হুঁ।
কী নিয়ে চিন্তা করছেন?
ল্যাপটপ নিয়ে নিয়ে চিন্তা করছি। আমার সময় এই বিষয়টা কেউ জানত না।
আপনারা সাইনটিস্টরা কি মৃত্যুর পরেও গবেষণা করে যাচ্ছেন?
এছাড়া কী করব! তবে আইনষ্টাইন মাঝে মধ্যে বেহালা টেহালা বাজায়। ভাব করে যেন বিরাট বেহালা বাদক— ইয়াহুদি ম্যানহুইল। অনেকে আবার বিরাট সমঝদারের মতো তার বেহালা শুনতে যায়। বেতালায় মাথা নাড়ে। যেমন মাক্স প্লাংক। বিরাট গাধা। প্রথম শ্রেণীর গাধা।
তাই না-কি।
অবশ্যই। বিজ্ঞানীরা যখন গাধা হয় প্রথম শ্রেণীর গাধা হয়। আইনষ্টাইন যখন অনিশ্চয়তা সূত্রে আমার বিপক্ষে চলে গেল তখন ম্যাক্স প্লাংকও চলে গেল। ভাবল বড়র সাথে থাকি। গাধামি করেছে কি-না তুমি বলো।
অবশ্যই গাধামি করেছে।
আমি তো তার সঙ্গে কথাই বলি না। তার সঙ্গে কথা বলা মানে সময় নষ্ট।
পরকালে সময় বলে তো কিছু নেই। কাজেই সময় নষ্ট হওয়ার প্রশ্ন উঠে না।
কথাটা মন্দ বলো নি। তুমি উঠে বসো–সময় কী এই নিয়ে আলোচনা করি।
স্যার, ঘুমে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আপনি আজ চলে যান, অন্য একদিন আসুন। গল্প করব।
এখন তো যেতে পারব না। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি থামলে চলে যাব।
বাতিটা নিবিয়ে দিন না। স্যার। আপনার হাতের কাছে সুইচ।
ঘরের বাতি নিভে গেল। আমি চাদরে মাথা ঢেকে ঘুমুতে গেলাম।
হাবীব ভাইয়ের বাড়িতে
হাবীব ভাইয়ের বাড়িতে প্ৰথম প্রভাত। মশারির ভেতর থেকে এখনো বের হই নি। ঝিম ধরে বসে আছি। আয়োশি বিম, কাটতে সময় লাগবে। মশারির ভেতরেই আমাকে এক পিস বাখরখানি দিয়ে চা দেয়া হয়েছে। চারটা খবরের কাগজ দেয়া হয়েছে। এ বাড়িতে খবরের কাগজ রাখা হয় না। আমার জন্যে হাবীব ভাই কিনে এনেছেন। আমাকে জানিয়েছেন উন্নত মানের নাশতার ব্যবস্থা হচ্ছে। একটু সময় লাগবে। উন্নত মানের নাশতার বিবরণও শুনিয়েছেন—
পরোটা
নান রুটি
খাসির চাপ
পায়া
পরোটা ঘরে বানানো হচ্ছে। বাকি আইটেম পুরনো ঢাকার পালোয়ানের দোকান থেকে আসছে। এদের খাসির চাপ এবং পায়া না-কি বিশ্বসেরা।
চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছি। হাতে যে কাগজটা আছে তারা মনে হয় বিশেষ ধর্ষণ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। প্রথম পৃষ্ঠায় ধর্ষণ সংবাদ (সচিত্র), কলেজ ছাত্রী শিপ্রার গণধর্ষণবিষয়ক স্টোরি। শিপ্রার বক্তব্য। একজন ইউপি চেয়ারম্যানের বক্তব্য, ওসি সাহেবের বক্তব্য। শেষের পাতায় ধর্ষণ সংবাদ (সচিত্র)। ভেতরের পাতায় মফস্বল ধর্ষণ সংবাদ।
অন্য আরেকটি খবরের কাগজ হাতে নিয়ে ধাক্কার মতো খেলাম। প্রথম পাতায় বাদলদের বাড়ির ছবি। খবরের শিরোনাম— কুকুরের হাতে বন্দি।
