এর পর ছেঁড়া।
তারপর এক জায়গায় লেখা…আজ আরও কিছু খবর জানলাম। এ বাড়ির মেজো তরফের এক ছেলে বটুকেশ্বর খুব উচ্ছঙ্খল প্রকৃতির। সে তাদের এই ভগ্নিপতি ভবানীপ্রসকে সহ্য করতে পারে না। একটা কারণ তার খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের ইচ্ছা। এ ছাড়াও বোধহয় বৈষয়িক কারণও আছে। তাকে খুন করবার যড়যন্ত্র হচ্ছে জেনে বিজলী গভীর রাতে তার স্বামীকে বাড়ি থেকে সরিয়ে দেয়। ঘোড়ায় চেপে ভবানীপ্রসাদ পালায়। দশ মিনিট পরে শিকার পালিয়েছে জেনে ক্রুদ্ধ বটুকেশ্বর গাড়ি নিয়ে তার পিছনে ধাওয়া করে। কিন্তু তাকে ধরতে পারেনি। ভবানীপ্রসাদ সেই থেকে নিরুদ্দেশ। ফিরে এসে বটুকেশ্বর এই দূরসম্পর্কের বোনটির ওপর অকথ্য নির্যাতন করে।
আমি অবাক হই বটুকেশ্বরের এই স্পর্ধা দেখে। আর দুঃখ পাই অন্য সকলের মুখে কুলুপ আঁটা দেখে। আশ্চর্য, কেউ প্রতিবাদ পর্যন্ত করে না। এক-একসময়ে ভাবছি এ বাড়িতে আর আসব না। কিন্তু রানীমা বা ষোড়শীর একটা আশ্চর্য আকর্ষণী শক্তি আছে যে!
এর পর অনেক কটা পাতা নেই। তারপর এক জায়গায়….কোথায় কলকাতা আর কোথায় এই নন্দীগ্রাম! জানলা দিয়ে সারা দুপুর নীলচাষ দেখি। রাত্রে আমার সঙ্গে কেউ না থাকলে ঘুমোতে পারি না। শেয়ালের ডাক তো আছেই, তার ওপর আছে নানারকম নিশাচর পাখির ডাক। তা ছাড়া এখানে সবাই অল্পবিস্তর ভূতের ভয় পায়। আশ্চর্য কিছু নয়। জায়গাটা বড়ো বিশ্রী।
আমিও এসে পর্যন্ত সন্ধের পর যেখানে সেখানে ছায়া দেখি। প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু সেদিন রাত্রে বাথরুম যেতে গিয়ে পিছনের ঘোরানো সিঁড়িতে মানুষের মতো কিছু একটাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখলাম, সেদিন সত্যিই ভয় পেলাম। তবে একথা কাউকে বলিনি। কেননা তা অনেকে বিশ্বাস করবে না। কেউ কেউ সত্যিই ভয় পাবে।…
এইটুকু পড়ে দিবাকরের দুচোখ খুশিতে নেচে উঠল। যাক, এতক্ষণে ডায়েরিতে একটু ভয়ের গন্ধ পাওয়া গেল।
এমনি সময়ে ঢং ঢং করে গম্ভীর আওয়াজে সেই ঘড়িটায় বারোটা বাজল।
.
০৭.
আবার রহস্যময় ছবি
দুষ্প্রাপ্য কিছু ছবির বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল স্টেটসম্যান পত্রিকায়। দিবাকরের অনুরোধ মতো তারই কাটিং পাঠিয়েছেন সুরঞ্জন।
সেটা পেয়েই দিবাকর চলে এলেন কলকাতায়। বন্ধুর সঙ্গে হাজির হলেন পার্কস্ট্রিটের একটা ছোটোখাটো দোকানে। সেখানে এক বৃদ্ধ অ্যাংলো একটা বড়ো টেবিলে ছবিগুলো সাজিয়ে রেখেছে।
অ্যাংলো লোকটা জানাল এইসব ছবি যোগাড় করতে তাকে সারা ভারতবর্ষ ঘুরতে হয়। এবার সে বিভিন্ন রাজবংশের বেশ কিছু ছবি পেয়েছে।
দিবাকরের বড় আশা যদি সে গ্যাংটকের সেই ছবিটা পায়। যদিও সে ভালো করেই জানে একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে সে ছবি আর পাওয়া সম্ভব নয়।
ছবিগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ একটা ছবি হাতে নিয়ে দিবাকর থমকে গেলেন। সুরঞ্জনও ঝুঁকে পড়লেন।
এ তো সাংঘাতিক ছবি! না-না, এ ছবি নিও না। এ ছবি নিয়ে তুমি কি করবে?
