দিবাকর গম্ভীরভাবে বললেন, সে গল্প আমি পড়িনি। তবে রোজ সন্ধ্যায় ঐ ভয়-ভয় ভাবটা আমার চাই-ই। ওটা আমার নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাই। অনেক দেরি হয়ে গেল। আজ চলি। তুমি এসো একদিন।
.
দিবাকর নতুন কেনা ছবিটা তার বেডরুমে টাঙিয়ে রাখলেন। তারপর কখনো কাছ থেকে, কখনো দূর থেকে বারবার ছবিটা দেখতে লাগলেন।
বড়ো অদ্ভুত ছবি। একজন মেয়েকে একটা লোক গলা টিপে মারছে। যে খুন করছে তার পিছনের দিকটাই শুধু দেখা যাচ্ছে। আর দেখা যাচ্ছে তার লোমশ ডান হাতটা।
ছবিটা মন দিয়ে দেখলে কতকগুলো চিন্তা মাথায় আসে–
প্রথমত, মেয়েটার মুখের অবস্থা। ঘাড়টা বাঁ দিকে একটু হেলে আছে। পাথরের মতো চোখদুটো বেরিয়ে এসেছে। মণি দুটো স্থির। এমনকি গলায় চাপ দেবার সময়ে শরীরটা যে ঠেলে উঠেছে, ছবিতে সেটুকু পর্যন্ত পরিষ্কার। অসাধারণ আর্টিস্ট।
দ্বিতীয়ত, মেয়েটার বয়েস বছর তিরিশ। স্বাস্থ্যবতী। মুখটা বড়ো। চোয়াল চওড়া। চুল পিঠ পর্যন্ত ছড়ানো। মেয়েটা কোন দেশী? ইউরোপীয়ান যে নয় তাতে সন্দেহ নেই। বোধহয় বাঙালি। বড়োলোকের ঘরের মেয়ে বা বৌ তা তার গলার হার দেখলেই বোঝা যায়।
তৃতীয়ত, ছবিটা এত উজ্জ্বল যে মনে হয় এটা সম্প্রতি আঁকা। কিন্তু ছবিতে ঘরের মধ্যে ঝাড়লণ্ঠন টাঙানো, দেখলে বোঝা যায় এটা অনেককাল আগের পটভূমিতে আঁকা। ঘরটা জলসাঘর হতে পারে–বেড়রুমও হতে পারে।
চতুর্থত, এ ছবি হঠাৎ আঁকার কারণ কি? কেউ একজনকে খুন করছে, সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তের ছবি কি কোনো আর্টিস্ট শখ করে আঁকতে চায়? অবশ্য যদি না সে নিজে চোখে সে দৃশ্যটা দেখে থাকে!
দিবাকরের তখনই গ্যাংটকের দোকানে সেই ছবিটার কথা মনে পড়ল। সেও যেন অনেকটা এইরকম।
.
০৮.
ছবি-রহস্য
অদ্ভুত ব্যাপার তো!
ছবিটা দেখতে দেখতে দিবাকর একদিন অবাক হলেন। দিনের বেলায় যে ছবিটা কেমন নিষ্প্রাণ, ম্যাড়মেড়ে–একটা ছবিমাত্র মনে হয়, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছবির রঙ উজ্জ্বল হতে থাকে।
এক-একদিন রাত দুটো-আড়াইটে পর্যন্ত ছবিটার সামনে বসে থাকেন দিবাকর। এ কি সত্যিই অলৌকিক ব্যাপার?
একদিন অমনি ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখলেন এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। লোমশ সেই হাতখানার লোমগুলো একটা একটা করে যেন খাড়া হয়ে উঠছে।
পরের দিন গভীর রাতে ছবিটা দেখতে গিয়ে দিবাকরের নিজের গায়ের নোমই খাড়া হয়ে উঠল।একি আশ্চর্য ব্যাপার! মেয়েটার মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে!
