পৌনে নটা হতে চলল।
নাঃ, আর দেরি করা যায় না। সঞ্জয় ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তালা লাগালো। এমনি সময়ে সিঁড়ির মুখে বন্দনা এসে দাঁড়ালো।
-আপনার ফোন।
–ফোন! সঞ্জয় চমকে উঠল। কার ফোন হতে পারে? সেদিন রাতে ফোন এসেছিল থানা থেকে। আজ? আজ নিশ্চয়ই মান্তু
বন্দনাদের বসার ঘরে ঢুকে সঞ্জয় রিসিভারটা তুলে নিল।
–হ্যালো!
–কি মশাই! কাল রাত্তিরে ভালো ঘুম হয়েছিল তো?
মহিলা কণ্ঠস্বর। কিন্তু কেমন অস্পষ্ট।
-কে বলছেন?
–ও বাবা! এত মিষ্টি করে বললাম, তবু চিনতে পারলেন না? ডাক্তাররা এমনি ভোতাই হয়।
সঞ্জয় এবার হেসে উঠল।
-ওঃ শ্ৰীমতী মান্তু! বলুন কি খবর? বেরোবার মুখে এমন একটি মধুর স্বর উপহার পাব ভাবতে পারিনি।
-চুপ করুন মশাই! বেশি গলে যাবেন না। পাশেই আপনার অর্ধাঙ্গিনী আছেন। শুনতে পাবেন।
সঞ্জয় জোরে হেসে উঠল।
–হাসিটা এখন তুলে রাখুন। শুনুন–এবেলা যাচ্ছি না। ওবেলা। দুজন নয়, তিন জন। পুপুকে যদি ধরেন তা হলে সাড়ে তিন জন।
–তিন, জন?
না না এখন কিছু বলব না। ভয় নেই, পুরুষ নন। মহিলাই। একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে চেষ্টা করবেন। জমিয়ে আড্ডা দেব। ছাড়বেন না। রীণা কথা বলবে।
সঞ্জয় রিসিভারটা কান বদল করে নিল।
–হ্যালো! আমি রীণা। কাল ভয়টয় পাওনি তো?
–ভয়? কিসের ভয়? ধুৎ?
তাড়াতাড়ি ফিরছ তো?
-দেখি। বলে রিসিভারটা রেখে বন্দনার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে তাড়াতাড়ি নেমে গেল। বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
.
১৩.
মিস থাম্পির অভিজ্ঞতা
সন্ধেবেলা বাসায় ফিরে সঞ্জয় দেখল বাড়ি সরগরম। হাসি-গল্পে ভরপুর। একে মান্তু এসেছে সেই সঙ্গে এসেছেন সেই ম্যাড্রাসি মহিলা। তিনিও যে আসকেন, মান্তু ফোনে না বললেও, সঞ্জয় অনুমান করেছিল। রীণা তো এই মহীয়সী অতিথিটির আপ্যায়নে মহা ব্যস্ত।
আজ ওকে দেখলে কে বলবে এই রীণাই এই বাড়িতে এত দিন ভূতের ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে ছিল। এমনকি ওঁর মুখের ওপর যে ফ্যাকাশে ভাবটা ছিল সেটাও যেন আজ আর নেই। রীণা ঠিক আগের মতোই প্রাণচঞ্চল, উচ্ছল হয়ে উঠেছে।
দেখে সঞ্জয়ের ভালো লাগল। কিন্তু দূর থেকে ঐ মহিলাটিকে দেখে মোটেই ভালো লাগল না। বরঞ্চ তাঁর মুখখানা দেখে কেমন অস্বস্তি হতে লাগল।
সঞ্জয়কে সিঁড়ির মুখে প্রথম দেখল মান্তু। হাসতে হাসতে এগিয়ে এল সে।
–খুব তাড়াতাড়ি তো এসেছেন মশাই! এদিকে আমরা হোস্টের অপেক্ষায় বসে আছি। আসুন এঘরে। বলে সঞ্জয়কে একরকম টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেল।
মিস থাম্পির সঙ্গে আলাপের পর্বটা মাই সেরে দিল।
মিস থাম্পি হ্যান্ডশেক করে হেসে বললেন, আপনি ছিলেন না, আপনার বাছিত সম্ভবত আমার অনধিকার-প্রবেশ হয়ে গেছে।
সঞ্জয় সসংকোচে বলল, সে কী কথা! আমি না থাকলেও আমার স্ত্রীকে তো আপনার হাতেই দিয়ে গেছি। আপনি অনুগ্রহ করে এদের সঙ্গে এসেছেন এ আমার সৌভাগ্য।
মিস থাম্পি বললেন, আজ সকালে আপনার মিসেসের মুখে সব ব্যাপারটা শুনলাম। শুনে খুব কৌতূহল হল। ভাবলাম জায়গাটা একবার দেখেই আসি।
–ভালোই করেছেন। রীণা, চা-টা দিয়েছ তো?
