কথা শেষ হল না। হঠাৎ মিসেস লাহিড়ি কাঁপতে কাঁপতে চেয়ারে বসে পড়লেন। তারপরই অচৈতন্য।
বিমূঢ় নির্মল লাহিড়ি দু হাতে মিসেস লাহিড়ির দেহটা ধরে রইলেন।
Dont worry! মিস থাম্পি বললেন।একটু পরেই উনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। ওঁকে বলবেন–nothing to fear. এই মহিলা যখন জীবিত ছিলেন তখন আপনাকে খুব ভালবাসতেন। এখনো ভালবাসেন। আর জেনে রাখুন যে spirit ভালবাসতে পারে সে কারো ক্ষতি করে না।
বলে দুহাত তুলে নমস্কার করে বেরিয়ে এলেন।
বাড়ি ফিরে মান্তু ললিতবাবুকে সব ব্যাপারটা বলল। ললিতবাবু স্তম্ভিত হয়ে শুনলেন। মিস থাম্পি হঠাৎই যেন এদের কাছে সাধারণ সম্মানীয় অতিথি থেকে ভয়-বিস্ময়-শ্রদ্ধার পাত্রী হয়ে উঠলেন। এও একরকম অস্বস্তি। এই-সব মানুষের কোথায় কিসে তুষ্টি কিসে বিপত্তি বোঝা দায়। তাছাড়া অন্য অস্বস্তিও রয়েছে মান্তুর। যে জন্যে রীণাকে আনা তা আর কিছুতেই হচ্ছে না। ওকে নিয়ে যে নিরিবিলিতে মিস থাম্পির কাছে বসবে, মিস থাম্পি তার ফুরসতটুকুও দিচ্ছেন না। মিসেস লাহিড়ির বাড়ি থেকে ফিরে এসে আবার খাতাপত্র নিয়ে বসেছেন উনি। হয় তো আরো দুএকদিন থাকবেন। কিন্তু রীণা আর কিছুতেই থাকবে না। ওকে কাল সকালেই পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে।
রীণার ওপরই মান্তুর রাগ হল। ও যদি নিজে মিস থাম্পির কাছে গিয়ে সোজাসুজি ওর বিপদের কথা বলত, তাহলে হাঙ্গামা চুকে যেত। কিন্তু ও তো ত্রিসীমানায় ঘেঁষছেই না।
রাত নটা বাজল। মিস থাম্পি তার খাতা নোটবই ব্যাগে পুরে বেরিয়ে এলেন।
–আপনার খাবার ব্যবস্থা করি? মান্তু বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল।
করুন। আজ তাড়াতাড়ি শোব। খুব টায়ার্ড। খাওয়াদাওয়া চুকে গেল খুব তাড়াতাড়ি আর নিঃশব্দে। যা সচরাচর হয় না। কারণ যাঁর সঙ্গে ওরা গল্প করবে ভেবেছিলেন, তিনিই তো অতিশয় গম্ভীর।
মান্তু দেখল আর সময় নেই। খাওয়ার পরই মিস থাম্পি শুয়ে পড়বেন। আর রীণাও কাল সকালে চলে যাবে। কাজেই খাওয়ার পরই রীণাকে নিয়ে ওঁর ঘরে ঢুকতে হবে।
মান্তুকে দুর্ভাবনার হাত থেকে বাঁচালেন মিস থাম্পিই।
খাওয়া শেষ করে রীণা থালায় আঙুল দিয়ে আঁক কাটছিল। হঠাৎ মিস থাম্পি জিজ্ঞেস করলেন-Why you look so pale? রাত্রে ভালো ঘুম হয় না?
রীণা চমকে মিস থাম্পির দিকে তাকাল।
-Are you a victim of any nightmare? রাত্রে কোন দুঃস্বপ্ন দ্যাখ?
রীণা প্রথমে কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না। তার পরই সংকোচ কাটিয়ে বলল, Not dream madam! Something else.
