আলু ভাজি
বেগুন ভাজি
মাঝারি সাইজের চিংড়ি ভাজি
মুরগির পাতলা ঝোল
পোলাওয়ের চালের ভাত।
খেতে বসেছি আমি একা। আয়না মজিদ একা খান। তিনি আমার সামনে উপস্থিত আছেন। এখনো আগের মতোই প্লাষ্টিক চেয়ারে বসা। হাতে সিগারেট।
তৃপ্তি করে খাচ্ছি। প্রতিটি আইটেম অসাধারণ। যে বাবুর্চি এই রান্না রেঁধেছে মজিদ ভাই, খেয়ে খুবই আরাম পেয়েছি। যে বাবুর্চি রেঁধেছে তাকে রন্ধন শ্রেষ্ঠ পদক অনায়াসে দেয়া যায়। আমি আন্তরিকভাবেই বললাম, মজিদ ভাই, খেয়ে খুবই আরাম পেয়েছি। যে বাবুর্চি রেঁধেছে সে বাবুর্চি না। মহান শিল্পী— পিকাসো গোত্রের শিল্পী।
আয়না মজিদের মুখের কাঠিন্য অনেকখানি কমে গেল। আমি বললাম, আমার যদি ফাঁসির হুকুম হয় তাহলে শেষ খাবার হিসেবে আজ যা যা খেয়েছি তা-ই খেতে চাইব। বাবুর্চির নামটা জানতে পারি?
আমি রেঁধেছি।
আপনি?
লঞ্চের রেস্টুরেন্টে কাজ করার সময় রান্না শিখেছি। এখন বেশির ভাগ সময়ই আমাকে দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতে হয়। সময় কাটাবার জন্যে প্রায়ই রান্না করি।
লাস্ট সাপার হিসেবে আপনি কী খেতে চাইবেন? মনে করুন। আপনি জানেন আগামীকাল ভোরে আপনার মৃত্যু। রাতের খাবার আপনার জীবনের শেষ খাবার। আপনি কী খেতে চাইবেন?
আয়নী মজিদের চোখমুখ আবার কঠিন হয়ে গেল। চোখ তীক্ষ্ণ। বুঝতে পারছি এই প্রশ্নের জবাব পাব না।
আয়না ভাই! অনুমতি দিন, উঠি?
আয়না মজিদ কিছু বললেন না। বাইরে বৃষ্টি এখনো পড়ছে। লক্ষণ ভালো না। ঝড় হতে পারে। আবহাওয়া অফিস কোনো নম্বর ঝুলিয়ে দিয়েছে কি-না কে জানে! হয়তো বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসছে কোনো সর্বনাশ।
টাইগার তার জায়গাতেই আছে। তার সামনের টিনের থালা দেখে অনুমান করতে পারি তাকে খাওয়া দেয়া হয়েছে। সে আমাকে দেখে কাটা লেজ নাড়িয়ে নিচুস্বরে কিছুক্ষণ ঘেউঘেউ করল। যার অর্থ সম্ভবত— স্যার! কোথায় ছিলেন? টেনশান হচ্ছিল তো। আমরা কি এখন চলে যাব? সঙ্গে ছাতা দেখছি না। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে যাবেন? আমার অসুবিধা নাই। আপনাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা। ঠান্ডা বাধিয়ে বসেন কি-না।
আমি এগুচ্ছি। আমার পেছনে পেছনে টাইগার। টাইগারের পেছনে ছাতা মাথায় লম্বু খোকন। আমি কী করি, কোথায় যাই, এই বিষয়ে হয়তো তাকে রিপোর্ট করতে হবে। লম্বু খোকন আমাকে এখন সমীহ করছে। আগে তুমি তুমি করে বলছিল। এখন আপনি। আপনি, তুমি, তুই থাকায় আমাদের অনেক সুবিধা। সামাজিক অবস্থান এক সম্বোধনেই স্পষ্ট।
জাপানি ভাষায় আপনি, তুমি, তুই ছাড়াও আরো এক ধরনের সম্বোধন আছে– অতি আপনি। যারা বিশেষ সম্মানের তাদের জন্যে এই সম্বোধন।
লম্বু খোকন এগিয়ে এসে আমার পশিপাশি হাঁটতে লাগল। বিনয়ী স্বরে বলল, হিমু ভাই! একটা কথা বলব?
