তারপরেই মান্তুকে বলল, তাহলে বিকেলে ওঁকে নিয়ে যাবেন।
রীণা ভেবেছিল বুঝি তাকেই নিয়ে যাবার কথা বলছেন। না, তা নয়। নেমন্তন্নটা ঐ মাদ্রাজী মহিলাকে।
মান্তু বলল, হ্যাঁ, নিয়ে যাব। উনি ফিরে এলে বলব আপনি নেমন্তন্ন করতে এসেছিলেন।
.
বেলা দুটো নাগাদ মিস থাম্পিকে নিয়ে ললিতবাবু ফিরলেন। খাওয়া-দাওয়া সেরে মিস থাম্পি বসলেন লিখতে।
বিকেল সাড়ে তিনটের সময় এক কাপ কফি খেলেন। তখন মান্তু খুব বিনীতভাবে মিসেস লাহিড়ির কথা বলল।
আপনার কখন সুবিধে হবে?
মিস থাম্পি প্রথমে একটু অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এর ওর বাড়ি যাবার ইচ্ছে তার ছিল না। শেষে মান্তুর বিশেষ অনুরোধে রাজি হলেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন–
–সাড়ে চারটেয়।
ইতিমধ্যে মিস থাম্পির সঙ্গে রীণার অনেকবারই দেখা হল, কিন্তু তিনি কোন কথা বলেননি। কোনো আগ্রহই যেন নেই।
মিস থাম্পির এই ব্যবহারে মান্তু বেশ অস্বস্তিতেই পড়ল। ওঁর কাছে ধীরে সুস্থে বসে রীণা কথা বলবে এইজন্যেই তো রীণাকে আনা। কিন্তু সবই যেন ভেস্তে যাচ্ছে। যাই হোক ঠিক সাড়ে চারটের সময়ে মিস থাম্পিকে নিয়ে মান্তু মিসেস লাহিড়ির বাড়ি চলল। রীণা যেতে চায়নি। মান্তু জোর করেই নিয়ে গেল।
মান্তুদের দুখানা বাড়ির পরেই মিসেস লাহিড়ির বাড়ি। বাড়ির সামনে উঁচু বোয়াক। দুপাশে খুবই সাধারণ ফুলের বাগান।
মিস থাম্পি এখানে নতুন অতিথি, তবু তিনি লম্বা লম্বা পা ফেলে আগে আগে হাঁটছিলেন। যেন নিজের পরিচিত জায়গাতে যাচ্ছেন। নিজেই গেট খুলে খোশ মেজাজে বাগান দেখতে দেখতে ভেতরে ঢুকলেন।
রোয়াকে দাঁড়িয়েছিলেন কর্তা-গিন্নি অতিথিকে অভ্যর্থনা করার জন্যে। পাশে ওঁদের ছেলে, বছর তেরো বয়েস।
মিস থাম্পি বোয়াকে উঠে একটু দাঁড়িয়ে পড়লেন। কপালে যেন একটু ভাঁজ পড়ল। কিন্তু তা কয়েক মুহূর্তের জন্যে।
মিসেস লাহিড়িই অভ্যর্থনা করলেন, আসুন। ইনি আমার হাজব্যান্ড
ভদ্রলোক নিজেই বাকি পরিচয়টুকু দিলেন।
নির্মল লাহিড়ি।
মিস থাম্পি গভীর আন্তরিকতায় হ্যান্ডসেক করলেন।
–আমার ছেলে দেবল। ক্লাস এইটে পড়ছে।
মিস থাম্পি হেসে তার চুলের ওপর একটু আদর করে দিলেন।
নির্মলবাবু সবাইকে নিয়ে ভেতরের ঘরে বসালেন। মিসেস লাহিড়ি অস্বস্তিতে পড়লেন কোন কথা দিয়ে কিভাবে আলাপ শুরু করবেন। বাংলায় বলতে পারলে সুবিধে হতো।
নির্মলবাবুই কথা শুরু করলেন। তার ইচ্ছে ছিল প্রেততত্ত্ব নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু আমল পেলেন না। তিনি একবারই শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, সত্যি কি আপনি অশরীরী কিছুতে বিশ্বাসী?