মিস থাম্পি ভুরু কুঁচকে চোখ ছোটো করে তাকালেন।
রীণা বলল, Not only at night-constantly haunted by a feeling of an unknown fear.
মান্তু এই সুযোগে বন্ধুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, শুধু রাত্তিরেই নয়, দিনেও খুব ভয় পায়।
-What is that fear?
–That I do not know myself ভয়টা কি ম্যাডাম, আমি নিজেও তো জানি না।
মিস থাম্পি কিছুক্ষণ কী ভাবলেন। তারপর বললেন, আজ আমি খুব টায়ার্ড। কাল সকালে আপনার সঙ্গে কথা বলব। ঠিক সকাল ছটায়।
.
১২.
ডাক্তার রুদ্র
বাড়িতে রীণা নেই, কাজেই ফেরার তাড়া নেই। রীণাকে ছেড়ে দিতে খুব একটা ইচ্ছে ছিল না ওর। তার কারণ, রীণা যেন ক্রমশ মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে উঠছে। এ বিষয়ে সঞ্জয়ের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এ অবস্থায় রীণাকে চোখের আড়াল করার এতটুকু ইচ্ছে ছিল না সঞ্জয়ের। অবশ্য মান্তু কথা দিয়েছে সে যেমন নিজে রীণাকে নিয়ে যাচ্ছে রাত পোহালেই তেমনি নিজেই পৌঁছে দিয়ে যাবে। মান্তু আড়ালে ওকে মিস থাম্পির কথাও বলেছে। অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন মহিলা, প্রেতচর্চাই তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। মান্তুর ইচ্ছে রীণাকে একবার তাঁর সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়। এসব হাস্যকর কথা। মহিলাটি কি ঝাড়ফুঁক করে রীণাকে সুস্থ করে তুলবেন? তবু সঞ্জয় বাধা দেয়নি। ভেবেছে মান্তুর বাড়িতে এক রাত্তির থাকলে রীণার হয়তো ভালোই লাগবে। মান্তুও তাকে বোঝাতে পারবে।
সারাদিন হাসপাতালে কাজের মধ্যে কেটে গেল। রীণা যে বাড়ি নেই এ কথা একবারও মনে হল না। মনে পড়ল বিকেলে হাসপাতাল থেকে বেরোবার পর। ভাবল এখনই গিয়ে কি করবে? বাড়ি তো খালি।
সঞ্জয়ের অবশ্য হুটহাট যাওয়ার মতো জায়গা একটা আছে। সেটা ডাক্তার রুদ্রর বাড়ি। সঞ্জয় ঠিক করল ওখানেই যাবে। রীণার ব্যাপারে একটু কথা বলা দরকার।
ডাঃ অবিনাশ রুদ্রের বাড়ি বেলগাছিয়ায়। গেটের ভেতর মোরাম বিছানো পথ। দক্ষিণ দিকে গ্যারেজ। নিচের ঘরে চেম্বার। সকালে রুগী দেখেন। সন্ধেবেলায় বসেন না। ঐ সময়টা মিটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। মিটিং না থাকলে বই পড়েন।
ডাঃ রুদ্রের এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে লন্ডনে ডাক্তারি পড়ছে। বাড়িতে শুধু স্ত্রী। নির্ঞ্ঝাট সংসার।
সঞ্জয় কলকাতায় এসেই ভেবেছিল রীণাকে নিয়ে ডাঃ রুদ্রের বাড়িতে বেড়াতে আসবে। কিন্তু তখন রীণাকে নিয়ে সিনেমা থিয়েটার দেখাতেই দিন কেটে গেল। তারপরই রীণা ভয় পেতে আরম্ভ করল। আর বেরোন হল না। শেষ পর্যন্ত ডাঃ রুদ্রকেই আসতে হল রীণাকে দেখতে। রীণার সঙ্গে সেই তাঁর প্রথম পরিচয়। যাবার সময়ে তিনি বার বার করে বলেছিলেন–সঞ্জয় যেন রীণাকে একদিন নিয়ে যায় তার বাড়িতে। কাকীমা দেখবে।