রীণা ভ্রূভঙ্গি করে বলল, তুমি কি মনে করেছ, তুমি ছিলে না বলে হোস্টের কর্তব্য করতে পারব না?
মিস থাম্পি উত্তরটা শুনে খুব হাসলেন।
মান্তু, রীণা দুজনেই লক্ষ্য করল এবাড়িতে এসে মিস থাম্পি যেন অন্য মানুষ হয়ে গেছেন। এমন করে প্রাণখোলা হাসতে দেখা যায়নি। ভালোই লাগল।
–নিন মশাই, গরম চা। খেয়ে দেখুন আমার হাতে কিরকম লাগে। আর এটা কি বলুন তো?
–পাঁউরুটি তো দেখতেই পাচ্ছি। তাছাড়া নিশ্চয় ঘুগনি।
–আশ্চর্য! এতও বোঝেন!
–তা আর এত দিনে বুঝব না? আপনার বান্ধবীটি তো ঘুগনি-স্পেশালিস্ট। সারা জীবনে ঐ একটিই জলখাবার শিখে রেখেছেন।
উঃ কী মিথ্যুক! রীণা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল–সেদিন অমন নিজে হাতে কেক করলাম! কী বেইমান!
সঞ্জয় ততক্ষণে চামচে করে মুখে দিয়েছে। না, ঘুগনি নয়–মাংসের কিমা। সঞ্জয় আর কোনো মন্তব্য না করে চুপচাপ খেয়ে গেল।
মিস থাম্পি একটা শাল ভালো করে জড়িয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
–আপনারা গল্প করুন। আমি একটু ঘুরে আসি।
মান্তু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল-সন্ধে হয়ে গেছে। এখন কোথায় যাবেন এই ঠাণ্ডায়?
মিস থাম্পি টটা নিয়ে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, নিচটা একবার দেখে আসি।
রীণা বলল, একাই যাবেন? ওঁকে বলব?
মিস থাম্পি তাড়াতাড়ি বললেন, না না, কাউকে লাগবে না। আমি এই কম্পাউন্ডের মধ্যেই আছি।
আধ ঘন্টার মধ্যেই মিস থাম্পি ফিরে এলেন। সঞ্জয় হেসে বললে, কিছু পেলেন?
মিস থাম্পি দাঁতের ফাঁকে একটু হাসলেন। ছেলেমানুষের মতো বললেন, বলব কেন?
কিন্তু সবাই লক্ষ্য করল ওঁর হাতে একটু শুকনো মাটি।
.
খেতে বসতে একটু রাত হল। একসঙ্গেই সবাই বসল। খেতে খেতে গল্প হচ্ছিল। রীণা মান্তুকে বলল, মিসেস লাহিড়ির বাড়ির ঘটনাটা একবার ওকে ব। বলে সঞ্জয়কে দেখিয়ে দিল।
সঞ্জয় মুর্গির হাড় চিবুতে চিবুতে নিস্পৃহ সুরে বলল, কি বলবেন? গল্প? তা বলুন শুনি।
–গল্প নয়, ঘটনা মশাই। আমরা দুজনেই তা স্বচক্ষে দেখলাম। বলে ঘটনাটা রুদ্ধ নিশ্বাসে বলে গেল।
সঞ্জয় শুনে যে কোনো মন্তব্য করল না, মিস থাম্পি তা লক্ষ্য করলেন। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, আপনার এই ঘরে শুনলাম মাঝে মাঝে কারো আবির্ভাব হয়। আপনি ভয়টয় পান না তো?
