এজ্ঞে?
বলছি শব্দটা একেবারে হঠাৎ থেমে যায়, না দূরে মিলিয়ে যায়?
এজ্ঞে থেমে যায়।
দিবাকর বিরক্ত হয়ে বললেন, ও তোমার শোনার ভুল। যাও, রান্না করো গে।
সদাশিব মাথা হেট করে তখনই চলে গেল।
অন্ধকার সিঁড়ি। সবে কয়েক ধাপ নেমেছে, হঠাৎ সদাশিব শক্ত হয়ে গেল। দেখল নিচ থেকে ধীরে ধীরে একটা কালো কাপড় পরা মূর্তি ওপরে উঠে আসছে ….
সেই মুহূর্তে সদাশিব কি করবে ভেবে পেল না। এদিকে মূর্তিটা তখন একেবারে ওর সামনে এসে পড়েছে।
এইরকম বিপদের সময় বিভ্রান্ত মানুষ হয় পিছু ফিরে দৌড়োয়, না হলে মরণপণ করে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সদাশিব পিছু ফেরার সময় পেল না। সে মরিয়া হয়ে মূর্তিটার ওপর ঝাঁপ দিল।
ঘরে বসে দিবাকর হুড়মুড় করে কিছু পড়ার শব্দ পেয়ে তখনই টর্চ হাতে ছুটে গেলেন। দেখলেন একেবারে সিঁড়ির তলার ধাপে সদাশিব পড়ে পড়ে গোঙাচ্ছে।
দিবাকর তাকে টেনে তুললেন। কি হয়েছে? পড়লে কি করে?
সদাশিব সিঁড়িতে বসেই অতি কষ্টে সব কথা বলে গেল। শেষে বলল, মুখটা দেখেছে। মেয়েমানুষের মুখের মতো অনেকটা। কিন্তু ভয়ঙ্কর।
মেয়েমানুষের মুখ! চমকে উঠলেন দিবাকর। তবে কি সেই ছবির মুখের অধিকারিণী নিজেই এখানে এসেছে দেখা দিতে?
.
০৬.
মিসেস ফেনটনের ডায়েরি
দিবাকর যে ডায়েরিটা পেয়েছিলেন সেটা রোজ রাত্তিরে একাগ্রমনে পড়েন। ডায়েরিটার অনেক জায়গাতেই ছেঁড়া। কোথাও কোথাও লেখা বিবর্ণ হয়ে গেছে। পড়া দুষ্কর। ডায়েরিটা লিখেছিলেন মিসেস ফেনটন নামে উত্তর আয়ারল্যান্ডের এক মহিলা। সালটাও পরিষ্কার নয়। শুধু কোনোরকমে ১৮ পর্যন্ত পড়া গেছে।
ডায়েরিটার বৈশিষ্ট্য প্রত্যেক চ্যাপটারের মাথায় একটা মেমের স্কেচ আঁকা। সম্ভবত মেম নিজেই নিজের স্কেচ করেছেন। মেমের বয়েস আনুমানিক পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ।
ডায়েরির বেশির ভাগ জুড়েই তার ঘরগেরস্থর কথা। ডায়েরিটা বাংলায় অনুবাদ করলে এইরকম দাঁড়ায়–এক জায়গায় লিখেছেন…আমি যখন অফিসারের স্ত্রী হয়ে প্রথম কলকাতায় এলাম তখন আমার কাজের জন্যে আটজনের একটা দল পাঠানো হলো। তার মধ্যে একজন রাঁধুনী, তার সঙ্গে তার মশলাদার বা সহকারী। একজন খানসামা যে টেবিলে খাবার পরিবেশন করবে এবং সেইই বাজার-হাট করবে মেমসাহেবের (অর্থাৎ আমার) হুকুম অনুসারে। এটা ধরেই নেওয়া হতো প্রতি টাকায় সে দু আনা নেবে। এছাড়া টাকা-পয়সার হিসেবেও তঞ্চকতা করত। যেমন একটা মুর্গি তিন আনাতে পাওয়া যেত কিন্তু সে হিসেবে দেখাত আট আনা থেকে বারো আনা। তিন টাকার একটা শুয়োর কিনে লিখত পাঁচ টাকা। একটা পাঁঠার পা আট আনায় কিনে দু টাকা বলত। দুজন খিদমদগার সবসময়ে আমার পাশে পাশে থাকত কিছু বলামাত্র তা করার জন্য। খানসামার কাজ ছিল শুধু টেবিলে খাদ্য পরিবেশন করা। খিদমদগার লক্ষ্য রাখত কেউ কাঁটাচামচ পকেটে ঢুকিয়ে সরে পড়ছে কিনা। কেননা ওগুলো ছিল রুপোের। দরজি, ভিস্তিওয়ালা সর্বক্ষণ অপেক্ষা করে থাকত কখন কোন কাজে ডাক পড়বে।
