আশ্চর্য! টনির এতটুকু ভয় করল না। বরঞ্চ তার ভালোই লাগল জায়গাটা।
সে যখন বাড়ি ফিরে এল তখন সন্ধে হয় হয়। জিনিসপত্র গোছানো হয়ে গেছে অনেকটা। মা জলখাবার বানাচ্ছে। এর পর রাতের রান্না।
এ বাড়িতে একটাই অসুবিধে ইলেকট্রিক নেই। ছিল একসময়ে। এখন লাইন কাটা। কেউ তো থাকত না। শুধু কালো কালো তারগুলো সাপের মতো ঝুলছে দেওয়ালে দেওয়ালে।
এখনও বেশ শীত আছে। কাজেই পাখার দরকার নেই। আলো? তিনটে-চারটে লণ্ঠন সঙ্গে করে এনেছে। টনি খুব খুশি। একঘেয়ে ইলেকট্রিক আলো ভালো লাগে না। সে মাকে বলে, কেমন নির্জন জায়গা, পুরনো বাড়ি, লণ্ঠনের টিমটিমে আলো, বেশ রহস্য-রহস্য নয় মা?
তোর যত অদ্ভুত কথা। স্নেহের সুরে বলে মা। নে খেতে বোস দেখি।
ডাইনিং টেবিলের সামনে বসেছে তিনজনে। টেবিলের ওপর জ্বলছে লণ্ঠন। দেওয়ালে তাদের মস্ত মস্ত ছায়া।
সবে পরোটায় কামড় দিয়েছে টনি হঠাৎ বাথরুমের দিকে শব্দ। কিছু যেন ভেঙে পড়ল। চমকে উঠল তিনজনেই। কি হলো?
দাঁড়াও, আমি দেখছি। টনি উঠতে যাচ্ছিল, বাধা দিল মা।
টনির বাবাকে বলল, তুমি দ্যাখো না। লণ্ঠন নিয়ে উঠে গেল জনার্দন বাথরুমের দিকে। দেখল দেওয়াল থেকে একটা মস্ত বড়ো চাঙড় ভেঙে পড়েছে।
আরে ওটা কী?
ততক্ষণে টনি আর তার মাও এসে দাঁড়িয়েছে। একটা সাদা বেড়াল–মাথাটা তার থেতলে গেছে চাঙড়ের চাপে।
ইস! কী বীভৎস দৃশ্য! মা আঁতকে ওঠে। এখন এটাকে ফেলতে হবে। নইলে পচে দুর্গন্ধ বেরোবে।
চা-পরোটা খাওয়ার আনন্দ মাথায় উঠল। বাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই দুর্ঘটনা!
কিন্তু ঝড় নেই বৃষ্টি নেই হঠাৎ অত বড়ো চাঙড়টা পড়ল কি করে? অবাক হয়ে প্রশ্ন করে মা।
সে ভেবে লাভ নেই, উত্তর দেয় জনার্দন। এখন মরা বেড়ালটা ফেলতে হবে।
টনি বলল, বাবা, আমি ওটা ফেলে দেব?
মা বললে, না। তোমার বাবা ফেলবে।
অগত্যা পাথর সরিয়ে বেড়ালটার লেজটা হাতে ধরে জনার্দন সেটা পিছনের জমিতে ফেলে দিয়ে এল। মরা বেড়ালের ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বারান্দাময় ছড়িয়ে।
জনার্দনের গা-টা কেমন করে উঠল।
টনি বলল, রক্তটা আমি ধুয়ে দেব মা?
মা বলল, না, আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি।
যে রকম আনন্দ করে প্রথম রাতটা কাটাবে ভেবেছিল তেমন আনন্দ হলো না। বাধা পড়ল। মালতীর মনে হলো এটা একটা অশুভ লক্ষণ।
নটা বাজতে না বাজতেই নিঝুম রাত। গোটা হলঘরটা থমথম করছে। বহুদিন পর এ বাড়িতে লোক সমাগম দেখে বাড়ির দেওয়াল থেকে কড়িকাঠ পর্যন্ত যেন অবাক হয়ে দেখছে। এরা তিনজন নড়ছে চড়ছে আর লণ্ঠনের আলোয় তাদের ছায়াগুলো যেন ভৌতিক চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
রাত সাড়ে নটায় সব লণ্ঠন নিভিয়ে শুধু শোবার ঘরের লণ্ঠনটার পলতে কমিয়ে শুয়ে পড়ল ওরা। টনির জন্যে আলাদা ঘরের ব্যবস্থা। টনি সেখানেই শুতে চেয়েছিল। কিন্তু মা শুতে দেয়নি। বললে, আজকের মতো আমাদের সঙ্গে শোও।
গভীর রাত। ঘুম ভেঙে গেল জনার্দনের। একটা বেড়াল বাড়ির চারিদিকে ক্রমাগত ডেকে চলেছে। ডাকটা যেন ভয়-পাওয়ার মতো।
এত রাত্তিরে রাস্তায় বেড়াল এল কোথা থেকে?
