তা সেই ছবি আঁকার জন্যে এখানে এসে থাকার কারণ কি?
একটু চুপ করে থেকে দিবাকর বললেন, তুমি ছবি আঁক না, তাই বুঝবে না নিজে চোখে না দেখলে নিজের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে স্পর্শ করতে না পারলে কখনো ওরকম ছবি আঁকা যায় না। ঐরকম কিছু এ বাড়িতে দেখতে পাব, এই আশাতেই আমি এখানে এসেছি।
তুমি নিশ্চিত এখানে কিছু পাবে?
হ্যাঁ। অতীতে এ বাড়িতে অনেক গুপ্তহত্যা হয়ে গেছে বলে শুনেছি। স্থানীয় লোকেরাও নাকি এ বাড়িটা এড়িয়ে চলে। হতে পারে এটা ওদের সংস্কার। কিন্তু এই কদিনে আমি যেন কিছুর আভাস পাচ্ছি। আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি।
পেয়েছ কিছু?
ঐ যে বললাম, আভাস পাচ্ছি। যেমন প্রথম দিন ওপাশের ঘরে ঢুকতেই অন্ধকারে স্পষ্ট দেখলাম সেই ছবিটা দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে। তবে অনেক বড়। অত বড়ো ছবি কেউ দেওয়ালে টাঙায় না।
তারপর?
তারপর সদাশিবকে টর্চ আনতে বললাম। আলো জ্বেলে দেখি সব ফাঁকা।
একটু থেমে বললেন, তুমি শুধু তুমি কেন, সবাই বলবে চোখের ভুল। তা হতে পারে। কিন্তু তবু কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।
সুরঞ্জন হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন।
চলো তো ঘরটা দেখে আসি।
দুজনে পাশের ঘরে গেলেন। বন্ধ দরজা-জানলা খোলা হলো। ধুলোর গন্ধ, মাকড়সার জাল, একটা বিছানাশূন্য খাট ছাড়া আর কিছুই দেখার নেই।
সুরঞ্জন অনেকক্ষণ ধরে ঘরটা পরীক্ষা করলেন। তারপর ফিরে এসে সোফায় গুম হয়ে বসে রইলেন।
দিবাকর বন্ধুর পিঠ চাপড়ে বললেন, কি হলো? কিছুর সন্ধান পেলে নাকি?
সুরঞ্জন গম্ভীর গলায় বললেন, আমার মনে হচ্ছে তুমি নিজেকে বিপদের মধ্যে জড়িয়ে ফেলছ। আমি নিজে প্রেতচর্চা করি। খবরের কাগজে আমার কথা অনেক লেখা হয়েছে। আমি বলছি এ বাড়িটা বিপজ্জনক।
দিবাকর উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন, তুমি তাহলে বলছ–এখানে সত্যিই কিছু আছে। বেঁচে থাকো ভাই, বেঁচে থাকো। আমি তো তাই চাই।
না, না, দিবাকর! গোঁয়ার্তুমি কোরো না। আমি বলি তুমি এ বাড়িটা ছেড়ে দাও।
দিবাকর গলা ফাটিয়ে হেসে উঠে জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, নো .. নো .. নো…
নিচে রান্নাঘরে বসে দিবাকরের ঐরকম উৎকট হাসি শুনে সদাশিব চমকে উঠল।
হাসি থামিয়ে দিবাকর সুরঞ্জনকে আর একটা নতুন খবর দিলেন। একটা দেরাজের ভেতর থেকে একটা পুরনো ডায়েরি পেয়েছেন। শুধু ডায়েরিই নয়, দেরাজের মধ্যে আরো ছিল সাহেবদের একটা টুপি, একটা ছড়ি, মহারানী ভিক্টোরিয়ার একটা ছবি, আর মেমেরা যেরকম পরে সেরকম একটা গাউন। সম্ভবত দেরাজটা কোনো সাহেববাড়ির। কিভাবে সেই দেরাজ জমিদারবাড়িতে এল তার মীমাংসা তিনি এখনও করে উঠতে পারেননি, তাও জানালেন। হয়তো এ বাড়ির সঙ্গে সাহেবদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
ডায়েরিটা একজন মেমসাহেবের লেখা। অনেকগুলো পাতা নেই। ছিঁড়েও গেছে অনেক জায়গায়। ডায়েরিটা তিনি পড়ছেন। ভারি ইন্টারেস্টিং।
সুরঞ্জন বললেন, ডায়েরিটা পড়াও আমাকে।
দিবাকর জোরে জোরে মাথা নাড়লেন। বললেন, আগে আমি শেষ করি। তারপর তুমি একদিন এসে সারাদিন বসে বসে পড়ো।
সুরঞ্জন হেসে বললেন, তার মানে তুমি ওটা হাতছাড়া করতে চাও না।
ঠিক তাই। ওটা অমূল্য সম্পদ। এই রহস্য নিকেতনের চাবিকাঠি।
সুরঞ্জন কলকাতা ফিরে গেলেন। বলে গেলেন, কোনো বিপদের সম্ভাবনা দেখলেই যেন খবর দেয়।
.
