জনার্দন হাঁটছিল। হঠাৎই তার মনে হলো রাস্তায় সে এই মুহূর্তে একা নয়। কেউ যেন পিছনে পিছনে আসছে।
চমকে পিছন ফিরে তাকাল। না, কেউ নেই।
মনের ভুল ভেবে জনার্দন এগিয়ে চলল। এবার স্পষ্ট শুনল খসখস শব্দ। পিছনে কেউ আসছেই।
আবার ফিরে তাকাল। না, কেউ নেই।
এরকম মনে হচ্ছে কেন? জনার্দন নিজেকেই নিজে জিজ্ঞেস করল। তার পরে ও কিছু না বলে মনকে বুঝিয়ে আরও জোরে হাঁটতে লাগল।
বেশি দূর যেতে হলো না। স্পষ্ট অনুভব করল কেউ যেন অদৃশ্য থেকে একেবারে তার ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে। একটা কনকনে ঠান্ডা হাওয়া তার সারা দেহ অবশ করে দিচ্ছে। একটা হিমস্রোত যেন পিঠ থেকে উঠে গলাটা চেপে ধরছে….
এমনি সময়ে কে যেন ডাকল, বাবা! জ্ঞান হারাবার মুহূর্তে জনার্দন দেখল বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসছে টনি।
বাবা, আমি এখানকার সব রাস্তাগুলো চিনে ফেলেছি। তাড়াতাড়ি বাড়ি চলল। এখুনি বৃষ্টি নামবে।
আশ্চর্য! টনি কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে পিছনে যে ছিল সে কোথায় মিলিয়ে গেল। জনার্দন প্রাণভরে নিশ্বাস নিল।
হ্যাঁ, চলো বাড়ি যাই। তোমার মা একা রয়েছে।
.
সেই দিনই
রাত বোধহয় এগারোটা। বৃষ্টি হয়নি। কিন্তু আকাশটা থমথম করছে। ঠান্ডাটা যেন নতুন করে পড়ল। আপাদমস্তক লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়েছিল জনার্দন। কানে এল গত রাতের মতো একটা বেড়াল রাস্তায় কেঁদে কেঁদে বেড়াচ্ছে…যেন অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তারপরেই ওদিকের ঘরের জানলা ঠেলছে। কিংবা ইট ছুঁড়েছে।
মালতীরও ঘুম ভেঙে গেল।
কিসের শব্দ?
জনার্দন বলল, বুঝতে পারছি না।
ঝড়?
না, ঝড় কোথায়?
কিন্তু উনি যে ও ঘরে একলা। আমার বড় ভয় করছে।
দাঁড়াও দেখছি।
জনার্দন লণ্ঠনটা বাড়িয়ে দিল। হাতে টর্চ নিয়ে দরজা খুলে গিয়ে দাঁড়াল টনির ঘরের সামনে। পিছনে মালতী।
টনি!
আমি জেগে আছি।
একটা শব্দ শুনলে?
হ্যাঁ, শুনেছি।
মালতী বলল, তুমি আমাদের ঘরে চলে এসো।
না। আমি ঠিক আছি।
.
সন্ধেবেলায় আগন্তুক
আজ বাগানবাড়িতে থাকার তৃতীয় দিন। কাল বৃষ্টি হয়নি। কিন্তু আজ দুপুরবেলায় সমাধিভূমির দিক থেকে দৈত্যের মতো ঘন কালো মেঘ এগিয়ে আসতে লাগল। শীতকালে এরকম মেঘ দেখা যায় না। এ যেন আষাঢ়ের জলভরা মেঘ।
তারপরেই নামল বৃষ্টি।
এখন সন্ধে। সারা দুপুর টানা বৃষ্টি হবার পর এখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি। তারই সঙ্গে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা।
দরজা-জানলা বন্ধ করে হলঘরে বসে জনার্দন তার কনট্রাক্টারি কাজের খাতাপত্র ঠিক করছিল। একটু দূরে টেবিলের ওপর বই-খাতা নিয়ে পড়ছিল টনি। ভেতরে রান্নাঘরে ওর মা রান্না করছে।
টনি বলল, যেরকম আকাশের অবস্থা, আমার মনে হচ্ছে বন্যা হবে। তাহলে মন্দ হয়। চারিদিকে জল থৈ থৈ করবে। তার মধ্যে দ্বীপের মতো জেগে থাকবে আমাদের বাড়িটা আর তিনটি মাত্র প্রাণী তুমি, মা আর আমি।
তুমি মন দিয়ে পড়ো তো!
