দোকানের একজন কর্মচারী (নতুন অ্যাপয়েন্টমেন্ট, চেহারা অপরিচিত) আমার সামনে পিরিচা ধরে বলল, মিষ্টি খান স্যার।
পিরিচে একটা লালমোহন, একটা লাড়ু এবং নিমকি।
আমি বললাম, মিষ্টি কিসের রে?
স্যারের সন্তান হবে। আজি ডাক্তার বলেছে। এই কারণে মিষ্টি। যে কষ্টমারই আসছে তারেই মিষ্টি দিচ্ছি।
হাবীব ভাই বিরক্ত গলায় বললেন, উনাকে হিস্টরি বলার দরকার নাই। উনি জাইনা শুইনা ফুল নিয়ে আসছে। গাধা! কিছু বুঝস না।
মিষ্টি খেয়ে আমি হাবীব ভাইয়ের সঙ্গে রওনা দিলাম। রাতে তার বাসায় থাকব, খাওয়াদাওয়া করব। রাস্তায় নেমেই হাবীব ভাই বললেন, আপনি যে আসবেন জানতাম। এইজন্যে দোকান বন্ধ করতে দেরি করছি। অন্যদিন দোকান বন্ধ করি দশটায়, আইজ বাজে বারোটা। আপনার ভাবিকে বলে এসেছি আপনার পছন্দের রান্না ফোন করে।
আমার পছন্দের রান্না কী?
আমি জানি না। আপনার ভাবি জানে। খাইতে বইসা পছন্দের জিনিস না পাইলে দোকানে আগুন ধরায়ে দিব।
ভাবি কেমন খুশি?
নিজের চোখে না দেখলে বুঝবেন না কেমন খুশি। ডাক্তারের রিপোর্ট নিয়া যে কান্দন শুরু করেছে গিয়া দেখবেন এখনো মনে হয়। সেই কান্দন চলছে। মেয়েছেলে কান্দতেও পারে।
আপনি কেমন খুশি?
হিমু ভাই, এইটা একটা প্রশ্ন করলেন! আমি আকাশ-পাতাল খুশি।
আপনার চোখে পানি কই?
কথায় কথায় কানলে পুরুষ মানুষের চলে? এদিকে আবার হইছে ঝামেলা। আপনার ভাবির সঙ্গে ঝগড়া।
কী নিয়ে ঝগড়া?
নাম নিয়া। সে ঠিক করেছে তার দুই ছেলের নাম রাখবে আলাল-দুলাল। আমার মত নাই।
দুই ছেলে না-কি?
আপনে জানেন না? আমারে কেন জিগান? ফু যখন দিছেন। তখনই তো জানেন। আপনের কাজ কারবার আর কেউ না জানুক, আমি জানি, আপনের ভাবি জানে। কেউ কি আপনারে খবর দিছে যে আইজ ডাক্তারের রিপোর্ট আসছে?
না, খবর দেয় নি।
আইজ ফুল নিয়া আপনা আপনি চইলা আসলেন কী মনে কইরা। জিনিসটার মধ্যে রহস্য আছে না?
সামান্য রহস্য অবশ্য আছে।
এই তো পথে আসছেন। এখন বলেন আলাল-দুলাল নাম কি চলে? নাম শুনলেই মনে হয় ফকিরের পুলাপান। আজ। আপনার মোকাবিলায় নাম নিয়া ফয়সালা হবে। আপনের ভাবির ধারণা সে যেটা বলবে সেটাই ঠিক হবে। ইহা ভুল। সংসারের প্রধান আমি। আপনের ভাবি না।
হাবীব ভাইয়ের বাড়িতে পৌঁছলাম। ভাবির হাতে ফুলের তোড়া দিলাম। বিনীত গলায় বললাম, আজকের এই শুভ দিনে আপনার জন্যে লাল পেড়ে গরদের শাড়ি আনা উচিত ছিল। ভাবি, আপনি তো জানেন আমি গরিব মানুষ।
আমার কথায় হাবীব ভাই মহাবিরক্ত হয়ে বললেন, হিমু ভাই যে একেকটা কথা বলে, রাগে শরীর জুইলা যায়। বউ, কাগজ কলম দেও দেখি, হিমু ভাইরে আমি দোকান লেইখা দিব। এখন আমার দুই ছেলে আছে। ছেলে নিয়া ভিক্ষা করব। দুই ছেলে নিয়া ভিক্ষা করার মধ্যেও আনন্দ।
ভাবি শাড়ির আঁচলে চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, আলালের বাপ! হাত-মুখ ধুইয়া খাইতে আসেন।
হাবীব ভাই দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, কী নামে ডেকেছে শুনেছেন?
