এক সময়ে তার কানে এল কে যেন বলছে–আপনি কোথায় যাবেন?
রীণা অতিকষ্টে চোখ মেলে তাকাল। দেখল সে একটা বেঞ্চিতে শুয়ে আছে।
–পুপু! বলে ধড়মড় করে উঠে বসল।
একজন ভদ্রলোক সম্ভবত তাঁর স্ত্রীকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, এই যে এঁর কোলে।
–আমি কোথায়?
–এটা মল্লিকপুর স্টেশন।
–মল্লিকপুর!
–হ্যাঁ, ডায়মন্ড হারবার লাইনে। এর পরেই বারুইপুর। আপনি কোথায় যাবেন?
–শেয়ালদা।
শেয়ালদা! তো এদিকে এলেন কি করে?
রীণা কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, জানি না।
–আপনি তো উল্টোদিকে এসে পড়েছেন।
রীণা বিহ্বলদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
ভদ্রলোকের স্ত্রী পুপুকে রীণার কোলে তুলে দিয়ে বললেন, আজ আপনি আমাদের বাড়ি চলুন। আমরা এখানেই থাকি। কাল সকালে উনি না হয় আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন।
রীণা একটু চুপ করে থেকে ছেলেমানুষের মতো বললে–আমি বাড়ি যাব।
বাড়ি কোথায়?
বাঙ্গুর।
তখন ভদ্রলোক বললেন, ঠিক আছে চলুন, আপনাকে বালিগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসি।
পরের ট্রেনে ভদ্রলোক রীণাকে নিয়ে বালিগঞ্জ স্টেশনে এলেন। এই সময়ে উঠল প্রচণ্ড ঝড়।
ভদ্রলোক এমনও ভেবেছিলেন রীণাকে না হয় বাঙ্গুর পৌঁছে দিয়েই আসবেন। কিন্তু প্রচণ্ড ঝড় ওঠায় এত দেরি হয়ে গেল যে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হল না। তিনি রীণাকে নিয়ে এলেন বালিগঞ্জ থানায়।
সেখানে পুলিশ রীণাকে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করল। স্বামীর নাম, ঠিকানা। রীণার তখন ঘোর কেটে গিয়েছিল। সব কিছুই বলতে পেরেছিল।
ভদ্রলোক ও. সি.কে বললেন, যদি আপনারা অনুগ্রহ করে এঁকে বাড়িতে পোঁছে দেন।
ও. সি. বললেন, অনুগ্রহ কেন বলছেন, এ তো আমাদের কর্তব্য। তবে একটু দেরি হবে। পুলিশ ভ্যানগুলো–
বলেই রীণাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার বাড়িতে ফোন আছে?
রীণা বললে, দোতলায় এক ভদ্রলোকের ঘরে আছে।
নম্বর?
নম্বর! রীণা মনের মধ্যে হাতড়াতে লাগল।
–মনে নেই?
রীণা চোখ বুজিয়ে একটু ভাবল। তারপর ভেবে ভেবে খুব আস্তে গুনে গুনে ঢিল ছোঁড়ার মতো একটি একটি সংখ্যা বলে গেল।
ও. সি. তখনই রিসিভার তুললেন।
.
মান্তু দারুণ উদ্বেগে কড়া নাড়তে লাগল। ভেতর থেকে পুরুষের সাড়া পাওয়া গেল।
কে?
–আমি মান্তু
ব্যাকুল কণ্ঠস্বর যেন বন্ধ দরজার ওপরে আছড়ে পড়ল।
দরজা খুলে দিল সঞ্জয়। হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল মান্তু। রীণা কোথায়? ভালো আছে তো?
