সঞ্জয় হেসে বলল, না ম্যাডাম, ভয়টা আমার এমনিতেই কম। ভূত-প্রেতের ভয় তো জীবনে কোনোদিন করিনি। ওসব আমি মানিও না।
একটু থেমে বলল, তাছাড়া আমি ডাক্তার। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া–
–বিজ্ঞানই কি শেষ কথা? বিজ্ঞানের এক্তিয়ারের বাইরে কি কিছু থাকতে পারে না?
–থাকতে পারে। তবে তা নিয়ে অকারণে মাথা ঘামাবার মতো যথেষ্ট সময় আমার নেই।
মিস থাম্পি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কি মনে করেন এ বাড়িতে ও-সব কিছু নেই? সবটাই আপনার ওয়াইফের মনের ভুল?
সঞ্জয় সেই দৃষ্টির সামনে তাকাতে পারল না। চোখ নিচু করে উত্তরটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, এই তত গতকালই সারারাত এঘরে আমি একা ছিলাম। দিব্যি ছিলাম। কোনো কিছুই দেখিনি, কোনো শব্দও না।
মিস থাম্পি বললেন, আপনার সঙ্গে তো তার ব্যাপার নয়। কাজেই আপনাকে শুধু শুধু দেখা দেবে কেন?
সঞ্জয় হেসে অবিশ্বাসের সুরে বলল, তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন আমার স্ত্রীর সঙ্গেই শুধু তার কিছু ব্যাপার আছে। তাই সে তাকে ভয় দেখায়।
–হয়তো তাই।
—কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করব কি করে? বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ কই?
মিস থাম্পি একটু যেন কঠোর সুরে বললেন, এসব জিনিস জনসমক্ষে প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
রীণা ইশারায় সঞ্জয়কে চুপ করতে বলল। সঞ্জয় চুপ করে গেল।
মিস থাম্পি তার কথার জের ধরে বললেন, প্রমাণ দিতে আমিও পারব না, হয়তো প্রতিকারও আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে আজ রাত্রে একবার পরীক্ষা করে দেখব বলেই এলাম।
সঞ্জয় বলল, ভালো কথা। আপনি নিজে থেকে দেখুন কোনো পাওয়া যায় কিনা।
তারপর রীণার দিকে তাকিয়ে বলল, তাহলে আজই আঁ কিংবা না হয়ে যাচ্ছে। কি বল?
রীণ কোনো উত্তর দিল না।
সঞ্জয় কথাটা বলল বটে কিন্তু বিশ্বাস না করেই। মিস থাম্পি যদি পরদিন সকালে কফি খেতে খেতে গল্প দেন যে তিনিও সেই কালো-সুট-পরা লোকটিকে স্বচক্ষে দেখেছেন তা হলেও সে বিশ্বাস করবে না। কেননা তা বিশ্বাস করা যায় না।
.
খাওয়া অনেকক্ষণ হয়ে গিয়েছিল। শীতের রাতও গম্ভীর হয়ে উঠছিল।
হঠাৎই মিস থাম্পি রীণাকে জিজ্ঞেস করলেন–আচ্ছা, সিঁড়িটা সম্বন্ধে আপনার অভিজ্ঞতা কিরকম? তার মানে আমি বলতে চাইছি সিঁড়ি দিয়ে যখন আপনি ওঠা-নামা করেন তখন কি কিছু ফিল করেন?
রীণা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল, না তো!
সঞ্জয় হেসে বলল, রীণার মনে নেই-ওর একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। প্রথম দিনই বেচারি উঠতে গিয়ে আচমকা গড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল।
মিস থাম্পি এক মুহূর্ত যেন থমকে গেলেন। কিন্তু কিছু বললেন না।
.
রাত সাড়ে দশটা বাজল। তবু কেউ শোবার নাম করছে না। মিস থাম্পিও না। তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কলকাতার হালচাল জিজ্ঞাসা করছিলেন।
একসময়ে মান্তু বলল, মিস থাম্পি, আপনি যদি আপনার অভিজ্ঞতা থেকে দুএকটা গল্প শোনান তাহলে শীতের রাতে বেশ জমবে।
একথায় মিস থাম্পি গম্ভীর হয়ে গেলেন। একটু যেন বিরক্ত হয়ে বললেন, দেখুন আপনারা যাকে গল্প বলেন, আমি দুঃখিত, সেরকম কিছু আমার জানা নেই। আমি সারাজীবন দেশ-বিদেশ ঘুরে যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছি তা গল্প নয়। তা নিয়েই আমার সাধনা। সেসব আমার নিজস্ব সম্পদ!
