সারারাত ধরে দিবাকর এইসব আবোলতাবোল ভেবে চললেন।
হঠাৎই আজ দিবাকরের চোখে পড়ল খুনীর বাঁ হাতে একটা তাবিজ বাঁধা। এ থেকে সিদ্ধান্ত করলেন খুনী বিদেশী নয়, অন্তত ভারতীয়। তারপর চুলের রং আর আঁচড়াবার ঢং আর মাথার গড়ন দেখে তার সন্দেহ রইল না যে খুনী বাঙালি।
আবার প্রশ্ন–ছবিটা যে আঁকল সে কে? নিশ্চয় নিহত মেয়েটার কোনো কাছের মানুষ! তা নইলে এত দরদ দিয়ে কখনো ছবিটা আঁকত না। কিন্তু সে কে হতে পারে?
ভাবতে ভাবতে দেখলেন, মেয়েটার মুখে সেদিনের মতো ঘাম ঝরছে। সঙ্গে সঙ্গে তার মাথাটা ঘুরে গেল। তিনি কোনো রকমে উঠে গিয়ে ঘাড়ে, মুখে জল দিলেন। আবার ঠিক তখনই শোনা গেল সেই শব্দ–খটাখট খটাখট-খটাখট–
একটা ফিটন গাড়ি যেন বড়ো রাস্তা থেকে নেমে এই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে। দিবাকর বন্দুক হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কেননা এত রাতে ফিটন হাঁকিয়ে যেই-ই আসুক সে অন্তত গল্প করতে আসবে না।
শব্দটা কিন্তু মাঝপথে এসে থেমে গেল।
পরের দিন থেকে তার নতুন এক ধরনের অনুভূতি শুরু হলো। তাঁর মনে হলো যেন ছবিটা তাকে কিছু ইঙ্গিত করছে। যেন তাকে বলছে, খুনীকে ধরো। ওকে শাস্তি দাও। খুন করে বিধাতার রাজ্যে কেউ যেন নিষ্কৃতি না পায়।
দিবাকরের মনে হলো এক যুগ পরে একমাত্র তিনিই পারবেন মেয়েটিকে শনাক্ত করতে আর খুনীকে ধরতে। পারবেনই। কেননা তিনি তো অনেক তথ্যই পেয়ে গেছেন এর মধ্যে। তা ছাড়া
আচ্ছা, ডায়েরিতে কিছু পাওয়া যায় না? সবটা তো পড়ে উঠতে পারেননি। অনেক পাতা অস্পষ্ট বলে তো বাদ দিয়ে গেছেন।
সেই দিনই ডায়েরিটা নিয়ে দিনের আলোেয় বসলেন। বিবর্ণ অক্ষরগুলো কষ্ট করে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পড়বার চেষ্টা করতে লাগলেন।
.
০৯.
ডায়েরির শেষ পাতা
…ধন্যি মেয়ে বিজলী! স্বামীকে বাঁচাবার জন্যে তাকে বাড়ি থেকে গোপনে সরিয়ে দিয়েছিল সেই অপরাধে উচ্ছঙ্খল বটুকেশ্বর তার গায়ে হাত তুলেছিল। বাড়ির কেউ প্রতিবাদ করেনি। তাই হিন্দু জমিদারবাড়ির মেয়ে হয়েও সে কলকাতায় গিয়ে দারোগাকে নালিশ জানিয়ে এসেছিল। এটা নাকি এ বাড়ির মেয়েদের পক্ষে গর্হিত অন্যায়! সবাই ছি ছি করছিল। দারোগা বটুকেশ্বরকে ধরতে এলে সে পালায়।
কিন্তু কিছুদিন থেকে বটুকেশ্বরকে নাকি বাড়ির আশেপাশে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। যোড়শী শঙ্কিত। সে বলছে, বোধহয় বাড়িতে খারাপ কিছু ঘটবে।
তারপর আর পড়া গেল না। প্রায় শেষ পাতাটার কোনোরকমে পাঠোদ্ধার করা…কি সাংঘাতিক, কি ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল সেদিন! ভাবতেও পারিনি আবার ডায়েরি লিখতে পারব। থ্যাঙ্ক গড!