সেই দিনই। রাত তখন সবে সাড়ে আটটা। দিবাকর নিজের ঘরে বসে ডায়েরিটা পড়ছিলেন, সদাশিব এসে দাঁড়ালো।
কি খবর সদাশিব! খাবার রেডি?
না, বাবু, একটু দেরি আছে।
বেশ, যাও।
সদাশিব তবু গেল না।
কিছু বলবে নাকি?
হ্যাঁ, বাবু।
বলে ফ্যালো।
এ বাড়িটা ছেড়ে অন্য কোথাও গেলে হয় না?
দিবাকর নন্দী অবাক হয়ে বললেন, কেন? এ তো আমার নিজের বাড়ি।
তা তো জানি। কিন্তু এ বাড়িতে–সদাশিবের কথা আটকে গেল।
থামলে কেন? বলো।
এ বাড়িতে ভয়ের ব্যাপার আছে।
গভীর রাতের আগন্তুক
দিবাকরের দু চোখ খুশিতে চনমন করে উঠল।
তাই নাকি? কিরকম ভয় বলো তো শুনি। আমি তো ভয়ের জন্যেই এখানে পড়ে আছি। কিন্তু এমনই কপাল, ভয়ের টিকিটি দেখতে পেলাম না আজ পর্যন্ত।
সদাশিব অবাক হয়ে শুনল। তার মনিব বলে কী! মানুষটা সত্যিই পাগল হয়ে গেল নাকি?
তা তোমার ভয়ের বাণী একটু শোনাও। দিবাকর ডায়েরির পাতা থেকে মুখ তুলে তাকালেন।
সদাশিব মাথা নিচু করে বললে, সন্ধের পর প্রায়ই দেখি সিঁড়ি দিয়ে ওপরে কেউ যেন উঠে যাচ্ছে। চোর ভেবে আমি পিছু ধাওয়া করেছিলাম। কিন্তু আদ্ধেক সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে সে যে কোথায় মিলিয়ে যায় তা আর দেখতে পাই না।
এরকম কতদিন দেখেছ?
এজ্ঞে তা এসে পর্যন্ত।
তাই নাকি! তা আমি তো বাছা একদিনও দেখতে পাই না।
এর আর উত্তর কী দেবে? একটু চুপ করে থেকে সদাশিব বলল, আমার ঘরটা সিঁড়ির কাছেই। ও ঘরে আমি থাকতে পারব না।
দিবাকর খুব খানিকটা হেসে বললেন, ও এই ব্যাপার? তা ঠিক আছে। তুমি দোতলাতেই শুয়ো।
সদাশিব তবু দাঁড়িয়ে রইল। দিবাকর জিজ্ঞেস করলেন, আর কিছু বলবে?
এজ্ঞে রোজ রেতে আমি একটা শব্দ শুনতে পাই।
শব্দ! কিসের শব্দ?
খুব দূরে–মানে বড়ো রাস্তায়। ঠিক যেন একটা ঘোড়ার গাড়ি যাচ্ছে।
তা তো যেতেই পারে।
সদাশিব মাথা চুলকে বলল, কিন্তু রোজ রাতদুপুরে ঘোড়ার গাড়ি যাবে? একটু পরেই কিন্তু শব্দটা থেমে যায়!
থেমে যায়, না মিলিয়ে যায়?
