সঞ্জয় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, রীণার ট্রিটমেন্ট তাহলে কিভাবে করবেন?
ডাঃ রুদ্র হেসে বললেন, রীণার ক্ষেত্রে কোন ধরনের ট্রিটমেন্ট করব তার সঙ্গে কথা বলার পর ঠিক করব। অবশ্য রীণা যদি সত্যিই সাইকোপ্যাথিক পেশেন্ট হয়।
বড়ো ঘড়িটায় ঢং ঢং করে নটা বাজল। সঞ্জয় উঠে পড়ল। এখন তাকে হোটেলে ছুটতে হবে।
.
রাত সাড়ে দশটা শহর কলকাতায় এমন কিছু নয়। কিন্তু যশোর রোডের ধারে এই অঞ্চলটা এরই মধ্যে নিঝুম হয়ে গেছে। বিশেষ করে এই বাড়ির একতলা দোতলার ভাড়াটেরা দশটার আগেই খাওয়া সেরে শুয়ে পড়ে। একমাত্র গরমকালে লোড শেডিং হলে অনেক রাত পর্যন্ত বাইরে এসে বসে।
সঞ্জয় ওপরে উঠে এল। প্যাসেজটা অন্ধকার। বাড়িতে কে আছে যে আলো জ্বেলে রাখবে?
অন্ধকারেই সঞ্জয় তালা খুলে ঘরে ঢুকল। ঢুকতেই গা-টা কেমন ছমছম করে উঠল। এর আগেও একদিন এরকম হয়েছিল, যেদিন রীণা একা মান্তুদের বাড়ি যাবার জন্যে বেরিয়েছিল। তবে সেদিনের অস্বস্তিটা অন্য কারণে। রীণার জন্যে দুর্ভাবনায়। দুর্ভাবনা আর গা ছমছ করা এক নয়।
কিন্তু আজই বা গা ছমছম করল কেন?
সঞ্জয় তাড়াতাড়ি আলো জ্বালল। আলোয় ঘর ভরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে গা-ছমছমানি থেমে গেল। নিজেকে ধমক দিল–ডাক্তার মানুষের অন্ধকারে ভয়? তাও তেতলার নিজের ঘরে ঢুকতে?
দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে সঞ্জয় বিছানায় এসে বসল। হোটেলে খেয়ে এসেছে। কাজেই শোওয়া ছাড়া এখন আর অন্য কাজ নেই। কিন্তু শুতে ইচ্ছে করল না। শুলেও ঘুম আসবে না। অগত্যা একটা সিগারেট ধরালো।
ডাঃ রুদ্রের কথাগুলো তার মনে পড়ছিল। আচ্ছা, রীণার প্রসঙ্গে হঠাৎ উনি ঐ মহিলাটির কথা টানলেন কেন? তিনি কি রীণার ক্ষেত্রেও সেরকম কিছু সন্দেহ করেন? মান্তুর দাদার সঙ্গেও ওর খুব ভাবছিল নাকি কী জানি বাবা! পরক্ষণেই অবশ্য সঞ্জয় সে কথা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে পাশ ফিরে শুল। কিন্তু কিছুতেই ঘুম এল না।
তার কেবলই সেইসব রাতগুলোর কথা মনে হতে লাগল যেসব রাতে রীণা ভয় পেয়েছিল। ঐ তো বসার ঘরে টেবিলটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঐ টেবিলের কাছেই রীণা কী যেন দেখেছিল। ঐ টেবিল থেকেই গেলাস পড়ে ভেঙেছিল। আচ্ছা–সেই ছবিটার কি হল? সত্যিই কি কেউ নিয়ে গেছে? কিন্তু কে নেবে? এঘরে তো বাইরের কেউ আসে না।
ভাবতে ভাবতে সঞ্জয়ের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। সে জোর করে অন্য দিকে মন সরাবার চেষ্টা করল। কিন্তু মনটা সেই অশরীরী আত্মার মতো টেবিলটার চারদিকেই ঘুরতে লাগল।
কী মুশকিল! ভয় পাচ্ছে নাকি? সঞ্জয় জোর করে নিজেকে সচেতন করার চেষ্টা করল।
কই? অন্য দিন তো ভয় পায় না। ঘরে সঙ্গী তো শুধু রীণা। তাও সে তো নিজেই ভয়ের শিকার!
