সবকিছুই চক্রাকারে ঘোরে। পৃথিবী ঘোরে সূর্যের চারদিকে। ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসকে ঘিরে ঘোরে। আমি ঘুরছি বকুল গাছের চারদিকে। বৃষ্টি ঝরেই যাচ্ছে।
বাদলা দিনে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান।
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এলো বান।
হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে লম্বু খোকন। তার ঠোঁট কাঁপছে। মনে হয় বিড়বিড় করে কিছু বলছে। ঝালমুড়িওয়ালা মনে হয়। ভয় পেয়েছে। সে লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে যাচ্ছে। যাবার পথে একবার সে তাকাল, তার চোখে স্পষ্ট ভয়ের ছায়া।
লম্বু খোকন হাত ইশারা করে আমাকে ডাকছে। আমি এগিয়ে গেলাম। লঘু খোকন বিড় বিড় করে বলল, হিমু ভাই, ঘটনাটা কী?
আমি বললাম, কোনো ঘটনা জানতে চাচ্ছেন?
আপনার বিষয়ে জানতে চাই। আপনি কে?
আমি বললাম, বিরাট ফিলসফির প্রশ্ন করে ফেলেছেন— আমি কে? হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ চেষ্টা করেছে আমি কে? প্রশ্নের উত্তর বের করতে। পারে নি। একজন কেউ উত্তর বের করে ফেললেই সবার বেলায় সেটা খাটবে। আপনিও উত্তরের চেষ্টা করতে পারেন। বকুল গাছের চারপাশে চক্কর দেবেন এবং বলবেন, আমি কে? আমি কে? একদিনে হবে না। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বরাট ব্রুস টাইপ চেষ্টা। রবার্ট ব্রুস কে জানেন?
জি না।
নিজেকে জানলেই উনাকে জানবেন। লঘু ভাই বিদায়। আবার কোনো একদিন বকুলতলায় দেখা হবে।
আমি লম্বু খোকনকে হতভম্ব অবস্থায় রেখে চলে এলাম।
টাইগার এখন বাদলের হেফাজতে
টাইগার এখন বাদলের হেফাজতে। বাদল মহাউৎসাহে তার গায়ে লাক্স সাবান ঘষছে (লাক্স সুপার স্টাররা মন খারাপ করবেন না)। টাইগারের দাঁত ব্ৰাস করার জন্যে ব্ৰাস কেনা হয়েছে। স্মোকারস পেষ্ট কেনা হয়েছে। টাইগার সব যন্ত্রণা সহ্য করছে। কিছু যন্ত্রণা মনে হয় উপভোগও করছে, বিশেষ করে দাঁত মাজা পর্ব। পেস্টটা পছন্দ করে খাচ্ছেও।
বাদল লাইব্রেরি থেকে কুকুর বিষয়ে দুটা বই এনেছে। একটার নাম Dogs Life. এই বইয়ে একটা কুকুরের বড় হওয়া বিতং করে লেখা। অন্য বইটার নাম Training a Dog। বাদলের মতে দ্বিতীয় বইটা অসাধারণ। কুকুরকে ট্রেনিং দেয়ার জন্যে বিভিন্ন সাইজের বল এবং সাইকেলের চাকা আনা হয়েছে। সাইকেলের চাকা কোন কাজে লাগবে এখনো বোঝা যাচ্ছে না।
একজন কাঠমিস্ত্রিকে খবর দিয়ে আনা হয়েছে। প্লাইউড় কেনা হয়েছে। কাঠমিস্ত্রি কুকুরের ঘর বানাচ্ছে। সেই ঘরের ডিজাইনও বাদলের। ডিজাইনে বিশেষত্ব আছে। ছাদের একটা অংশ কাচের। যাতে ঘরে আলোর সমস্যা না হয়।
