লোকটি এমন ক্ষীণ স্বরে জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলছিল যে মেমসাহেব তার একবর্ণও বুঝতে পারছিলেন না। যাই হোক সেই তিব্বতী দাসীর সাহায্যে কথাবার্তাটা এইরকম হল
মেমসাহেব বললেন, শুনেছি আপনার নাকি এমন ক্ষমতা আছে যে আপনি এখানে বসেই বহুদুরের খবর এনে দিতে পারেন। তাই যদি হয় তাহলে আপনি দয়া করে আমার স্বামীর খবর জানান। তিনি এখন লন্ডনে আছেন। বেশ কিছু দিন খবর পাচ্ছি না। স্বপ্নে দেখলাম তিনি নাকি শয্যাশায়ী। আমি খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।
লামা পথশ্রমে ক্লান্ত বলে সেদিনটা বিশ্রাম করে পরের দিন খবর এনে দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন।
কিন্তু মেমসাহেব আর এক দণ্ডও অপেক্ষা করতে চাইলেন না। অগত্যা বৃদ্ধ লামাকে সম্মত হতে হল। তখন শ্রাবণ মাসের বেলা প্রায় শেষ। লামা প্রথমে আনুষঙ্গিক কতকগুলি কাজ শেষ করে নিয়ে সাহেবের ঠিকানা জেনে নিলেন। আর তার একটা ছবি দেখে নিলেন। তারপর খালি গায়ে মাটিতে শুয়ে পড়ে বললেন, আমি আপনার স্বামীর খবর আনতে চললাম। আমার দেহ এখানে পড়ে রইল। যদি বাধা-বিঘ্ন না ঘটে তাহলে এক ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে আসব। তবে একটা অনুরোধ–আমার জীবন-মরণের সব দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে।
মেমসাহেব চমকে উঠলেন।-কেমন করে?
লামা বললেন, আমার দেহ যেন কেউ স্পর্শ না করে, এইটুকু দেখবেন।
–নিশ্চয় দেখব। মেমসাহেব প্রতিশ্রুতি দিলেন।
–আরও একটি কথা–আমি যখন এখানে আসছিলাম, বুঝতে পারছিলাম আমার শত্রুরা আমায় অনুসরণ করছে। তারা হয়তো একটু পরেই এখানে এসে হানা দেবে। আমার দেহটা কেড়ে নিয়ে যেতে চাইবে। আপনি দয়া করে বাধা দেবেন। কথা দিন–পারবেন তো?
মেমসাহেব ইংরেজরমণী। অসুস্থ হলেও তাঁর মনের জোর ছিল অসাধারণ। সব দিক ভেবে নিয়ে বললেন, ঠিক আছে। দায়িত্ব নিলাম। আপনি নিরুদ্বেগে গিয়ে আমার স্বামীর খবর নিয়ে আসুন।
এই অঙ্গীকার পেয়ে লামা যোগনিদ্রায় সমাহিত হলেন। সকলেই দেখলেন লামার অসাড় দেহটা মাটিতে পড়ে আছে যেন বহুকালের পুরনো শুকনো একটা মৃতদেহ।
এই সময়ে তিব্বতী দাসীর খেয়াল হল নিচের দরজাটা বোধহয় ভোলাই থেকে গিয়েছে। সে নিজেই দেখতে যাবে ভাবছিল কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক লামার দেহ ছেড়ে নিচে যেতে মন চাইল না। তখন সে দরজা বন্ধ করার কথা ইংরেজ পরিচারিকাটিকে নিচু গলায় বলল।
ইংরেজ পরিচারিকা যাচ্ছি বলেও সকৌতূহলে লামার নিঃসাড় দেহের দিকে তাকিয়ে রইল। যাবার কথা ভুলে গেল।
আধঘণ্টাও হয়েছে কি না সন্দেহ হঠাৎ নিচে একটা গোলমাল শোনা গেল। কারা যেন দারোয়ান-বেয়ারা-বাবুর্চিদের ঠেলে জোর করে ওপরে উঠে আসতে চাইছে।
মেমসাহেব বিচলিত হলেন। কিসের এত গোলমাল? তিনি ইংরেজ দাসীকে ব্যাপারটা কি জেনে আসবার জন্যে পাঠালেন। ইংরেজ দাসী ব্ৰস্তপদে নিচে নেমে গেল। কিন্তু পাঁচ মিনিট যেতে-না-যেতেই ছুটতে ছুটতে এসে জানালো একদল জংলী জোর করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তারা লামাকে চায়।
-কেন? মেমসাহেবের ভুরুতে ক্রোধের প্রকাশ ফুটে উঠল।
ইংরেজ দাসী উত্তর দেবার আগেই মেমসাহেব দেখলেন কয়েকজন তিব্বতী জংলী দোতলায় উঠে হৈ হৈ করে ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে।
মেমসাহেব রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন–Who are you? What makes you to come here?