মিস থাম্পি একটু হেসেছিলেন। উত্তর দেননি। এতে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ভারি লজ্জিত হয়েছিলেন।
এরপর খাওয়া। কফি আর কেক। সঙ্গে পোটাটো চিপস। মিস থাম্পি বেশ তৃপ্তি করেই খেলেন। খেতে খেতেই মিস থাম্পি জিজ্ঞেস করলেন, লোডশেডিং হয় কিনা, হলে কি করেন? তারপর হঠাৎই মান্তুকে ইশারায় বললেন, ছেলেটিকে বাইরে পাঠিয়ে দিতে।
মান্তু হতভম্ব।
মিসেস লাহিড়িও প্রথমে ঠিক বুঝতে পারলেন না তার ছেলেকে ঘর থেকে চলে যেতে হবে কেন? ও তো চুপচাপ একপাশে বসে আছে। কোনোরকম অভদ্রতা করেনি। কিন্তু মিস থাম্পি আবার চোখের ইশারা করতেই দেবলকে উনি বাইরে পাঠিয়ে দিলেন। একটা অজানা আশঙ্কায় স্বামী-স্ত্রীর বুক কাঁপতে লাগল। মিস থাম্পি গৃহকর্তাকে লক্ষ্য করে হেসে বললেন, মিস্টার লাহিড়ি, আপনি কিন্তু আপনার ফ্যামিলির সকলের কথা বলেননি।
লাহিড়িবাবু মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, আমি তো সকলের সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। সকলে বলতে–আমার মিসেস আর ঐ ছেলে।
মিসেস লাহিড়ি যোগ করলেন, শুধু মেয়েটা এখানে নেই। মামার বাড়ি গেছে।
মিস থাম্পিও হেসে বললেন, কিন্তু আপনাদের সঙ্গেই আছেন এমন একজনকে আপনারা বাদ দিয়েছেন।
স্বামী-স্ত্রী দুজনেই অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মিস থাম্পির দিকে তাকালেন।
মিস থাম্পি বললেন, আমি কিন্তু আপনাদের বাড়ি ঢুকেই তাঁকে দেখতে পেয়েছি। বলে হাসতে লাগলেন।
অবাক নির্মল লাহিড়ি বললেন, আরও একজনকে দেখেছেন?
–হ্যাঁ, আপনারা যখন আমায় রিসিভ করছিলেন, তিনিও পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ছুটে ঘরের মধ্যে চলে গেলেন। আমি ঘরে ঢুকেই তাকে খুঁজেছিলাম। কিন্তু তখন আর দেখতে পেলাম না। দেখলাম পরে খাবার সময়ে। টেবিলের অল্প দূরে দাঁড়িয়েছিলেন। ভারি shy type-এর soft ভদ্রমহিলা।
মিস থাম্পি থামলেন।
সারা ঘর জুড়ে কেমন একটা অস্বস্তি। কেউ সেই মুহূর্তে কোনো কথা বলতে পারল না।
–এখন বলুন ইনি কে?
স্বামী-স্ত্রী একেবারে বোবা হয়ে গেলেন। নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। নির্মলবাবু একটু সামলে নিয়ে বললেন, আর তো কেউ নেই মিস থাম্পি।
–নেই, কিন্তু এক সময়ে ছিলেন। একজন মহিলা। বয়েস বছর কুড়ি-বাইশ। পাতলা গড়ন। শ্যামবর্ণা। লম্বা চুল–একটু যেন কুঁজো হয়ে হাঁটেন
শুনতে শুনতে লাহিড়িবাবুর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
বলুন মিস্টার লাহিড়ি, এইরকম কেউ কি কখনো ছিলেন এ বাড়িতে? মিস থাম্পির গলার স্বরটা কেমন যেন অস্বাভাবিক শোনাল।
কয়েক মিনিট নিরেট স্তব্ধতা। তারপর নির্মল লাহিড়ি অস্ফুটস্বরে বললেন, আপনি যে রকম বর্ণনা দিচ্ছেন তাতে মনে হচ্ছে আপনি আমার ফাস্ট ওয়াইফের কথা বলছেন। কিন্তু সে তো অনেকদিন হল–