এই তো পড়ছি। বলে টনি কিছুক্ষণ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়ল। তারপর মাকে উদ্দেশ করে বলল, মা, খিচুড়ি করছ তো?
হ্যাঁ, খিচুড়ি আর ডিম ভাজা।
বাঃ! ফাইন।
জনার্দন ধমকে উঠল, পড়তে পড়তে খাওয়ার চিন্তা! কিসসু হবে না তোমার।
মালতী ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কফি খাবে নাকি?
দাও।
হঠাৎ এই সময়ে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। চমকে উঠল জনার্দন। সচকিত হলো টনি।
এই দুর্যোগে কে আবার এল?
শুধু যে কৌতূহল তা নয়, জনার্দনের মতো শক্তসমর্থ মানুষটাও কেমন ভয় পেল।
হ্যাঁগো, কেউ যেন কড়া নাড়ল। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল মালতী।
জনার্দন চাপা গলায় বলল, চুপ! একেবারে চুপ!
রীতিমতো ভয় পেয়েছে জনার্দন। তার বোধহয় মনে পড়েছিল কৃপানাথের কথা। বাগানবাড়িটা কেনার সময়ে বলেছিল জায়গাটা সমাজবিরোধীদের আড্ডা। সেই সঙ্গে সাবধান করে দিয়েছিল, ওরা যদি কেউ আসে, দু-একদিন থাকতে চায়, বাধা দেবেন না যেন। ওদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলে ওরা কিছু বলবে না। তা নইলে বিপদে পড়বেন। কেউ ঠেকাতে পারবে না।
হ্যাগো, কে কড়া নাড়ল?
জনার্দন মাথা নাড়লে, জানি না।
চোর-ডাকাত নয় তো?
জানি না।
একবার নেড়েই থেমে গেল কেন?
জানি না বলেই টনিকে ধমকে উঠল, হাঁ করে আমাদের কথা শুনছ কি? পড়ো না। আর তুমি রান্নাঘরে যাও তো।
তা যাচ্ছি। কিন্তু কে কড়া নাড়ল তখন?
ও শোনার ভুল। বাইরে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। বোধহয় তাতেই কোনোরকমে—
কথা শেষ হলো না। আবার কড়া নাড়া খট খট খট
জনার্দনের মুখটা চুপসে গেল।
নাঃ, সত্যিই কেউ এসেছে। কিন্তু এই দুর্যোগে—
বাবা, আমি দরজাটা খুলে দেব?
দাঁড়াও। আর একবার নাড়ুক।
তিন জনে কান খাড়া করে রইল। একটু পরেই আবার কড়া নাড়া। টনি ছুটে যাচ্ছিল, ওর মা হিস্টিরিয়া রোগীর মতো চেঁচিয়ে উঠল, না, তুই যাবি না। আমার মনে হচ্ছে কোনো বিপদ ঘটতে চলেছে।
এমনও তো হতে পারে মা, এই ঝড়-বৃষ্টির রাতে কেউ আশ্রয় চাইছে।
অনুমতির অপেক্ষা না করে টনি এগিয়ে গেল দরজার দিকে। জনার্দন তেমনি বসে রইল। ফ্যাকাসে মুখ নিয়ে।
টনি দরজা খুলে দিতেই একটা দমকা ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকে জনার্দনের কাগজ পত্র উড়িয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই মাথা থেকে পা পর্যন্ত ওয়াটারপ্রুফ পরা লম্বা একটা লোক ধীরে ধীরে কালো রবারের জুতো পরা পা ফেলে ঘরে ঢুকল। পা দিয়ে ঠেলে দরজাটা বন্ধ করে দিল। হাত ব্যবহার করল না। হাত দুটো শীতের জন্যেই বোধহয় পকেটে ঢোকানো ছিল।
