আমাকে চলে যেতে বলছেন?
হ্যাঁ। Tomorrow morning. নাশতা খেয়ে চলে যাবে। তোমার খালার কাছে আমি একশ টাকা দিয়ে রাখব, রিকশা ভাড়া।
আমি বললাম, আয়না মজিদের সঙ্গে আবার যদি যোগাযোগের দরকার পড়ে তখন কী করবেন? আমি একেক সময় একেক জায়গায় থাকি। প্রয়োজনের সময় আমাকে তো খুঁজে পাবেন না।
প্রয়োজন হবে না। আয়না মজিদের সঙ্গে দুলাখ টাকায় সেটেলমেন্ট হয়ে গেছে। সে আমাকে ঘাটাবে না।
কিন্তু খালু সাহেব, আয়না মজিদ বুঝে গেছে আপনি ভীতু প্রকৃতির। এবং আপনার কাছে টাকা আছে। আবার সে আপনার কাছে টাকা চাইবে। এবং চাইতেই থাকবে। আপনাকে মোটামুটি ছিবড়া করে ছাড়বে।
হিমু! তুমি আমাকে ভয় দেখিয়ে এ বাড়িতে পার্মানেন্ট থাকার ব্যবস্থা করার চেষ্টা চালাচ্ছ। আমার বুদ্ধিকে আন্ডার এষ্টিমেট করা তোমার ঠিক হয় নি। তোমাকে আগামীকাল ভোরে যেতে বলেছিলাম, আমি ডিসিশান চেঞ্জ করলাম।
থেকে যাব?
না! তুমি এখনই যাবে।
খালু সাহেব মানিব্যাগ খুলে একশ টাকার একটা নোট বের করলেন। থমথমে গলায় বললেন, এই নাও রিকশা ভাড়া।
আমি বললাম, বাদল কাটাবনে গেছে টাইগারের গলার বেল্ট কিনতে। সে ফিরুক। বাদলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাই।
তোমার কথার প্যাঁচে আমি পড়ব না। তুমি এখনই যাবে।
অনভ্যাসে বিদ্যা হ্রাস। শুয়ে বসে ঘুমিয়ে শরীর তবদা মেরে গেছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। রিকশা বা সিএনজি নিতে ইচ্ছা করছে। হাত উচিয়ে রিকশা ডাকলাম। রিকশাওয়ালা কাছে এলো না। দূর থেকেই উদাস গলায় বললেন, যাইবেন কই আগে বলেন।
কোথায় যাব এখনো ঠিক করা হয় নি। রিকশায় উঠে ঠিক করব।
যামু না।
তুমি বরং ঠিক কর কোথায় যাবে। সেখানে আমাকে নামিয়ে দিয়ে আস। তুমি যেখানেই নামাবে। সেখানেই যাব।
বললাম তো যামু না।
একশ টাকা ভাড়া পাবে। যেখানেই নিয়ে যাও একশ টাকা।
রিকশাওয়ালা বিরক্ত মুখে চলে যাচ্ছে। সে আমার উপর ভরসা করতে পারছে না। সে ভাবছে আমি ঝামেলার মানুষ। সবাই ঝামেলার মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকতে চায়।
হেঁটে হেঁটে বিজয় সরণি পর্যন্ত চলে এসেছি। ট্রাফিক সিগন্যালের লালবাতি জ্বলেছে। দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িকে ঘিরে নানান বাণিজ্যের চেষ্টা হচ্ছে। নতুন আইটেম পপকর্ন। প্যাকেট ভর্তি পপকর্ন, দাম দশ টাকা। অনেকেই পপকর্ননিয়ে ছোটাছুটি করছে। কেউ কিনছে না। ফুলের বাজারও মন্দা। রাত বাজে দশটা। এই সময় কেউ ফুল কিনে না। হ্যারি পটারের বই হাতে কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে। তারা মুখে বলছে–পটার! পটার! শুনতে ভালো লাগছে।
মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোককে দেখলাম পারিবারিকভাবে ফুল বিক্রির চেষ্টা করছেন। তার চেহারা এবং গায়ের কাপড় স্কুল টিচার টাইপ। চোখে চশমা। তার হাতে গোলাপ ফুলের একটা তোড়া। তিনি প্রতিটি গাড়ির জানালার কাছে যাচ্ছেন। বিড়বিড় করে কী সব বলছেন। ভদ্রলোকের পেছনে তার স্ত্রী এবং ছয়সাত বছরের একটা মেয়ে। তারা মনে হচ্ছে লজ্জায় মরে যাচ্ছে। পারিবারিকভাবে ফুল বিক্রির চেষ্টা এই প্রথম দেখলাম। তারা মনে হয় সঙ্গে করে সংসারও নিয়ে এসেছেন। স্ত্রীর কাধে ব্যােগ। হাতে চামড়ার সুটকেস। মেয়ের হাতে ব্যাগ। ভদ্রলোকের এক কাধে ব্যাগ। এক হাতে বিশাল পুটলি। ভেতর থেকে বালিশ উঁকি দিচ্ছে।
সবুজ লাইট জ্বলছে। গাড়ি ইস ইস করে চলে যাচ্ছে। গোলাপের তোড়া বিক্রেতা ভদ্রলোক স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম।
গোলাপ ফুলের এই তোড়াটার দাম কত?