মেয়েছেলের ফিচকা বুদ্ধি! কী যে করি। একেকবার বনেজঙ্গলে চাইলা যাইতে মনে চায়। দুই ছেলে নিয়া যখন নিরুদ্দেশ হব। তখন টের পাইবা।
রাতের খাওয়া শেষ করে ঘুমুতে গেছি। ভাবি যত্বের চূড়ান্ত করেছেন। নিজের হাতে মশারি গুজে দিয়েছেন। টেবিলে পানির জগ, গ্লাস। ফ্লাস্কভর্তি চা। রাতে যদি ক্ষিধে লাগে তার জন্যে টিফিন কেরিয়ারের বাটিতে পাটিসাপটা পিঠা।
আমি মশারির ভেতর শুয়ে আছি। হাতে বই— Impossibility, টেবিল ল্যাম্পের আলোয় রহস্যময় বিজ্ঞানের বই পড়তে আরাম লাগছে। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হাবীব ভাইয়ের বাড়ির ছাদ টিনের। বৃষ্টির শব্দ শুনতে ভালো লাগছে।
বাদলা দিনে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুটুর নদেয় এলো বান।
বৃষ্টির কারণে বইয়ে মন বসছে না। আবার বই থেকে চোখ সরাতেও পারছি না–
অতি ক্ষুদ্র বস্তু অদ্ভুত আচরণ করে। ক্ষুদ্র বস্তুর অবস্থান এবং গতি একই সঙ্গে কখনোই জানা যায় না। একটা অনিশ্চয়তা থাকবেই। এই অনিশ্চয়তা প্রথম বের করেন Heisenberg. তার নাম অনুসারে এই সূত্রের নাম Heisenberg Uncertinily Principle. অনেক থিওফসিস্ট মনে করেন ঈশ্বরের অবস্থান এই অনিশ্চয়তায়।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। ঘুম ভাঙল কচকচ শব্দে। চেয়ারে বসে টিফিন কেরিয়ার খুলে অপরিচিত এক রাগী চেহারার বিদেশী কপি কপি করে পাটিসাপটা খাচ্ছেন। আমাকে দেখে তিনি বললেন, আমি এইগুলা কী খাচ্ছি?
পাটিসাপটা পিঠা খাচ্ছেন। আপনি কে জানতে পারি?
আমার নাম হাইজেনবাৰ্গ।
বলেন কী স্যার! আপনি তো বিখ্যাত লোক।
আইনস্টাইনের মতো বিখ্যাত না। অথচ আইনষ্টাইনকে আমি হিসাবের মধ্যেই ধরি না। মূল বিষয়গুলি আমরা সাজিয়ে দেই— সে এইটা ব্যবহার করে। বিরাট গাধা!
গাধা না-কি?
অবশ্যই। তার গাধামির নমুনা শোন— হঠাৎ একদিন বলল, ঈশ্বর পাশা খেলেন না। ভাবটা এরকম যেন ঈশ্বর তার ইয়ার বন্ধু। তাকে কানে কানে বলে গেছেন–আমি পাশা খেলি না।
উনি কি খেলেন?
অবশ্যই। ঈশ্বর স্বয়ং নিয়মের বাইরে যেতে পারবেন না।
স্যার, আপনি তো পিঠা সবগুলা খেয়ে ফেলছেন। ক্ষিধা লাগলে আমি কী খাব?
সরি। ফ্লাস্কে কি চা? এক কাপ চা দাও তো খাই।
আপনি নিজে ঢেলে নিয়ে খান। আরাম করে শুয়ে আছি, উঠতে পারব না।
হাইজেনবাৰ্গ সাহেব চা নিলেন। চায়ে চুমুক দিয়ে গভীর হয়ে গেলেন। আমি বললাম, কিছু চিন্তা করছেন স্যার?
