একটু থেমে বললেন, শরীর ধারণ ছাড়াও এই আত্মার আবার অন্যরকম প্রক্রিয়াও আছে। জানেন কি যোগীরা তাঁদের অসাধারণ ক্ষমতায় নিজেদের দেহ থেকে আত্মাকে কিছুকালের জন্যে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারতেন? সেও এক অলৌকিক ব্যাপার বিজ্ঞান যার ব্যাখ্যা করতে পারেনি।
মিস থাম্পি রীণার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ঘুম পাচ্ছে?
রীণা তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসে বলল, না। আপনার কথা শুনতে বেশ ভালোই লাগছে।
মিস থাম্পি হেসেই বললেন, ধন্যবাদ।
বেশ, তাহলে প্রথমে যোগীদের দেহ থেকে আত্মাকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করার একটা গল্প বলি। বলে সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন।
সঞ্জয় চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বললে, চালিয়ে যান।
–অনেক দিন আগের কথা। এক ইংরেজ দম্পতি ভারতে কার্যরত থাকাকালীন বায়ুপরিবর্তনের জন্যে সিমলা পাহাড়ে গিয়েছিলেন। ইংরেজ ভদ্রলোক ছিলেন বৃটিশ-ভারতের একজন উচ্চপদস্থ অফিসার। দেশ তার ইংলন্ডে।
সিমলায় আসবার আগেই মেমসাহেবের শরীর খারাপ হয়েছিল। অল্প অল্প জ্বর হতো। সেটা খুব খারাপ লক্ষণ। সিমলাতে চেঞ্জে এসেও শরীর ঠিকমতো সারল না।
এই সময়েই আবার এক দুঃসংবাদ এল, সাহেবের বাবা লন্ডনে মারা গেছেন। সেই খবর পেয়েই সাহেব চলে গেলেন। মেমসাহেব শরীর খারাপের জন্যে যেতে পারলেন না।
লন্ডনে পৌঁছে সাহেব নিয়মিত চিঠি দিয়ে স্ত্রীর খবর নিতেন। প্রতি চিঠিতেই আশ্বাস শীগগিরই যাচ্ছি।
মেমসাহেব পথ চেয়ে থাকেন। কিন্তু বেশ কিছুকাল হয়ে গেল–স্বামী আর ফেরেন না। চিঠিপত্রও পান না। তার মন খুব খারাপ।
একদিন ভোর রাত্রে মেমসাহেব ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠলেন। ঘরে তাঁর যে খাস-পরিচারিকা ছিল সে ইংরেজ রমণী। তাড়াতাড়ি মেমসাহেবের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে?
মেমসাহেব পরিচারিকার সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেলার জন্যে লজ্জিত হলেন। বললেন, স্বপ্ন দেখছিলাম সাহেব কঠিন রোগে মৃত্যুশয্যায়। তাই তিনি আসতে পারছেন না।
মেমসাহেব খাঁটি ইংরেজ মহিলা। তাই স্বপ্নকে স্বপ্ন বলেই মেনে নিলেন। গুরুত্ব দিলেন না।
কিন্তু গুরুত্ব না দিলেও তার মনটা অত্যন্ত ভার হয়ে রইল।
মেমসাহেবের অন্য যে দাসী, সে ছিল তিব্বতীয়। মনিবের মন খারাপ তারও দৃষ্টি এড়ায়নি। রোজই দেখে–আর ভাবে মেমসাহেবকে জিজ্ঞেস করবে কি হয়েছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে সাহস পায় না। শেষে খাস পরিচারিকাকে জিজ্ঞেস করে কারণটা জানতে পারল। তখন সে সসংকোচে তাকে বলল, মেমসাহেব যদি চান তাহলে সাহেবের খবর আজকের মধ্যেই আনিয়ে দিতে পারি।
খাস-পরিচারিকা অবাক হয়ে বলল, কি করে?