আর ঠিক তখনই রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে দূরে কিসের যেন একটা শব্দ শুনতে পেলেন। ভালো করে শোনবার জন্যে তিনি কান পাতলেন। খুব দূরে একটা খটখট শব্দ।
তিনি ছুটে জানলার কাছে গেলেন। কিন্তু শব্দটা আর পেলেন না।
রোজ সন্ধ্যার সময়ে ঘরে ঘরে একা ঘুরে বেড়াবার মতো এই আর একটা নেশা এখন দিবাকরকে পেয়ে বসেছে–প্রতি রাত্রে ছবিটা লক্ষ্য করা।
একটা কথা তার প্রায়ই মনে হয়–শিল্পীর চোখের সামনেই যদি খুনটা হয়ে থাকে তাহলে তিনি বাধা দিলেন না কেন?
উত্তরও যেন খুঁজে পান–হয়তো বাধা দেবার সুযোগ পাননি।
বেশ, তাহলে ছবি আঁকার কারণ কি?
তারও উত্তর একটা এই হতে পারে যে, খুনের সত্যি ঘটনাটা হুবহু এঁকে রাখা–যেমন এখনকার দিনে লোকে ক্যামেরায় ধরে রাখে।
কিন্তু অত করবার দরকার কি ছিল?
পুলিশকে
চিন্তায় বাধা পড়ল। হঠাৎ সদাশিব হুড়মুড় করে ঘরে এসে ঢুকল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, বাবু, আবার সেই শব্দ।
শব্দ! কই? বলে উঠে জানলার ধারে গেলেন।
হ্যাঁ, শুনলেন। স্পষ্টই শুনলেন সেই শব্দ। খটাখট-খটাখট–ঠিক যেন একটা ঘোড়া দুরন্ত গতিতে ছুটে আসছে।
ও তো ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ। ফিটনে-টিটনে চড়ে কেউ যাচ্ছে। একটু থেমে আবার বললেন, এতে ভয় পাবার কি আছে? আচ্ছা যাও, ওঘর থেকে বন্দুকটা এনে দাও।
সদাশিব কাঁপতে কাঁপতে বন্দুকটা এনে দিল। দোনলা বন্দুক। ভেতরে জার্মান কান্ট্রিজ পোরা।
যাও শোওগে। কোনো ভয় নেই। আমি জেগে আছি।
ইতিমধ্যে শব্দটা থেমে গেছে। সেই পুরনো ঘড়িটায় বাড়ি কাঁপিয়ে শব্দ হলো ঢং ঢং। রাত দুটো।
.
পরের দিন দিবাকর আবার ছবিটা নিয়ে বসলেন। সেই একই প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে লাগল– আর্টিস্ট যখন স্বচক্ষে খুন হতে দেখলেন তখন পুলিশকে জানালেন না কেন?
তখনই পাল্টা প্রশ্ন–পুলিশকে জানাননি এটা জানা যাচ্ছে কি করে?
উত্তর : পুলিশকে জানানো হলেও এ ছবি আঁকার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এ ছবি যে উদ্দেশ্যমূলক তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
তাহলে পুলিশকে না জানানোর কারণ কি?
এর একটা উত্তর হতে পারে–এখানকার মতো তখন সম্ভবত পুলিশি ব্যবস্থা ছিল না। অন্তত এই নন্দীগ্রামে। কিংবা থানা-পুলিশ করতে সাহস পাননি।
তাহলে কি মনে করে নিতে হবে প্রত্যক্ষদর্শী শিল্পী আশা করেছিলেন এই ছবি দেখে কেউ না কেউ একদিন মেয়েটাকে শনাক্ত করতে পারবে, মেয়েটা যে আত্মহত্যা করেনি, খুনই হয়েছিল, সেটা প্রমাণ করে দেবে? হয়তো খুনীকেও ধরতে পারবে।
কিন্তু হায়! এ তো বহুকাল আগের ব্যাপার। কে এই হতভাগিনী মহিলা, কে ঐ খুনী, কেই বা সেই প্রত্যক্ষদর্শী আর্টিস্ট, আজ আর তা জানার উপায় নেই। খুনী কি শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছিল? তাই বা কে জানে? যদি ধরা না পড়ে থাকে তাহলে একজন নারীকে খুন করে খুনী দিব্যি বেঁচে রইল? তার শাস্তি কিছুই হলো না? এ কি ভগবানের বিচার!