আমি সময় কাটাচ্ছি বই পড়ে। বাদলের আনা ভূতের DVD দেখে শেষ করে ফেলেছি। বই পড়া ছাড়া গতি নেই। এখন যে বইটা পড়ছি তার নাম impossibility লেখকের নাম জন ডি. বেরো। কঠিন বই। বইয়ের বিষয়বস্তু হলো জগতের অনেক রহস্যই আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব না; যত চেষ্টাই করা হোক না, বেশির ভাগ তথ্যই আমরা জানব না। যারা বিশ্বাস করেন বিজ্ঞান সব রহস্য ভেদ করে ফেলবে এই বই তাদের জন্যে বিরাট দুঃসংবাদ।
এক সপ্তাহের উপর হলো, খালু সাহেবের সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে না। তিনি বিচিত্র কারণে আমাকে এড়িয়ে চলছেন। ছাদের আসরেও আমার ডাক পড়ছে না। খালাও চাচ্ছেন আমি যেন বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যাই। যদিও মুখের উপর বলছেন না। ইশারা ইঙ্গিতে বলছেন। স্বল্পবুদ্ধির কারণে তার ইশারা ইঙ্গিত স্কুল ধরনের। উদাহরণ–
হিমু, তুই তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শরীর নষ্ট করে ফেলেছিস। হেঁটে বেড়ানো যার অভ্যাস তার কি আর শুয়ে সময় কাটালে চলে? আমি তোর কষ্টটা বুঝতে পারছি। এই বাড়িতে থেকে তুই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছিস না। এক কাজ করা, আগে যেখানে ছিলি সেখানে চলে যা। নিজের মনে থাক।
খালা, এখানে ভালোই আছি। তবে তোমাদের অসুবিধা হলে ভিন্ন কথা। বাড়তি একজনকে তিন বেলা খাওয়ানো—
কী কথা বললি হিমু! ছিঃ! তুই মন মরা হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকিস, হাঁটাহাঁটি করতে পারিস না, এইজন্যে বলছি।
এখন থেকে তোমাদের বাড়ির ছাদে হাঁটাহাঁটি করব। হাসিখুশি থাকব।
খালা মুখ কালো করে বললেন, তাহলে তো ঠিকই আছে।
খালু সাহেব স্কুল বাঁ সূক্ষ্ম কোনো ইশারা ইঙ্গিতে গেলেন না। সরাসরি বললেন, বিদেয় হও। আমাকে তার ব্যক্তিগত বারে (ছাদ, পার্টি বিছানো, দুটা বালিশ।) ডেকে নিয়ে গেলেন।
গম্ভীর গলায় বললেন, হিমু, আমার এখানে কতদিন আছ?
দুমাস হতে চলল।
দুমাসের বেশি হয়েছে। এই দুমাসে বাদলের অবস্থা দেখেছি? পড়াশোনা নেই, ছবি দেখা আর রাত জাগা। এখন আবার কুকুর নিয়ে মেতেছে। এই কুকুরও তো তুমি এনেছ?
জি।
বিশেষ কোনো জাতের কুকুর?
জি-না। নেড়ি কুকুর। ডাস্টবিনে ডাস্টবিনে জীবন কাটাচ্ছিল, ডেকে নিয়ে চলে এসেছি।
জানতে পারি কেন?
বেচারাকে একটা বেটার লাইফ দেবার ইচ্ছা থেকে কাজটা করেছি। কুকুর হচ্ছে মানুষের বেষ্ট ফ্রেন্ড। তার এ-কী কুৎসতি জীবন! ডাস্টবিনে ডাস্টবিনে খাদ্যের অনুসন্ধান।
খালু সাহেব গ্রাসে পর পর কয়েকটা চুমুক দিয়ে বললেন, কুকুর এনেছি, কয়েকদিন পর বিড়াল আনবে, বোদর আনবে। বাসাটা হবে মিনি চিড়িয়াখানা। বাদল চিড়িয়াখানার মহাপরিচালক। আমি তো এটা এলাউ করব না। এখন আমি তোমাকে একটা কঠিন বাক্য বলব। কঠিন বাক্য কঠিনভাবেই বলা উচিত।
কঠিন বাক্যটা কী?
কাল সকালে তুমি চলে যাও। তুমি আমার একটা কাজ করে দিয়েছ, তার জন্যে থ্যাংকস। কাজটা এমন জটিল কিছু না। আমার অফিসের পিওনকে দিয়েও করতে পারতাম।