তিব্বতী দাসী তখন তাকে তার উপায়ের কথা জানাল।
ইংরেজ দাসী তা পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও এ দেশের অনেক ভোজবাজির কথা ছোটোবেলা থেকে শুনেছে। তাই তিব্বতীর কথা একেবারে উড়িয়ে না দিয়ে মেমসাহেবকে বলল। মেমসাহেব তখনই তিব্বতী দাসীকে ডেকে পাঠালেন। দাসী এলে তাকে বললেন, তুমি যে লোকটির কথা বলছ সে কি করে? কোথায় থাকে?
দাসী বিনীতভাবে জানালো যে, যাঁর কথা সে বলছে তিনি একসময়ে লামা সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। কি কারণে যেন তিনি সেই পদ ছেড়ে দিয়ে এখন লোকচক্ষুর অন্তরালে একটা পাহাড়ের নিচে আত্মগোপন করে থাকেন।
মেমসাহেব সকৌতূহলে জিজ্ঞেস করলেন, আত্মগোপন করে কেন?
দাসী বললে, তিনি এক বিশেষ সাধনায় সিদ্ধ বলে ঈর্ষাকাতর অন্য দল তাকে মেরে ফেলতে চায়।
শুনে মেমসাহেব স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।
—সত্যিই তিনি এত গুণী লোক?
— মেমসাহেব, আমি নিজে চোখে তার সেই গুণ দেখেছি।
–কিন্তু তুমি যা বলছ তাতে তো মনে হচ্ছে তাকে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। আর–পেলেও হয়তো আসতে চাইবেন না।
দাসী অন্যমনস্কভাবে বলল, আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। যদি পাওয়া যায় তাহলে আজই উনি সাহেবের খবর এনে দেবেন।
মেমসাহেব জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় কত দূরে–কোন পাহাড়ের নিচে উনি থাকেন?
দাসী বলল, এখান থেকে ক্রোশ তিন দূরে–ঐ যে ধোঁওয়ার মতো তিনচূড়ো পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে ওরই কাছে উনি থাকেন।
মেমসাহেব বললেন, উনি যদি তোমার কথায় আসতে না চান–আমি কি গিয়ে request করব?
দাসী বলল, তার দরকার হবে না। তাছাড়া পথ দুর্গম। গাড়ি চলবে না। আপনার পক্ষে হেঁটে যাওয়াও সম্ভব নয়।
মেমসাহেব চুপ করে রইলেন। দাসী বলল, আর তার কাছে যেতে হলে যেতে হবে গোপনে। কেননা তার শত্রুরা তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
শুনে মেমসাহেব হতাশ হয়ে পড়লেন। তখন দাসী বলল, আপনি অনুমতি করলে আমি নিজে গিয়ে একবার চেষ্টা করতে পারি।
মেমসাহেব সানন্দে অনুমতি দিলেন।
পরের দিন ভোরবেলায় তিব্বতীয় দাসীটি লামার খোঁজে বেরিয়ে গেল। আর সন্ধেবেলা ফিরল লামাকে নিয়ে।
লামা এসেছে শুনে মেমসাহেব খুশি মনে দোতলা থেকে নেমে এলেন। কিন্তু লামার চেহারা দেখে তার ভক্তি হল না। যেমন আমাকে দেখে আপনাদের হয়েছে। বলে মিস থাম্পি একটু হাসলেন।
–যাক, যে কথা বলছিলাম। মেমসাহেব দেখলেন লোকটি বৃদ্ধ। মাথায় দীর্ঘ পাকা চুল, পাতলা পাকা গোঁফ দাড়ি। হাত, পা শীর্ণ। দেহ তো নয়, যেন একখানা কংকাল। দুই চোখ কোটরাগত। চোখের নিচে কালি পড়েছে। তার সারা মুখের চামড়া কুঁচকানো। গলায় নীল পাথরের একটা মালা। অমন গাঢ় নীল পাথর মেমসাহেব কখনো দেখেননি।
