–তাহলে আপনি সেই আমার কথাতেই আসছেন রীণা সাইকোপ্যাথির পেশেন্ট?
–হ্যাঁ, তাই।
সঞ্জয় নিজেই কত বার রীণাকেই বলেছে, তুমি মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়েছ। আর আজ ডাঃ রুদ্রের মুখে ঐ একই কথা শুনে তার মুখটা শুকিয়ে গেল। ম্লান মুখে জিজ্ঞাসা করল, তাহলে ট্রিটমেন্ট?
–আমিই করব। অবশ্য যদি বুঝি সত্যিই ওর মানসিক রোগ হয়েছে।
এই বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সঞ্জয়ের পিঠ চাপড়ে বললেন, শুনে অবাক হবে, আমি এখন মেমেরিজম নিয়ে কিছু পড়াশোনা করছি। বলতে বলতে সামনের র্যাক থেকে কতকগুলো ফাইল বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। বললেন, একসময়ে ওদেশের ডাক্তার ফিসার (Dr Fisher), রিচার (Richer), বিনেট (Binet), ফেরি (Fere), বিখ্যাত ফরাসী বিজ্ঞানবিদ ডাক্তার লুই আর স্বয়ং মেসমার যিনি মেসমেরিজমের আবিষ্কর্তা এঁরা সকলেই মেমেরিজমের সাহায্যে কঠিন কঠিন রোগ সারাতে পারতেন। সেই সব খবরের কাটিং এই ফাইলে আছে। কৌতূহল থাকলে একটা ছুটির দিনে এসে পড়ে দেখতে পার। একটু থেমে বললেন এখনও এদেশে বহু জটিল রোগ মেমেরিজমের সাহায্যে সারানো যায়। আমাদের দেশে ঝাড়-ফুঁক করে রোগ সারানো হতো। এখনও পল্লীগ্রামে ঝাড়-ফুঁকের ব্যবস্থা চলে। এই ঝাড়-ফুঁকও এক ধরনের মেসূমেরিজ। তুমি কখনো দেখেছ কি না জানি না ওঝারা রুগীর কাছে বসে রুগীকে না ছুঁয়ে কিংবা তার দেহের ওপর দিয়ে খুব আগ্মভাবে হাত চালায়। একে বলে পাস দেওয়া। মাথা থেকে পা পর্যন্ত এইরকম কয়েকবার পাস দিলেই রুগী ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙলে দেখা যায় সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে। অনেক মহাপুরুষই তো রোগীর গায়ে হাত বুলিয়ে তাদের রোগমুক্ত করতেন। এটা অস্বাভাবিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আসলে তারা প্রচণ্ড মানসিক শক্তির অধিকারী। ঐ শক্তির বলেই তারা রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারতেন। আর মেমেরিজমের গোড়ার কথাই হচ্ছে প্রচণ্ড মানসিক শক্তি। বুঝতেই পারছ মানসিক রোগের ক্ষেত্রে এই মেসমেরিজম্ কত শক্তিশালী চিকিৎসা।
সঞ্জয় বলল, তাহলে কি আপনি রীণাকে হিপনোটাইজ করে সারাবেন?
ডাঃ রুদ্র হেসে বললেন, তাহলে তো খুব ভালোই হতো। কিন্তু হিপনোটাইজ করি সে শক্তি আমার কই? আজকের দিনে কজনারই বা সে শক্তি আছে? তবে এবিষয়ে আমার ইন্টারেস্ট আছে বলেই তোমাকে এত কথা বললাম।
সঞ্জয় একটু অধৈর্য হয়ে বলল, তাহলে আপনি কিভাবে সারাবেন?