তারা মেমসাহেবের কথা বুঝল না। বুঝতে চাইলও না। তাদের সকলের দৃষ্টি তখন লামার দেহের ওপর। বাড়িতে তেমন লোকজন নেই যে সেই উন্মত্ত লোকগুলোকে বাধা দেয়। জংলী লোকগুলো বোধহয় তা বুঝতে পেরেছিল। তাই তারা নির্ভয়ে ঘরের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
ইংরেজ দাসী তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। সে পুলিশ ডাকার জন্যে জানলার দিকে ছুটে যাচ্ছিল, মেমসাহেব তাকে আটকালেন। কঠিন স্বরে বললেন, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো।
তারপর এক মিনিটের মধ্যে ছুটে গিয়ে ড্রয়ার থেকে গুলিভরা রিভলভারটা এনে দুবার ফায়ার করলেন। সঙ্গে সঙ্গে লোকগুলো যে যেদিকে পারল পালালো।
-যাও! দরজা লাগিয়ে এসো। বলে মেমসাহেব ইজিচেয়ারে বসে হাঁপাতে লাগলেন। তার শরীর একেই দুর্বল, তার ওপর এই উত্তেজনা। রিভলভারটা কিন্তু তখনো তার হাতের মুঠোয়।
তিব্বতী দাসী তখনও লামার দেহের ওপর–তাকে স্পর্শ না করে দুহাত দিয়ে আগলে বসে ছিল।
এবার সে উঠে নিজের জায়গায় গিয়ে বসল।
আরো আধঘণ্টা পরে লামার দেহটা একটু নড়ল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন।
মেমসাহেব আনন্দে লামার ওপরে ঝুঁকে পড়লেন। লামা ইশারায় একটু জল খেতে চাইলেন। মেমসাহেব তিব্বতী দাসীকে জল দিতে বললেন।
জল খেয়ে সেই লামা যোগী আস্তে আস্তে উঠে বসলেন। তারপর তার সেই ক্ষীণ স্বরে বললেন, আপনার স্বামী ভালোই আছেন। দেখলাম জিনিসপত্র গোছগাছ করছেন। বোধহয় আজ-কালের মধ্যেই এখানে আসার জন্যে রওনা হবেন।
শুনে মেমসাহেব আনন্দে কিছুক্ষণ চোখ বুজিয়ে রইলেন।
তারপর লামা ধীরে ধীরে তাঁর ঘরের বর্ণনা দিলেন। শুনতে শুনতে মেমসাহেব তো অবাক। শেষে লামা বললেন, তবে আপনার বাড়ির দক্ষিণদিকে যে সুন্দর বাগানটা ছিল সেটা সম্প্রতি ঝড়ে তছনছ হয়ে গেছে।
বাগানটাও যোগীর চোখে পড়েছে তা হলে! মেমসাহেব মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
লামা সেই রাত্তিরেই চলে যেতে চাইলেন। কিন্তু মেমসাহেব যেতে দিলেন না। পরের দিন অতি প্রত্যূষে যাবার সময়ে লামা মেমসাহেবের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। মেমসাহেবও চোখ নামাতে পারেননি।