মান্তুর মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। বলল, excuse me! আমি দুঃখিত।
মিস থাম্পি আর কিছু বললেন না। কিন্তু পরিবেশটা ভারী হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ কাটল। তার পর নীরবতা ভাঙলেন মিস থাম্পি নিজেই। হাসতে হাসতে বললেন, আমার কথায় আপনারা ক্ষুণ্ণ হলেন বুঝতে পারছি। আচ্ছা, একটা সত্য ঘটনা বলছি শুনুন, যার মীমাংসা এখনো হয়নি।
মিস থাম্পি একটু থামলেন। সকলেই নড়েচড়ে বসলেন। কেবল সঞ্জয়ের মধ্যে তেমন কোনো চাঞ্চল্য দেখা গেল না।
কলকাতা থেকে কাল আমার ভুটান যাবার কথা। ওখানে একটা ঘটনা ঘটেছে বলে খবর পেয়েছি। বলে মিস থাম্পি থামলেন। সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ডাঃ গুপ্ত, ঘটনাটা আপনার বিশ্বাসযোগ্য না হলেও এঁদের শোনাচ্ছি। অলৌকিক শব্দটা আমরা প্রায়শই শুনে থাকি এবং নানা প্রসঙ্গে ব্যবহারও করে থাকি। অলৌকিক অর্থাৎ এমন-কিছু যা বাস্তবজীবনে সচরাচর ঘটে না বা যা বিজ্ঞানসম্মত নয়। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক সাধকই তাঁদের কঠোর সাধনালব্ধ বিভূতি বা অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় দিয়ে গেছেন। তন্ত্রমন্ত্রের কথা আপনারা সবাই শুনেছেন। আমাদের দেশের বৌদ্ধ আর হিন্দু তান্ত্রিকেরা নির্জনে এমন অনেক কিছু করতেন যা সাধারণ মানুষের জ্ঞানের বাইরে।
মিস থাম্পি একটু থামলেন। তারপর বলতে লাগলেন, অনেকের বিশ্বাস বৌদ্ধরাই আদি তান্ত্রিক।
এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটা কথা মনে রাখবেন–এই তন্ত্রশাস্ত্রের উৎপত্তি হিমালয় অঞ্চলে। অর্থাৎ কৈলাস, চীন, নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি জায়গায়।
আমার এইসব কথা বলার উদ্দেশ্য অলৌকিকতত্ত্বে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা বোধহয় নেপাল, তিব্বত, ভুটানেই বেশি। এই অলৌকিকতত্ত্বের মধ্যে প্রেততত্ত্বও জড়িয়ে আছে।
দুঃখের বিষয় অলৌকিকতত্ত্ব ও প্রেততত্ত্ব এখন ভয়-পাওয়ানো গাঁজাখুরি গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারও একটা কারণ বোধহয় এই যে, মানুষ ভয় পেতেও চায়। অশরীরী আত্মা আর তথাকথিত ভূত-প্রেত এক কথা নয়। কিন্তু সেকথা সাধারণ মানুষকে বোঝান যায় না। অশরীরী আত্মার অস্তিত্ব আছে। অনেকেই তা প্রত্যক্ষ করেছে। এমনকি তাদের কথা বলতেও শুনেছে। আশ্চর্য নয় কি? দ্বন্দ্ব এখানেই, আমি বলব আত্মা শরীর ধারণ করতে পারে–যে শরীর দেখা যাবে কিন্তু স্পর্শ করা যাবে না–যে শরীর কোনো চিহ্ন রেখে যেতে পারে না। ডাঃ গুপ্ত বলবেন, অসম্ভব। কিন্তু মিসেস গুপ্ত যাঁকে প্রায়ই দেখেন তিনিও যে ঐরকম কোনো শরীরী আত্মা তা আমি বিশ্বাস করি। কেননা ঐ ধরনের শরীরী আত্মার আমি প্রত্যক্ষদর্শী।
