না।
কুকুর নিয়ে ঘোরা শুরু করেছিস। এটাও তো ঠিক না। তোকে বলেছি না, বন্ধু পাতাবি না, শত্রু পাতাবি না। তোকে যা যা শিখিয়েছি তার কোনোটাই তো তুই পালন করছিস না। দুই লাখ টাকা ব্যাগে নিয়ে ঘুরছিস। why? তুই থাকবি কপর্দকশূন্য অবস্থায়। সরি বল।
সরি।
তোকে তালাবন্ধ করে রেখেছে না-কি?
হুঁ।
বুদ্ধি খেলে বের হয়ে যা। তালা খোলা তো কোনো ব্যাপার না। না-কি আমি খুলে দিয়ে যাব?
দাও।
ঠিক আছে, যাবার সময় তালা খুলে দিয়ে যাব। এখন ফরম ফিলাপ কর। Identification mark কী বল।
পাছায় কালো জন্মদাগ আছে। এটা দেয়া কি ঠিক হবে?
কেন ঠিক হবে না! সত্য যত কঠিনই হোক, সত্য সত্যই। তুই একটু সরে আমাকে জায়গা দে। শুয়ে শুয়ে ফরম ফিলোপ করি।
কিছু খাবে বাবা? টেবিলে সমুচা আছে।
সমুচা তো আমিষ খাবার। আমি আমিষ খাবার কেন খাব! আমি নিরামিষাষি না? তুই কি আমিষ খাওয়া ধরেছিস?
হুঁ।
হিমু, আমি আপসেট। ভেরি ভেরি আপসেট। কম্বলটা গায়ের উপর তুলে দে না। ঠাণ্ডা লাগছে তো।
আমি বাবার গায়ে কম্বল টেনে দিলাম।
কোলবালিশটা দে। অনেক দিন কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে ঘুমাই না।
আমি কোলবালিশ এগিয়ে দিলাম। বাবা কাগজপত্র ফেলে কোলবালিশ নিয়ে ঘুমুতে গেলেন। তাকে খুব ক্লাস্ত দেখাচ্ছে। মনে হয় অনেকদিন আরাম করে ঘুমান না। এখন কোলবালিশ জড়িয়ে সুখনিদ্ৰা।
ঘুম ভাঙল ঝমঝম বৃষ্টির শব্দে। পাকা দালানকোঠায় বৃষ্টির শব্দ শোনা যায় না। যখন শোনা যায়। তখন ধরে নিতে হবে আকাশ ফুটো হয়ে গেছে।
ঘর অন্ধকার। টেবিল ল্যাম্প জুলছে। সময় বোঝা যাচ্ছে না। এসেছি সকালে। এক ঘুমে রাত এনে ফেলব তা হয় না। প্লাষ্টিকের চেয়ারে পায়জামা পাঞ্জাবি পরা একজন সুপুরুষ মধ্যবয়স্ক মানুষ। হাতে সিগারেট। ভুরু কুঁচকে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। হাতের সিগারেট উঠানামা করছে। ইনি ভয়ঙ্কর আয়না মজিদ ভাবতেই কেমন যেন লাগে। আমি উঠে বসতে বসতে বললাম, আয়না ভাই! কয়টা বাজে?
আয়না ভাই আমার সম্বোধনে মোটেই চমকালেন না। যেন ধরেই নিয়েছেন তাকে এই প্রশ্ন করা হবে। তিনি নির্বিকার গলায় বললেন, তিনটা বাজতে সাত शिनि।
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, লম্বা ঘুম দিয়ে দিয়েছি। অনেকদিন এ রকম আরামের ঘুম হয় না। আয়না ভাই, আপনার সামনের চেয়ারে যে ব্যাগ ঝুলছে সেই ব্যাগে দুই লাখ টাকা আছে। নিয়ে নিন। আমি চলে যাই। প্রচণ্ড ক্ষিধে লেগেছে। বাসায় যাব, খাওয়াদাওয়া করব।
খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
থ্যাংক য়্যু। আমার কুকুরটাকেও খাওয়াতে হবে। কুকুরটা আছে, না চলে গেছে?