…বিকেলে গিয়েছিলাম নন্দীবাড়িতে। অন্দরমহলে গিয়ে দেখি কোনো বৌ-ই নেই। এমনকি রানীমাও। আশ্চর্য! গেল কোথায় সব?..আমি যদি জানতাম সেদিন হিন্দুদের শিবপুজোর দিন-ওদিন বাড়ির মেয়েরা সব বাড়ির পিছনে শিবমন্দিরে পুজো দিতে গেছে তাহলে কি আমি ওবাড়িতে যাই? জানতাম না বলেই আমি এমহল, ওমহল খুঁজে বেড়াচ্ছি, কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। তখন সন্ধে হয়ে এসেছে, ফিরে যাব ভাবছি, হঠাৎ একটা ঘর থেকে চাপা গোঁ গোঁ শব্দ! কি ব্যাপার দেখার জন্যে দরজাটা একটু ঠেলোম। কিন্তু দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। আবার ঠেলোম। চেঁচালাম, কে আছ, দরজা খোলো। কি হয়েছে?
দরজা খুলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে একজন ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমার মুখটা চেপে ধরে পাশের ঘরে ঠেলে ফেলে শেকল আটকে দিল। আমাকে শাসিয়ে গেল, একটু পরে আমারও মৃত্যু হবে। সাক্ষী রাখবে না।
আমি ইতিমধ্যেই দেখে ফেলেছিলাম ঘরের মধ্যে একটা থামের সঙ্গে বিজলীকে বাঁধা হয়েছে। আর যে যুবকটি তাকে খুন করার চেষ্টা করছে, সে আর কেউ নয়, বটুকেশ্বর। ফাঁকা বাড়িতে ঢুকে হতভাগিনী বিজলীকে একা পেয়ে গিয়েছিল।
…আমি তবু কোনোরকমে উঠে দাঁড়ালাম। জানলাটা একটু ফাঁক করলাম। আর তখনই সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা দেখতে পেলাম–বিজলীর গলা টিপে তাকে শেষ করে দিচ্ছে। তরপরই অচৈতন্য হয়ে পড়লাম।…কি করে কখন নিজের বাড়িতে আনা হয়েছিল জানি না।
আমার ইচ্ছে ছিল এই নিয়ে কাগজে লিখি, কলকাতায় খবর দিই। কিন্তু আমার স্বামী অতিশয় শান্ত স্বভাবের। তিনি বললেন, আমরা তো ইংলন্ডে ফিরে যাচ্ছি। কটা দিন মুখ বুজে থাকো। ওসব হাঙ্গামার দরকার নেই। তা ছাড়া আসামীও তো পালিয়েছে। ওকে ধরা যাবে না।
…কিন্তু আমি ভাবছি বেচারী বিজলীর স্বামী ভবানীপ্রসাদের কথা। সে যখন শুনবে তখন কি করবে? হয়তো তাকে সবাই ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা বলবে। আর সে তাই বিশ্বাস করবে। সে জানতেই পারবে না তার স্ত্রীকে খুন করা হয়েছে। খুনীকে ধরার চেষ্টা বা প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করা তো দূরের কথা!…
ডায়েরিটা এখানেই শেষ।
পড়তে পড়তে দিবাকরের দুচোখ ঝকঝক করে উঠল। এই তো সব ইতিহাস বেরিয়ে এসেছে…তাহলে মিসেস ফেনটনই ছবিটা এঁকে গিয়েছিলেন।
কিন্তু এই যে কাহিনি মিসেস ফেনটন লিখে গেছেন সে কাহিনিটা যেন
হ্যাঁ, মনে হচ্ছে কাহিনিটা যেন তার জানা। অ-নে-ক অ-নে-ক দিন আগের ঘটনা। কিন্তু কার কাছ থেকে জেনেছিলেন, কবে জেনেছিলেন তা মনে করতে পারলেন না।
.
১০.
গভীর রাতের আগন্তুক
দিন সাতেক পর।
ছবিটার যে জায়গার রঙ চটে গিয়েছিল, দিবাকর বসেছিলেন সেখানে রঙ লাগাতে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সেখানে রঙ ধরাতে পারছিলেন না। হয়তো পুরনো ছবিতে রঙ ধরছিল না। কিংবা তিনি খুবই অন্যমনস্ক ছিলেন। তাঁর কেবলই মনে হচ্ছিল কাহিনিটা তার খুব জানা। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিলেন না কোথা থেকে জেনেছিলেন। কাহিনিটা শুধু জানাই নয়, কয়েকটা মুখও তার যেন স্পষ্ট মনে পড়ছিল….