ভদ্রলোক আচমকা আমার কথা শুনে হকচকিয়ে গেলেন। চিন্তিত ভঙ্গিতে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
দাম কত জানেন না?
ভদ্রলোক বিড়বিড় করে বললেন, যা মনে চায় দিবেন।
একশ টাকা দিলে চলবে?
জি জনাব। অনেক শুকরিয়া।
আমি একশ টাকার নোটটা বের করে এগিয়ে দিলাম। গোলাপের তোড়া হাতে নিতে নিতে বললাম, ঢাকা শহরে কবে এসেছেন?
ভদ্রলোক জবাব দিলেন না।
থাকেন কোথায়?
এই প্রশ্নের জবাবও পাওয়া গেল না। ভদ্রলোক এবং তার স্ত্রী দুজনেই মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বাচ্চা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললাম, নাম কী?
পারুল।
তোমার বাবার নাম কী?
ফজলুর রহমান।
আমি ফজলুল রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললাম, ফজলুর রহমান সাহেব, কাগজ কলম থাকলে একটা ঠিকানা লিখুন। ঢাকা শহরে যদি থাকা খাওয়া বিষয়ে বিরাট কোনো সমস্যায় পড়েন তাহলে এই ঠিকানায় চলে যাবেন। এটা একটা ভাতের হোটেলের ঠিকানা। মালিকের নাম মোল্লা। সবাই ডাকে মোল্লা মামু। তাকে বলবেন, হিমু পাঠিয়েছে। হিমু নাম মনে থাকবে?
থাকবে জনাব।
ভদ্ৰলোক পকেট থেকে বলপয়েন্ট কলম এবং নোট বই বের করলেন। ঠিকানা লিখছেন। তার চোখে পানি এসে গেছে। চোখের পানি চশমার ফ্রেমের নিচ দিয়ে গাল পর্যন্ত চলে এসেছে। ভদ্রলোক পাঞ্জাবির হাতায় চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, এখন গেলে কি মোল্লা ভাইকে পাওয়া যাবে?
অবশ্যই যাবে। তার হোটেল রাত একটা পর্যন্ত খোলা থাকে। তাকে কী বলবেন মনে আছে তো?
জি জনাব, মনে আছে।
আমি ফুলের তোড়া নিয়ে চলে আসছি। তিনজন বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তাদের চোখে বিস্ময় এবং ভয়। বিস্ময়ের কারণ বুঝতে পারছি। ভয়ের কারণ স্পষ্ট না। একশ টাকার নোটটা বাচ্চা মেয়েটার হাতে।
হাবীব এন্ড সন্স মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের দরজা বন্ধ হচ্ছে। হাবীব ভাই ক্যাশ মিলছেন। একজন মিষ্টি ডিপফ্রিজে তুলছে। এক কর্মচারী মেঝে ঝাঁট দিচ্ছে। এই অবস্থায় ফুলের তোড়া হাতে আমার প্রবেশ। হাবীব ভাই টাকা গোনা বন্ধ রেখে তাকিয়ে আছেন। কিছুক্ষণ। এইভাবে কাটল। তিনি আবার টাকা গোনায় মন দিলেন।
