তু অন্ধকারে জায়গাটা দেখল কী করে? বলল, এখানে মাঝে মাঝে আসবে। কিন্তু খাবে না। এখানে না খাবে তো খাবে কোন চুলোয়? কাছাকাছির মধ্যে একটা মুদিখানার দোকান নেই তো হোটেল! আসলে সবই ধাপ্পা।
সে আশ্রয় নিতে এসেছে, কিন্তু কোনো বিনয় নেই। কথা নেই। যেটুকু কথা বলে তা যেন অর্ডার করা! যেন তার নিজের বাড়িতে এসেছে। এ বাড়ির সেইই যেন কর্তা!
এই সব দেখেশুনে জনার্দনের মনে হচ্ছে লোকটা সমাজবিরোধীদেরই একজন। ভাগ্যি কৃপানাথ আগে থেকে সাবধান করে দিয়েছিল ভালো ব্যবহার করতে। এখন সকালবেলায় মানে মানে বিদেয় হলেই বাঁচা যায়।
কিন্তু সকাল? সে তো ঢের দেরি। এখন সবে রাত দশটা। গোটা রাত পড়ে রয়েছে।
যদি ডাকাতই হয় তাহলে কী মতলবে আজ রাতের অতিথি হলো বোঝা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে না বলেই ভয় হচ্ছে। খুব সাবধানে থাকতে হবে। অবশ্য সাবধান আর হবে কি নিয়ে? একটা ভোতা দা পর্যন্ত নেই। তার ওপর টনিটা হয়েছে রামপাকা। খামোকা নাম জিজ্ঞেস করতে গিয়ে খচিয়ে দিল লোকটাকে।
.
…টনির মাও শুয়ে আছে চোখ বুজিয়ে। ঘুম আসছে না। আজ সন্ধে পর্যন্ত মনটা বেশ ভালোই ছিল। কড়া শীত। সেই সঙ্গে বৃষ্টি। বেশ মৌজ করে গরম খিচুড়ি আর ডিম ভাজা খাবে বলে সাত তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে ঢুকেছিল। কিন্তু কোথা থেকে একটা উটকো লোক এসে মেজাজটা খিঁচড়ে দিল। এমনি সাধারণ লোক হলে ভাবনার কিছু ছিল না। কিন্তু এ লোকটা যেন কেমন। মুখটাও ভালো করে দেখা গেল না।
লোকটা বোধহয় অবস্থাপন্ন। গাড়ি করে আসছিল। শুধু কফি খেল। আর কিছু খেল না। এটা কি তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা? এমনকি রাতেও কিছু খেতে চাইল না। ভেবেছে কি তারা খুব গরিব?
একটু গল্পগুজব তো করবে। তাও না। সাত তাড়াতাড়ি শুতে চলে গেল। বিছানা পরিষ্কার করা, মশারি টাঙানো এটুকুও করতে দিল না। এমনকি ঘরে লণ্ঠন পর্যন্ত নিল না।
কেন?
এখন যে ভয়টা করছে, সেটা হচ্ছে লোকটা বোধহয় ডাকাতই। কৃপানাথবাবু তো আগেই সাবধান করে দিয়েছিলেন।
আর একটা গোলমেলে ব্যাপার আছে। সেটা অবশ্য নিজেদের ব্যাপার।
গড়িয়ায় তাদের নিজেদের একটা ছোটোখাটো বাড়ি আছে। সেখানেই বেশ দিন কাটছিল। হঠাৎ কর্তার কী খেয়াল হলো বাইরে কোথাও গিয়ে মুক্ত আলো বাতাসে একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে।
প্ল্যানটা খারাপ লাগেনি। তা বলে এই জায়গা! এ তো একটা ভুতুড়ে বাগানবাড়ি! তবু কেন কর্তা শেষ পর্যন্ত এই জায়গাটাই পছন্দ করলে বোঝা গেল না। জিজ্ঞেস করলেও ভালো করে উত্তর দেয় না।
এখন মনে হচ্ছে লোকটা খুনে ডাকাতই হবে। যেন সব সময়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায়।
তা ডাকাতই যদি হয় তাহলে এ বাড়িতে কেন? কী এমন আছে তাদের যে ডাকাতি করবে? তা ছাড়া এই নির্জন বাড়িতে ডাকাতের অতিথি সেজে আসার দরকার ছিল কি? ঘরে ঢুকে পকেট থেকে রিভলভার বের করে তাক করলেই তো কাজ হাসিল হয়ে যেত।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, লোকটা সব সময়ে পকেটে হাত গুঁজে ছিল বটে!
মহা মুশকিল! এরকম রহস্যজনক লোক বাড়িতে ঢুকিয়ে রাত কাটানো যায়?
ঠং ঠং করে দেওয়াল ঘড়িটায় বারোটা বাজল।
নাঃ, ঘুম আসছে না। ওদিকে কর্তা লেপ মুড়ি দিয়ে পড়ে আছে। ঘুমিয়ে গেছে নিশ্চয়ই।
কিন্তু টনি একা ওর ঘরে কী করছে? ভয় পাচ্ছে না তো? খুব বুদ্ধিমান ছেলে। একটুতেই সব বুঝে ফেলে। তেমনি সাহসী। ওর বাবা যখন গ্যাট হয়ে বসে রইল তখন ও-ই তো গিয়ে দরজা খুলে দিল। ও-ই তো ঐ অদ্ভুত লোকটার কাছে গিয়ে নাম জিজ্ঞেস করল। তাতে লোকটা রেগে গেল। আবার ওর বাবাও রেগে গেল ছেলের ওপর কী দরকার পাকামো করে তার নাম জিজ্ঞেস করার?
ছেলেটা একটু অদ্ভুত প্রকৃতির। ছোটোবেলা থেকেই ওর মনটা বড়ো উদাস। নির্জন জায়গা পছন্দ করে। চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে কী ভাবে। কারো সঙ্গে মিশত না। এখনও তাই। এই নিরিবিলি জায়গা ওর খুব ভালো লেগেছে। এখন ইস্কুলের ছুটি। এখানে এসে পর্যন্ত বাড়ি থাকে না। সারা দুপুর টো টো করে ঘুরে বেড়ায়।
একদিন দেখল টনি ওদিকের ঐ কবরখানা থেকে বেরিয়ে আসছে। কী সব্বনাশ! শ্মশানে মশানে-কবরখানায় কেউ শখ করে যায়?
জিজ্ঞেস করলে হেসে বলল, জায়গাটা ওর খুব ভালো লাগে। ওখানে কত কাল ধরে কত লোকে মাটির নিচে শুয়ে আছে। আহা বেচারি।
