কে আপনি? কি চান? শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করল জনার্দন।
লোকটা বর্ষাতির টুপির তলা থেকে ক্রুর দৃষ্টিতে একবার চারিদিক দেখে নিল। তারপর বলল, ডায়মন্ড হারবার থেকে ফিরছিলাম। গাড়িটা খারাপ হয়ে আছে খালের ধারে। এখানে থাকতে চাই।
কিন্তু ডায়মন্ড হারবার রোড তো অনেক দূরে। এদিকে এলেন কী করে?
আগন্তুকের মুখ চাপা রাগে থমথম করতে লাগল। বলল, ভুল করে।
মালতী তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে নমস্কার করে বললে, ঠিক আছে, ঠিক আছে। এই রাতে আপনি আমাদের মাননীয় অতিথি। অনুগ্রহ করে বসুন।
ধন্যবাদ।
এতক্ষণে জনার্দন নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পেরেছে। যদিও সে এই উটকো আগন্তুককে মোটেই পছন্দ করছিল না তবু কৃপানাথের কথাগুলো মনে পড়ায় তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে খুব খাতির করতে লাগল। লোকটা যে খুনে ডাকাত-ফাঁকাত ছাড়া আর কিছু নয়, তা তার রাগী রাগী মুখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল। যদিও ওয়াটারপ্রুফের টুপিতে অর্ধেক মুখ ঢাকা ছিল।
যে ডাইনিং টেবিলে জনার্দন কাজ করছিল তার থেকে বেশ কিছুটা দূরে দরজার কাছে। একটা চেয়ার ছিল। লোকটা সেখানেই পা ক্রশ করে বসল।
জনার্দন তার কাছে গিয়ে হাত জোড় করে বললে, আপনি কোনোরকম সংকোচ করবেন না। এ বাড়িটা আপনার নিজের বাড়ি বলেই মনে করবেন।
লোকটা ভদ্রতা করেও তার উত্তর দিল না। টনির পর্যন্ত সেটা খারাপ লাগল।
আপনি যদি ভিজে ওয়াটারপ্রুফটা খুলে আমায় দেন তাহলে টাঙিয়ে রাখতে পারি। বলেই সন্দিগ্ধভাবে লোকটার ভেতরের পকেটের দিকে তাকাল। লোকটা সেই থেকে দুপকেটে দুহাত খুঁজে রেখেছে। পকেটে রিভলভার নেই তো?
লোকটা গম্ভীরভাবে বলল, চিন্তা করবেন না। আমার ব্যবস্থা আমি নিজেই করে নেব।
এই সময়ে টনির মা এক কাপ কফি আর টোস্ট এনে টেবিলে রাখল। তারপর হাসিমুখে অতিথিকে টেবিলে আসতে অনুরোধ করল।
আগন্তুক বলল, শুধু কফিটা আমায় দিন।
অর্থাৎ টেবিলে সে আসবে না।
অগত্যা মালতী একটা ছোটো টুল এনে কফির পেয়ালা তার ওপর রাখল।
টোস্ট না খান দুটো বিস্কুট দেব?
না, ধন্যবাদ।
কথা বলতে বলতে মালতী লক্ষ্য করল লোকটা ঘরের চারিদিক কেমন খরদৃষ্টিতে দেখছে।
মালতী কফি রেখে ডাইনিং টেবিলের কাছে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। সে অবাক হলো, লোকটা টেবিলে এল না কেন? মালতী তাকালো টনির দিকে। দেখল সেও তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।
সামনে টুলের ওপর গরম কফি। ধোঁওয়া উড়ছে। আগন্তুক সেদিক তাকিয়ে আছে। তার দুহাত তখনো ওয়াটারপ্রুফের ভেতরে। মনে হচ্ছে তার এত শীত করছে যে হাত বের করতে পারছে না। তবু হাত তো বের করতেই হবে। নইলে কফি খাবে কি করে?