উত্তর পাবার দরকার ছিল না। মান্তু দেখল স্লান ক্লান্ত মুখে বিহ্বলদৃষ্টিতে রীণা তাকিয়ে আছে।
সঞ্জয় হেসে বলল, আসুন, কাল অনেক রাত্তিরে আপনার বান্ধবীকে উদ্ধার করে এনেছি।
১.৩ মিস থাম্পি
সাতাশে নভেম্বর।
মিস থাম্পি এসেছেন। রীণাও এসেছে। রীণাকে মান্তুই নিজে গিয়ে নিয়ে এসেছে। একদিন থাকবে।
আসল উদ্দেশ্য মিস থাম্পির মতো মানুষ যখন আসছেন তখন রীণাকে একবার দেখিয়ে নেওয়া। মিস থাম্পি তো সারাজীবন প্রেতচর্চাই করছেন। রীণাকে দেখলে, তার মুখ থেকে সব শুনলে হয়তো মিস থাম্পি বলতে পারবেন মানসিক ব্যাধি না অন্য কিছু। মান্তুর উদ্দেশ্যটা রীণাও জানতো না। এখানে এসেই শুধু এক পেয়ালা কফি খেয়ে বেরোবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন মিস থাম্পি। রীণার সঙ্গে আলাপ করার আগ্রহ দেখালেন না। মান্তু তবু এক নিশ্বাসে পরিচয়টুকু মাত্র দিতে পারল। তাও তিনি ভালো করে শুনলেন। বলে মনে হল না।
–চলুন মিস্টার চৌধুরী, আগে পার্ক স্ট্রীটের সিমেট্রিটা দেখে আসি।
বলে তখনই ললিতবাবুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
পার্ক স্ট্রীটের সেই দেড়শো বছরেরও বেশি পুরনো কবরখানাটা মিস থাম্পি অনেকক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখলেন। বড়ো বড়ো গাছের ছায়ায় জায়গাটা বেশ ঠাণ্ডা। মিস থাম্পির খুব ভালো লাগল।
কয়েক জায়গায় কয়েকটা কবর পরীক্ষা করলেন। ব্যাগ থেকে একটা শিশি বের করে খানিকটা কবরের মাটি পুরে নিলেন। একটা পুরনো কবরের পাশে উপুড় হয়ে শুয়ে কান পেতে কী যেন শুনলেন। এমনি করে সারা সকাল কাটালেন।
মিস থাম্পি বেরিয়ে গেলে মান্তু দুপেয়ালা কফি নিয়ে রীণার কাছে এসে বসল।
কী রে! মুখ অমন ভার কেন? মন কেমন করছে বুঝি?
রীণা ম্লান হাসল। বলল, মন বলে বোধহয় আর কিছু নেই। তাঁরে, আমায় কি রাত্তিরে থাকতেই হবে?
মান্তু হেসে বলল, বরকে ছেড়ে বুঝি একটা রাত্তিরও থাকতে ইচ্ছে করে না?
রীণার ফ্যাকাশে মুখে লালচে আভা ফুটে উঠল।–তা নয়। ঐ বাড়িতে একা থাকা–
দূর! তুই একটা পাগল! বলে মা রান্নাঘরের দিকে উঠে গেল।
রাত্তিরে সঞ্জয় বাড়িতে একা থাকবে এ দুর্ভাবনা তো রীণার ছিলই, তাছাড়া এখানেও তার ভালো লাগছে না। সে এসেছিল নিরিবিলিতে বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে। কিন্তু এদিনই একজন ভি. আই. পি. এসে হাজির। এই মহিলাটিকে রীণার মোটেই ভালো লাগছিল না। যেন কেমন ধারা! একে তো অবাঙালী, চালচলন আলাদা। কথাও কম বলেন। তাছাড়া কিসব প্রেতচর্চা করেন। নিজের ঘরেই নিত্য ভূতের আতঙ্ক তারপর এখানে এসেও
চিন্তায় বাধা পড়ল। একজন মহিলাকে নিয়ে মান্তু ঘরে ঢুকল। রীণার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল।
ভদ্রমহিলা মান্তুদের প্রতিবেশিনী। মিসেস লাহিড়ি। ছোটোখাটো হাসিখুশি মানুষটি। ফর্সা রঙ। গোল মুখ। কপালে বড়ো একটা টিপ।
মিসেস লাহিড়ি আলাপ করতে আসেননি। এসেছিলেন অন্য উদ্দেশ্যে। তাই রীণার সঙ্গে আলাপটা হল দায়সারা গোছের।