সঞ্জয় না হয়ে অন্য কেউ এ কথা জিজ্ঞেস করলে ডাঃ রুদ্র হয়তো বিরক্ত হতেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি শুধু একটু হাসলেন। বললেন, প্রথমে রোগের সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে হবে। দেখতে হবে চাপা কোনো ভয়ের স্মৃতি আছে কিনা? কোনো মানসিক আঘাত পেয়েছে কিনা। অনেক মানসিক আঘাত নিঃশব্দে সহ্য করতে হয়, তার প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। এছাড়া অতৃপ্ত যৌন-কামনারও একটা প্রভাব আছে। বিশেষ করে যারা উগ্রবিকৃত যৌন-কামনায় কাতর তাদের মানসিক বিকার জন্মাতেই পারে। বিকৃত যৌন-কামনায় কাতর এমন একটি পেশেন্ট আমিই পেয়েছিলাম।
সঞ্জয় অধৈর্য হয়ে বলল, রীণার ক্ষেত্রে এসবের কোনো প্রভাবই নেই। কলকাতায় আসার আগে পর্যন্ত সে সবদিক দিয়েই সুখী ছিল। এখনও তার কোনো কিছুরই অভাব নেই।
ডাঃ রুদ্র স্নিগ্ধ হেসে বললেন, তা হয়তো ঠিক। তবু তুমি নিজে ডাক্তার। এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা জেনে রাখা ভালো। সেই পেশেন্টটির কথা শোনোনা।
ডাঃ রুদ্র একটু থামলেন। তারপর বলতে শুরু করলেন, স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন। দুটি সন্তানও হয়েছে। স্বামীটি সুদর্শন, ভদ্র, মার্জিতরুচি, সলজ্জ প্রকৃতির। স্ত্রীটি মোটামুটি সুন্দরী। পাতলা গড়ন। গাল দুটি একটু বসা। কিন্তু ঝকঝকে চোখ। মোটেই মুখরা নয়, বরঞ্চ স্বল্পভাষী। তাকে দেখেই মনে হয়েছিল তার জীবনের অনেক সুখ-দুঃখের কথা সে যেন ঠোঁটে কুলুপ এঁটে আছে। দশ বছর শান্ত দাম্পত্য জীবন কাটাবার পর স্ত্রীটি হঠাৎ কিরকম অস্বাভাবিক হয়ে উঠল। কোনো কিছুতেই আনন্দ নেই, উৎসাহ নেই, কারো সঙ্গেই কথা বলতে ভালো লাগে না, এমনকি–এমনকি রাত্রে স্বামীর পাশে শুয়েও পাশ ফিরে থাকত। স্বামীর মনে হতো যেন একতাল বরফ তার পাশে পড়ে আছে। অগত্যা স্বামী তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করল। প্রথমে স্ত্রী চিকিৎসা করাতে রাজি হয়নি। বিরক্ত হয়ে বলত–আমার কি হয়েছে যে চিকিৎসা করাব?
শেষে অবশ্য রাজি হয়েছিল। গোপন সাক্ষাৎকারের সময় হিতৈষী ডাক্তারের কাছে সে যা বলেছিল তা এই–প্রথম কৈশোর কালেই সে একটা ছেলের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। ছেলেটি শুধু যে উপভোগ করত তা নয়, উপভোগের সময়ে নানা রকম খারাপ কথা বলত, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করত। তাতে মেয়েটি রাগ তো করতই না, বরঞ্চ তার ভালো লাগত। পরবর্তী জীবনে স্বামীর কাছ থেকেও ঐ রকম আচরণ আশা করত। কিন্তু স্বামীর কাছ থেকে সেরকম ব্যবহার পেত না। শেষ পর্যন্ত–মানে দশ বছর পর তার হঠাৎ এমন অবস্থা হল যে, পাগলের মতো সেই ছেলেটার খোঁজ করতে লাগল। ছেলেটি এই পরিবারের এতই পরিচিত ছিল যে তাকে কেউ সন্দেহ করত না। মেয়েটি এই ব্যাধিরই শিকার।
এই পর্যন্ত বলে ডাঃ রুদ্র একটু থামলেন।
সঞ্জয় জিজ্ঞেস করল–মহিলাটির শেষ পর্যন্ত কি হল?
–চিকিৎসা শুরু হল। চিকিৎসা কি জান? চিকিৎসা আর কিছুই নয়, মাস ছয়েকের জন্যে তাকে তাদেরই অতি সাধারণ এক গৃহস্থ যৌথ পরিবারে পাঠিয়ে দেওয়া হল। তার স্বামীকে বলা হল–এই ছমাসের মধ্যে সে যেন স্ত্রীর কাছে না যায়। শুধু তখনই যাবে যখন তার স্ত্রী তাকে চিঠি লিখে আসতে বলবে। সেই যৌথ পরিবারে গিয়ে বধূটি প্রথম সুস্থ স্বাভাবিক ব্যস্তসমস্ত জীবনের আস্বাদ পেল। তারপর থেকেই তার পরিবর্তন। এখন সে সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক।