কিন্তু দিবাকর ছবিটা দেখে এতই বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলেন যে তখনই কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তারপর যখন একটা কথাও না বলে দোকানদারকে ছবিটা প্যাক করে দিতে বললেন তখন নিরুপায় সুরঞ্জন শেষ বারের মতো চেষ্টা করলেন, তা ছাড়া ছবিটা ড্যামেজড। এই দ্যাখো, এখানে রং উঠে গেছে।
ও আমি ঠিক করে নেব।
ছবিটা ভালো করে প্যাক করিয়ে দাম চুকিয়ে দিবাকর সুরঞ্জনের বাড়ি চলে এলেন।
সুরঞ্জন বললেন, এ ছবিটা তুমি না নিলেই পারতে।
কেন?
আমার ভালো লাগছে না। কেমন যেন মনে হচ্ছে, গ্যাংটকের দোকানের সেই অশরীরী ছবিটার সঙ্গে এই ছবিটার যোগাযোগ আছে। দিবাকর, আমি বলছি একটা অদৃশ্য নিয়তি তোমাকে ঐ ছবিটা দেখিয়েছিল। সেই নিয়তিই তোমায় টেনে এনেছে তোমার পূর্বপুরুষের বাড়িতে। সেই নিয়তির প্রভাবেই এই ছবিটা তুমি বাড়ি নিয়ে যাচ্ছ। যেন তুমি তোমার সর্বনাশকে বরণ করে ঘরে তুলছ। আমার কথাটা অমন করে হেসে উড়িয়ে দিও না ভাই, অনুরোধ করছি।
দিবাকর হা হা করে হেসে উঠলেন। বললেন, আমিও কিছু একটার গন্ধ পাচ্ছি। সেটা আমি পরীক্ষা করে দেখতে চাই।
সুরঞ্জন হতাশ হয়ে গেলেন। শুধু দিবাকরকে সেদিনটা থেকে যেতে বললেন। কিন্তু দিবাকর রাজী হলেন না। বললেন, বাড়ি ছেড়ে আমি থাকতে পারি না।
সুরঞ্জন ঠাট্টা করে বললেন, হ্যাঁ, বড়োলোক মানুষদের ভাবনা অনেক।
বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে দিবাকর বললেন, টাকা-পয়সা চুরির কথা ভাবছি না। তার চেয়ে ঢের বেশি ক্ষতি হবে যদি একটা ছবি চুরি যায়।
সুরঞ্জন হেসেই বললেন, আমাদের দেশে চোর-ডাকাত-ছিনতাইবাজের অভাব নেই। কিন্তু দামী ছবির মর্ম বুঝে চুরি করার মতো উচ্চস্তরের চোরের সংখ্যা কম।
দিবাকর বললেন, তাহলে আসল কথাটা বলি শোনো। প্রত্যেক দিন সন্ধের সময় আমাদের বাড়িতে কেমন একরকম গা-ছমছমানি ভাব হয়। সেটা আমার খুব ভালো লাগে। তাই সন্ধে থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আমি বাড়িতে ঘুরে বেড়াই। সারাদিন শুধু সময় গুনি কখন বাগানের দেবদারু গাছের মাথায় দিনান্তের শেষ রোদটুকু ম্লান হয়ে আসবে, কখন জামরুল গাছের পাতার আড়ালে কি একটা বিশেষ পাখি ককিয়ে ককিয়ে ডেকে উঠবে, কখন সন্ধে নেমে আসবে আমাদের ঐ মহলেশ্বরীর আলসের গা বেয়ে।
সুরঞ্জন হেসে বললেন, এ যে দেখছি রবীন্দ্রনাথের ক্ষুধিত পাষাণ গল্প!