আমি বললাম, বলে শুনি।
সে আপনি শুরু করেছে, আমি নেমে গেছি তুমিতে।
আপনার ঘরের তালা আমি বন্ধ করেছিলাম। তালাবন্ধের কাজ তো আজ প্রথম করি নাই। অনেকবার করেছি। তালা দেওয়ার পর আমি কয়েকবার টেনে দেখি সব ঠিক আছে কি-না। সবই ঠিক ছিল। সেই তালা আপনি কীভাবে খুললেন?
মন্ত্র পড়ে খুলেছি।
মন্ত্রটা কী?
মন্ত্রটা হচ্ছে রবি ঠাকুরের গান। আবেগের সঙ্গে গাইতে হবে— ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে।
লঘু খোকন হতাশ গলায় বলল, ও!
আমি বললাম, তুমি আমার পেছনে পেছনে কেন আসছ? আমাকে follow করা তোমার ঠিক হবে না। আমি কিছু কাণ্ডকারখানা করব যা দেখে তুমি ভড়কে যাবে। রাতে ঘুম হবে না। শরীর খারাপ করবে।
আপনি কী করবেন?
প্রশ্নের জবাব দিলাম না। কারণ আমি কী করব নিজেই জানি না। ভেবেচিন্তে উদ্ভট কিছু বের করতে হবে। এমন কিছু করতে হবে যা লম্বু খোকনের মাথার ভেতর ঢুকে যায়। কিছু কিছু মানুষের মাথায় গানের লাইন ঢুকে যায়। দিনের পর দিন মাথার ভেতর সেই গান বাজতে থাকে। লম্বু খোকনের মাথায় আমি অদ্ভুত কোনো দৃশ্য ঢুকিয়ে দিতে চাচ্ছি।
ঝমঝম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রমনা পার্কে ঢুকে পড়লাম। পার্ক জনশূন্য। বেঞ্চে পলিথিনের ওভারকোট ধরনের পোশাক পরা এক ঝালমুড়িওয়ালা বিরুস মুখে বসে আছে। বৃষ্টির দিনে ঝালমুড়ি উপাদেয় খাদ্য, কিন্তু কোনো খাদক দেখছি না।
অদ্ভুত দৃশ্যের আইডিয়া মাথায় এসে গেছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে উত্তপ্ত এবং উত্তেজিত মস্তিষ্কে এই দৃশ্য সহজেই ঢুকে যাবে। লম্বু খোকনের মস্তিষ্ক তালাবিষয়ক জটিলতায় যথেষ্ট উত্তেজিত। সেই উত্তেজনা আরো কিছুটা বাড়িয়ে কাজে নামতে হবে।
খোকন।
জি।
তোমার বাবা জীবিত না মৃত?
উনি মারা গেছেন। হার্ট অ্যাটাক।
কখন মারা যান?
সন্ধ্যার আগে আগে।
ঠিক এই সময়, তাই না?
জি।
সেদিনও বৃষ্টি বাদলা ছিল?
জি ছিল।
সেদিন দুপুরে তোমার বাবা তার জীবনের শেষ খাওয়াটি খান। ঠিক না?
জি।
কী খেয়েছিলেন তুমি নিশ্চয়ই জানো। মৃত্যুর পর শেষ খাওয়া নিয়ে অনেকবার আলোচনা হয়। জানা থাকার কথা।
কচুর লতি দিয়ে চিংড়ি মাছ।
খলসে মাছের টক সালুন।
পাটশাক ভাজি আর মাষের ডাল।
উনি যদি জানতেন এটাই হবে তার দীর্ঘজীবনের শেষ খাওয়া তাহলে তিনি কী খেতে চাইতেন?
সেটা তো জানি না।
তুমি তোমার জীবনের শেষ খাওয়া কী খেতে চাও? চিন্তা করে বের করা।
খোকন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। তার মস্তিষ্ক চিন্তা করতে শুরু করেছে। মস্তিষ্ককে একই সঙ্গে দুধরনের আবেগ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। সুখাদ্যের সুখকর চিন্তার আবেগ এবং মৃত্যুর গভীর বেদনার আবেগ। মস্তিষ্ক দুই বিপরীত আবেগে উত্তেজিত হতে শুরু করেছে। এখন আমার জন্যে উপযুক্ত সময় কাজে নেমে যাওয়া। আমি কাজে নেমে গেলাম। মাঝারি আকৃতির একটা বকুল গাছকে ঘিরে চক্রাকারে হাটতে শুরু করলাম। টাইগার আমার পেছনে পেছনে হাঁটছে। কাজটায় সে আনন্দও পাচ্ছে।