কিন্তু নন্দীগ্রামে এসে জমিদারবাড়ি মহলেশ্বরীতে গিয়ে সেখানকার রানীদের পরিচারিকার সংখ্যা, সৌন্দর্য আর সপ্রতিভ ভাব দেখে চমকিত হয়েছি। সবাই সুন্দরী। পুরুষরাও সুন্দর। কারো কারো গোঁফ কটা। ভারি ভলো লাগত।
এঁদের খানদানি কায়দা-কানুন দেখলে ভাবি এঁরাই যদি এমন হন তাহলে না জানি মোগল বাদশাহের হারেম কিরকম ছিল।
এর পর খানিকটা ছেঁড়া। তারপর লেখা…এ বাড়িতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মহিলা এ বাড়ির রানীমা। বয়েস পঞ্চাশ-এর কাছাকাছি। কিন্তু অপূর্ব সুন্দরী। ঠিক যেন হিন্দুদের গডেস, দুর্গা। আমি তার একটা ছবিও এঁকেছি। ভাবছি কোনো একটা অনুষ্ঠান উপলক্ষে এটি তাকে প্রেজেন্ট করব।
এ বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন যে কত তার শেষ নেই। আমি এতদিন আসছি তবু সবাইকে চিনতে পারি না। নামও ভুলে যাই। ছোটো পুত্রবধূ যোড়শীই আমার বান্ধবী। ভারি মিষ্টি
মেয়েটা।
এ বাড়িতে বড়ো তরফ, মেজো তরফ, ছোটো তরফ নামে এক-একটা পরিবার আছে।
এ বাড়িতে একজন বিবাহিতা মেয়ে আছে–বছর চব্বিশ বয়েস। বেশ সুন্দরী কিন্তু খুব তেজী আর মেজাজী। সে সবসময়ে ভুরু উঁচিয়েই আছে। খুব কম কথা বলে। তাকে আমার তেমন ভালো লাগে না। তবে যখন জানলাম যে, কোনো বিশেষ কারণে তাকে বাপের বাড়িতেই থাকতে হয় আর তার স্বামী আসে মাসে মাত্র দু-তিন বার, আর তাকে বিশেষ। করে স্বামীকে কেউ পছন্দ করে না, বরঞ্চ খুব অনাদর, অবহেলা করে তখন তার প্রতি আমার সহানুভূতি হলো, শুধু তাই নয়, সেদিন এক মারাত্মক খবর শুনলাম–এ বাড়িরই কোনো ছেলে মেয়েটার (মেয়েটার নাম বিজলী) স্বামীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে যাতে সে এ বাড়ি ঢুকতে না পারে। উঃ! কী নিষ্ঠুর! আর কেউ তার প্রতিবাদ করছে না। কাজেই মেয়েটা যে সবার ওপর বিরক্ত হবে এ তো স্বাভাবিক।
কিন্তু ষড়যন্ত্র কিসের কারণে তা এখনো পরিষ্কার জানতে না পারলেও আভাসে ইঙ্গিতে এইটুকু জেনেছি যে, জামাই নাকি খ্রিস্টধর্মাবলম্বী হতে চায়।
এখন মনে পড়ছে ভবানীপ্রসাদ নামে একজন ইয়ং স্মার্ট, হ্যান্ডসাম ছেলে প্রায়ই আমাদের ওখানে যায়। খ্রিস্টধর্ম নিয়ে আলোচনা করে। তাহলে এই ভবানীপ্রসাদই কি এ বাড়ির জামাই– বিজলীর স্বামী?
