ছবিটায় রঙ ধরাতে না পেরে তিনি শেষমেশ ঠিক করলেন নিজেই নতুন করে পুরো জিনিসটা আঁকবেন। তখনই ছবি আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত হলেন দিবাকর। পুরনো ঘড়িটায় তখন বিকট শব্দ করে রাত দুটো বাজল।
ছবি এঁকে চলেছেন দিবাকর। কিন্তু আশ্চর্য, তুলির টান দিতে গিয়ে তার হাত কাঁপছে! এ আবার কি? এমন তো কখনো হয় না।
তবু তিনি জোর করে তুলি টানতে লাগলেন। কিন্তু একি! তার তুলিটা যে গোটা একটা মানুষের পিছনের অংশ এঁকে চলেছে! মনে হচ্ছে কেউ যেন অদৃশ্যভাবে তার হাত ধরে অন্য কারো ছবি আঁকিয়ে নিচ্ছে।
দূরে কি কিছু শব্দ শোনা যাচ্ছে?
হ্যাঁ, শব্দই। খটাখটখটাখটখটাখট
আজ আর দিবাকরের বুঝতে বাকি রইল না যে ওটা ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ।
না, গাড়ি বা ফিটন নয়, কেউ ঘোড়া ছুটিয়ে দুরন্ত গতিতে এই দিকেই আসছে। কিন্তু দিবাকরের মন তখন ছবির দিকে। তিনি অবাক হয়ে দেখছেন তাঁরই তুলিতে যে ছবিটা ফুটে উঠেছে সেটা
ঘোড়ার শব্দ ক্রমশই কাছে এগিয়ে আসছে–
দিবাকরের দুচোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে। এ কি! এ কার মূর্তি! এ কার মুখ!
ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ এবার আরো কাছে এসে পড়েছে।
দিবাকর স্তম্ভিত। এই কি সেই খুনী? কিন্তু এ কার ছবি?
তাঁর মেরুদণ্ড দিয়ে যেন এক চাঙড় বরফ নেমে গেল। অতীত ফিরে এসেছে! এ যে তার নিজেরই ছবি!
ঠিক তখনই ঘোড়ার শব্দ তাঁর বাড়ির কাছে এসে থামল। ভারী পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে। তারপরই মনে হলো দরজার ওপর চলছে দুমদাম শব্দ।
ভবানীপ্রসাদ! তুমি আবার এসেছ! বলেই দিবাকর বন্দুক আনার জন্যে উঠে দাঁড়াতে গেলেন। কিন্তু অচৈতন্য হয়ে পড়ে গেলেন।
.
পরের দিন সকালে পাড়ার লোক দেখল একজন অপরিচিত লোক বসে আছেন ইজিচেয়ারে, যে চেয়ারে সুদর্শন যুবক দিবাকর রোজ বসতেন।
এই নতুন ভদ্রলোক অতি বৃদ্ধ! একমাথা পাকা চুল। মুখের চামড়া কুঁচকে গেছে, চোখের কোণে কালি, দু-চোখে ক্লান্ত শূন্য দৃষ্টি। তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখা গেল বৃদ্ধটি বোবা।
ঠিক সেইদিনই ভোরে কলকাতার বাসায় সুরঞ্জন এক দুঃস্বপ্ন দেখে চমকে উঠে বসলেন। তার যেন মনে হলো বন্ধু দিবাকরের কোনো বিপদ ঘটেছে। তিনি তখনই ট্যাক্সি নিয়ে ছুটে এলেন। এসে হতবাক! মাত্র কদিনের ব্যবধানে তাঁর বন্ধুর একি দশা হয়েছে। এ যেন দিবাকর নয়, আদ্যিকালের আর একজন কেউ!