এতক্ষণে তার বাঁ হাতটা পকেটের মধ্যে নড়ে উঠল। আর তখনই লণ্ঠনটা নিভে গেল।
এ আবার কী! আজই তো লণ্ঠনে তেল ভরেছি। মালতী বলে উঠল। অন্ধকারেই জনার্দন দেখল আগন্তুকের বাঁ হাতটা যেন পকেট থেকে বেরোল। জনার্দন অজানা আতঙ্কে তাড়াতাড়ি টেবিলের নীচে মাথাটা গুঁজে দিল। তার মনে হলো এখনই একটা শিসের গুলি ছুটে এসে ওর মাথার খুলিটা উড়িয়ে দেবে।
অন্ধকারে দেশলাই খুঁজে নিয়ে মালতীই লণ্ঠনটা জ্বালল। দেখল আগন্তুকের বাঁ হাতটা আবার পকেটে ঢুকে গেছে। কফির পেয়ালা শূন্য।
আশ্চর্য, অত গরম কফি এক নিশ্বাসে খেল কী করে!
মালতী এগিয়ে গিয়ে শূন্য কাপটা তুলে নিল। হেসে বলল, কফিটা কি জুড়িয়ে গিয়েছিল?
আগন্তুক তার উত্তর দিতে চাইল না। বেজার মুখটা অন্য দিকে ফেরালো।
মালতী হেসে বলল, আপনার শোবার ব্যবস্থা করছি ওদিকের ছোট ঘরটায়। খুব নিরিবিলি। অ্যাটাচড় বাথরুম। আপনার অসুবিধে হবে না। বিছানা রেডি করা আছে। খাওয়ার পর বিছানাটা ঝেড়ে মশারি টাঙিয়ে দেব। এখানে বড্ড মশা।
ধন্যবাদ। কোনো কিছুরই দরকার নেই। নিজেই সব ঠিক করে নিতে পারব। রাতেও কিছু খাব না। এখন একটু বিশ্রাম করতে চাই।
একেবারেই কিছু খাবেন না? ক্ষুণ্ণ স্বর বেরিয়ে এল মালতীর গলা থেকে।
না। বললাম তো।
ঘরটা দেখিয়ে দেবার জন্যে মালতী এগিয়ে গেল। ঠিক পিছনেই লোকটা। ঘাড়ে নরম নিশ্বাসের মতো কি লাগছিল। ফিরে দেখল লোকটা একেবারে পিছনে। ভয়ে মালতীর বুক কেঁপে উঠল। আর আশ্চর্য তার স্বামী; ডাইনিং টেবিলের সামনে মুখ চুমড়ে বসে শুধু দেখছে।
হঠাৎ টনি এগিয়ে এসে বলল, আপনার নামটা তো জানতে পারলাম না, আঙ্কেল।
আগন্তুক থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বর্ষাতির টুপির তলা দিয়ে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকালো টনির দিকে। খসখসে গলায় বলল, তুমি ছেলেমানুষ। আমার নাম জানতে চাও কেন? এটা তোমার স্পর্ধা।
আঙ্কেল, কিছু মনে করবেন না। গেস্টের নাম জিজ্ঞেস করা কী অন্যায়?
লোকটা এবার তার জন্য নির্দিষ্ট ঘরের ভেতরে ঢুকল।
একটা লণ্ঠন এনে দিই? মালতী জিজ্ঞেস করল।
দরকার নেই। হ্যাঁ, আর শুনুন আমি হয়তো ভোরবেলা চলে যাব। আবার আসব যে কোনোদিন। জায়গাটা আমার পছন্দ হয়েছে। ভাবছি খানিকটা জমি কিনে কারখানা করব। আর আমার খাবারের ব্যবস্থা করবেন না। বলেই মিস্টার গুর্গে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
.
দুশ্চিন্তার রাত
সর্বসাকুল্যে চারখানি ঘর। দরজা দিয়ে ঢুকলেই সামনে বেশ বড়োসড়ো হলঘর। মাঝখানে ডাইনিং টেবিল। খান চারেক চেয়ার। এছাড়া আরও কয়েকটা চেয়ার এদিক-ওদিক ছড়ানো। হলঘরের বাঁ দিকে একটা বেডরুম। এখানে শোয় জনার্দন আর তার স্ত্রী মালতী। তার পাশেই একটা ছোটো ঘর। দুঘরের মধ্যে সেকালের তৈরি কাঠের পার্টিশান। এই ছোটো ঘরে থাকে জিনিসপত্র। ডাইনিং হল আর এই ছোটো ঘরের পাশে রান্নাঘর। রান্নাঘরের পিছনে সেকলে খাটা-পায়খানা। একটা কুয়ো। এদিকে পাঁচিলটা নিচু। সেই নিচু পাঁচিলের নিচে বেঁটে খিড়কি দরজা।