আশ্চর্য! আজ সেই একটা ভীতু মানুষই কাছে না থাকাতে সঞ্জয়ের মতো ডাক্তারও কেমন ভয় পাচ্ছে।
সঞ্জয় উঠে পায়চারি করতে লাগল। হঠাৎ ও চমকে উঠল। ঘরে কি আর কেউ আছে? তার পিছনে!
নাঃ, ওটা ওর নিজেরই ছায়া।
আশ্চর্য! মেঝেতে নিজের ছায়া দেখেই বুকের মধ্যে কিরকম করে উঠেছিল। বুঝতে পারল, এই জন্যেই মানুষ বোধহয় জায়গা-বিশেষে একা থাকতে পারে না। সঙ্গী চায়। ঘরে একটা কুকুর থাকলেও যেন অনেক নিশ্চিন্ত।
নাঃ, ঘুমনো যাক। সঞ্জয় মশারি টাঙিয়ে নিল। বিছানায় ঢুকে বেডসুইচ টিপে আলো নিভোতে যাচ্ছিল, কি মনে হল, আবার উঠে দরজাটা দেখে নিল ঠিক মতো বন্ধ হয়েছে কি না। সিঁড়ির দিকের জানলাটা অন্য দিন খোলা থাকে। আজ বন্ধ করে দিল।
বিছানার কাছে আসছিল–ফিরে গিয়ে একবার বাথরুমটা দেখে নিল। তারপর খাটের তলা।
নাঃ, কেউ কোথাও নেই। নিশ্চিন্ত। মনকে বোঝাল–অন্য কিছুর জন্যে নয়, চোর-ডাকাতের জন্যেই এত সাবধানতা!
বিছানায় শুয়ে বেডসুইচ অফ করে দিল।
তবু ঘুম আসছে না। তখন সঞ্জয় ডাঃ রুদ্রের সঙ্গে যে কথা হল তাই নিয়ে আবার ভাবতে লাগল। ডাঃ রুদ্র যে কী বলতে চাইলেন সঞ্জয়ের কাছে তা মোটেই পরিষ্কার নয়। উনি কি এই বয়েসে এখন মেসমেরিজ শিখে চিকিৎসা করবেন? পাগল নাকি!
উনি রীণার সঙ্গে ভালো করে কথা বলবেন। তা তিনি হাজার বার বলুন। কিন্তু রীণাকে কোথাও চিকিৎসার জন্যে পাঠানো যাবে না। ও কিছুতেই রাজি হবে না।
তাছাড়া ডাঃ রুদ্র যদিও বলছেন মানসিক রোগ, তবু প্রতিবারই বলেছেন, যদি সত্যিই মানসিক রোগ হয়।
উনি কি তবে মানসিক রোগ ছাড়া অন্য কিছু আশঙ্কা করছেন? ডাঃ রুদ্রের মতো একজন বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্টও কি অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাসী?
এক ঘুমেই রাত শেষ।
ঘুম ভাঙার পরই সঞ্জয়ের মনে পড়ল রীণা নেই। কাজেই চা নিয়ে কেউ আজ মুখের সামনে ধরবে না।
বিছানা থেকে উঠে পড়ল ও। মনটা খুশি খুশি, কাল রাতে কিছু হয়নি। সত্যি কিছু থাকলে তো হবে।
চা খেয়ে, শেভিং-এর কাজ সেরে স্নানের ঘরে যখন ঢুকল তখন বেলা আটটা। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রীণা এসে পড়বে, তবু আজ আর বাড়ির ভাত জুটবে না। ক্যান্টিনেই খেয়ে নিতে হবে। তার আগে সকালে পেটে কিছু পড়া দরকার। সঞ্জয় একটা ডিম সেদ্ধ করে নিল। তারপর কোথায় নুন, কোথায় গোলমরিচ খুঁজতে খুঁজতে হাঁপিয়ে উঠল।
বেলা সাড়ে আটটা। হাসপাতালে যাবার জন্যে সঞ্জয় তৈরি। কিন্তু রীণার পাত্তা নেই। অথচ সকালেই ওর আসার কথা। মান্তুই পৌঁছে দিয়ে যাবে। কই?