খবর পড়ে জানা গেল টাইগার নামের একটি হিংস্র এবং প্রায় বন্য কুকুরের হাতে গৃহের সবাই বন্দি। গৃহের সকল সদস্য সারারাত ছাদে কাটিয়েছে। কুকুরটাই না-কি সবাইকে তাড়া করে ছাদে তুলেছে এবং নিজে ছাদের সিঁড়িতে ঘাটি গেড়েছে। ছাদ থেকে কাউকে নামতে দিচ্ছে না। কাউকে ছাদে উঠতেও দিচ্ছে না। ছাদে যারা বন্দি তাদের উদ্ধারের জন্য দমকল বাহিনীকে খবর দেয়া হয়েছিল। দমকল বাহিনীর লোকজন পানির পাইপ হাতে ছাদে উঠতে গেলে কুকুরের তাড়া খেয়ে দ্রুত নামার সময় দুজন পা পিছলে গুরুতর আহত হয়। এই দুজন পঙ্গু হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন।
কুকুরের ছবি তোলার জন্যে একটি বেসরকারি টিভির ক্যামেরাম্যান কুকুরের কামড় খেয়েছেন এবং তার মূল্যবান ক্যামেরা হারিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলজি বিভাগের একজন শিক্ষক ড. ফজলে আবেদ কুকুরের ছবি এবং তার কর্মকাণ্ডের বিবরণ শুনে মন্তব্য করেছেন যে, এটি কোনো সাধারণ কুকুর না। বিশেষ প্রজাতির এলসেশিয়ান কুকুর। এবং উচ্চতর ট্রনিংপ্রাপ্ত কুকুর। ড. ফজলে আবেদের ধারণা র্যাব তাদের ডগ স্কোয়াডে যে সব কুকুর রেখেছে। টাইগার তাদেরই একজন। ডগ স্কোয়াড থেকে পালিয়ে সে তার স্বাধীন কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে।
ব্ল্যাবের প্রধান কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। নাম না প্ৰকাশ করার শর্তে জনৈক র্যাব কর্মকর্তা বলেন, তাদের ডগ স্কোয়াডের একটি ডিগ গত এক মাস ধরে মিসিং। একটি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে দুর্ধর্ষ এক কুকুর জনজীবনে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবহেলার কৈফিয়ত কে দেবে?
কঠিন প্রতিবেদন। এমন প্রতিবেদন পড়ে চুপ করে বসে থাকা যায় না। আমি হাবীব ভাইয়ের মোবাইল থেকে যোগাযোগ করলাম। প্রথম রিং-এ খালু সাহেব ধরলেন। ধরেই খ্যাক করে উঠলেন, কে?
আমি বললাম, আমি হিমু।
খালু সাহেবের গলায় হাহাকার ধ্বনি, তুমি খবর কিছু জানো?
কী খবর?
সারারাত হৈচৈ। মাতামতি। এখন সবগুলি টিভি চ্যানেলে খবর দেখাচ্ছে আর তুমি কিছু জানো না! আমরা তোমার ঐ ভয়ঙ্কর কুকুরের হাতে বন্দি। সবাই এখন ছাদে। রাতে কেউ ডিনার করতে পারে নি।
ব্রেকফাস্টের অবস্থা কী?
পাশের বাড়ির ছাদ থেকে পলিথিনের ব্যাগে নাশতা ভরে ছুড়ে ছুড়ে মারছে। তুমি টিভি খোল। টিভি খুললেই Live দেখতে পাবে। তোমার কাছে আমার অনুরোধ– খবর পরে দেখবে। এই খবর অনেকবার রিপিট করবে। তুমি এসে তোমার কুকুর নিয়ে যাও। আমার কোনো কারণে যদি তুমি আমার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে থাক, Forgive me.. মানুষ মাত্রই ভুল করে। নাও বাদলের সঙ্গে একটু কথা বলো।