[আষাঢ় ১৪০২]
গভীর রাতের ভয়ঙ্কর
অশুভ সংকেত
এই বাগানবাড়িতে যেদিন জনার্দন তার স্ত্রী আর ছেলেকে নিয়ে একমাসের জন্যে বেড়াতে এল সেদিন ওদের আনন্দের পরিসীমা ছিল না। এক মাস এই ফাঁকা জায়গায় সবুজ প্রকৃতির কোলে প্রাণভরে নিশ্বাস নিয়ে বাঁচবে।
যেদিন এখানে প্রথম এল সে দিনটা ছিল ৯ ফেব্রুয়ারি। তখনও তারা জানত না এই দিনটির পিছনে একটার পর একটা কী ভয়ঙ্কর অশুভ ঘটনা অপেক্ষা করে আছে।
ডায়মন্ড হারবার রোড থেকে প্রায় আধ মাইল ভেতরে বাড়িটা। বোধহয় কোনোকালে জমিদারদের বাগানবাড়ি ছিল। বাড়ির সামনে ধুলোভরা রাস্তাটা যে কোথায় চলে গেছে তার খোঁজ জনার্দন রাখেনি। রাখার দরকারও ছিল না। নির্জন বলেই জায়গাটা তার পছন্দ। একঘেয়ে কলকাতায় থেকে থেকে সে যেন হাঁফিয়ে উঠছিল। এখানে এসে হাত-পা ছড়িয়ে বিশ্রাম করবে কিছুদিন, সম্ভবত এই ছিল তার মনের ইচ্ছে।
বাড়ির ভিতরে অনেকখানি খালি জায়গা। ঝোপঝাপ বুনোফুল ছাড়া আর কিছু নেই। জায়গাটা দক্ষিণ দিকে ক্রমে ঢালু হয়ে একটা পুকুরে গিয়ে পড়েছে।
বাড়ির পশ্চিম দিকে রাস্তা দিয়ে এগোলে আদিবাসীদের কয়েকটা ঘর। তারা চাষবাস করে। কিন্তু কেন কে জানে সন্ধে হলেই যে যার ঘরে এসে ঢোকে। ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেয়। সকালের আগে কিছুতেই দরজা খোলে না। এদের মাটির ঘরগুলোয় জানলা থাকে না। ওদের সংস্কারসন্ধের পর খোলা পেলেই অশুভ আত্মা ঢুকে পড়ে। জায়গাটাও তেমন ভালো নয়। অল্প দূরে একটা পুরনো কবরখানা। বেলা পড়ে এলে আদিবাসীরা কেউ ঐদিকে তাকায় না।
এখানে এসে জনার্দনের স্ত্রী মালতীও খুব খুশি। হোক পুরনো তবু কত বড়ো বড়ো ঘর। হাত-পা খেলিয়ে থাকা যাবে কদিন।
সবচেয়ে খুশি টনি। বয়েস তার বছর তেরো। পাতলা একহারা চেহারা। চোখের দৃষ্টি ছটফটে। দেখলেই মনে হয় খুব সাহসী। কলকাতায় আঁটসাট চার দেওয়ালের বদ্ধ ঘরে কেবল পড়া-পড়া করে হাঁপিয়ে ওঠে। এখানে এই খোলামেলা জায়গায় এসে সে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
বেলা তিনটেয় ওরা মালপত্র নিয়ে এ বাড়িতে এসে পৌঁছল। ওর বাবা-মা লেগে গেল ঘর গোছাতে। আর সে ফুক করে বেরিয়ে গেল ঘুরতে। চারিদিক ফাঁকা ফাঁকা। গাছে গাছে কোকিল ডাকছে। ডাকছে অদ্ভুত স্বরে হাঁড়িচাচা। ও মনের আনন্দে ঘুরতে ঘুরতে এসে দাঁড়ালো কবরখানার কাছে। পাঁচিলঘেরা অনেকখানি জায়গা। পাঁচিল ভেঙে পড়েছে কোথাও। একটা মস্ত লোহার গেট। একটা পাট তার উধাও। কেউ কোথাও নেই। টনি ঢুকে গেল কবরখানার ভেতর। দুপাশে আম গাছের ছায়ায় ঢাকা চওড়া পথ। সেই পথ থেকেই আবার ডাইনে বাঁয়ে বেরিয়ে গেছে অনেকগুলি সরু সরু পথ। তারই দুধারে পর পর সমাধি। সিমেন্ট বাঁধানো। কোনো কোনোটার ওপরে শ্বেতপাথরের ফলক লাগানো। বেশির ভাগ সমাধিই ভেঙে পড়েছে। বিরাট বিরাট ফাটল।
টনি বুঝতে পারল সমাধিক্ষেত্রটা বর্তমানে পরিত্যক্ত। নতুন করে এখানে কাউকে আর কবর দেওয়া হয় না।