তারপরই কেমন খসখস শব্দ। কেউ যেন জুতো টেনে টেনে হাঁটছে। প্রথমে জনার্দন ভেবেছিল শব্দটা বুঝি ঘরের ভেতরেই। কান খাড়া করে অনেকক্ষণ শুনল শব্দটা। না, ঘরের ভেতরে নয়, বাইরে।
এই শুনছ? জনার্দন ঠেলা দিল মালতীকে।
হ্যাঁ, শুনছি।
ধড়মড় করে উঠে বসল টনি। চাপা গলায় বলল, আমিও শুনছি।
শব্দটা কিন্তু থেমে গেছে।
পরক্ষণেই আবার শব্দ-খস খস খস।
শব্দটা এবার বাড়ির পিছন দিকে। একটু পরে শব্দটা পাশের দিকে।
কেউ যেন বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করছে।
বাবা, আমি গিয়ে দেখব?
মা ধমকে উঠল, খবরদার! চুপ করে শোও।
পরের দিন ঘুম ভাঙল অনেক বেলায়। সারারাত ভালো করে ঘুম হয়নি। কেমন যেন ভয়ে ভয়ে কেটেছে রাতটা। কিসের ভয় তা ঠিক বুঝতে পারছিল না। অথচ এখন দিনের আলোয় সব পরিষ্কার। ভয়ের কোনো চিহ্নমাত্র নেই। মনে হচ্ছে যেন সারারাত ওরা দুঃস্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু খস খস শব্দটা তো সবাই শুনেছিল। কে ঘুরে বেড়াচ্ছিল বাড়ির চারিদিকে?
কৃপানাথ, যার কাছ থেকে বাগানবাড়িটা জনার্দন কিনেছিল, বলেছিল বটে, জায়গাটা কিন্তু ভালো নয় জনার্দনবাবু। সমাজবিরোধীদের আড্ডা। নিরিবিলিতে তারা জড়ো হয়, চুরি ডাকাতির প্ল্যান করে। তারপর ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। এমনকি অন্য কোথাও খুন-খারাপি করে লাশ এনে পুঁতে দেয় ঐ বেওয়ারিশ কবরখানায়।
তাহলে কি কাল রাত্তিরে চোর-ডাকাতরাই কেউ ঘোরাফেরা করছিল?
দ্বিতীয় দিনটা বেশ ভালোই কাটছিল। কিন্তু দুপুরের দিকে হঠাৎ সূর্য নিস্তেজ হয়ে পড়ল। কুয়াশার মতো একটা মেঘ দেখা দিল। সেই সঙ্গে শিরশিরে বাতাস। টনি খুব খুশি। খেয়েদেয়েই সে বেরিয়ে গেছে।
জনার্দনও বেরিয়েছিল দুপুরে। কলকাতার বাস ধরতে হয় আধ মাইল হেঁটে ডায়মন্ড হারবার রোডে গিয়ে। বাড়িতে গোছানো এখনও অনেক বাকি। তাই বিকেল-বিকেল ফিরছিল।
বাস থেকে নেমে সে হেঁটে আসছিল বাড়ির দিকে। আসতে আসতে একটু অবাক হলো, মেঘ করেছে! অথচ যখন বাস থেকে নামল মাত্র পাঁচ মিনিট আগে তখনও তো বেশ রোদ ছিল।
যাই হোক সে বাড়ির দিকে জোরে পা চালাল।
জায়গাটা নির্জন। দুপাশে খাঁ খাঁ মাঠ। ধুলোভরা রাস্তার পাশে সার সার বাবলা গাছ। কোথাও কোথাও মাদার গাছে লাল টকটকে ফুল যেন রেড সিগন্যাল দিচ্ছে।