আছে।
আয়না মজিদ হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে দ্বিতীয় সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, আপনি ঘরের তালা কীভাবে খুললেন? তালা খুলে ঘরে শুয়ে থাকলেন কেন? চলে যান নি কেন? এই প্রশ্নগুলির জবাব চাই।
আমি খানিকটা হকচাকিয়ে গেলাম। তালা সত্যি সত্যি খোলা হয়েছে এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। জগতে রহস্যময় ব্যাপার ঘটে। তবে স্বপ্নে বাবা এসে তালা খুলে ছেলেকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করে–এরকম রহস্যময় ঘটনা ঘটে না। স্বাভাবিক ব্যাখ্যা হচ্ছে, টেনশনে লম্বু খোকন ঠিকমতো তালাই লাগায় নি।
আপনি আমার প্রতিটি প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেবেন। জবাব দিতে থাকুন।
আমি বললাম, জবাব দেব কেন? আমি কি রিমান্ডে?
হ্যাঁ রিমান্ডে।
আয়না ভাই শুনুন। আমি রিমান্ডে না। রিমান্ডে আপনি। আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দেবেন।
আয়না মজিদের শরীর শক্ত হয়ে গেল। চোখে পলক পড়া বন্ধ। নিঃশ্বাসও মনে হয় বন্ধ। তিনি নিজেকে সামলানোর সময় নিচ্ছেন। তার ভেতরে ভয়ও মনে হয় কাজ করছে। তার মন বলছে প্ৰতিপক্ষ কঠিন। তাকে সাবধানে Handle করতে হবে। ভয়ঙ্কর মানুষ সবসময় ভয়ঙ্কর ভীতু হয়ে থাকে। তারা মানুষ ভয় পায় না, দৈবে ভয় পায়। ঘরের তালা খুলে যাওয়াটা আমার পক্ষে কাজ করছে। আয়না মজিদ সুপার ন্যাচারাল কিছু আশঙ্কা করছেন।
আপনার নাম হিমু?
আমার নাম একেকজনের কাছে একেক রকম। কেউ ডাকে হিমু। কেউ ডাকে হিমালয়। আবার কেউ কেউ আয়না মজিদও ডাকেন। এস বি ইন্সপেক্টর কবীর সাহেব আমাকে ডাকেন আয়না মজিদ।
আপনি সেই লোক যাকে পুলিশ আয়না মজিদ হিসাবে ধরেছে। এবং আপনি পুলিশ কাস্টিডি থেকে পালিয়ে এসেছেন?
হুঁ।
আপনার সঙ্গে আমার চেহারার মিল আছে, এটা কি আপনি জানেন?
জানতাম না। আপনাকে দেখে সেরকমই মনে হচ্ছে।
অবাক হচ্ছেন না?
আমি বললাম, না। প্রকৃতি একই চেহারার মানুষ সবসময় সাতজন করে তৈরি করে।
কে বলেছে?
সবাই জানে। আপনি জানেন না, কারণ আপনি পড়াশুনা করার সময় পান নি। খুন-খারাবিতে সময় চলে গেছে।
পুলিশ কাস্টিডি থেকে কীভাবে পালিয়েছেন?
জানতে চান কেন?
বিদ্যাটা শিখে রাখতে চাই।
শিখলেও কাজে লাগাতে পারবেন না।
আসুন ভাত খাই, তারপর কথা বলব।
ভাত খাওয়ার পর আমি কোনো কথাই বলব না। পান মুখে দিয়ে সিগারেট ফুকতে ফুকতে চলে যাব। আমাকে আটকে রাখার শেষ চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
আটকে রাখার চেষ্টা করলে কী হবে?
আমার কুকুর আপনাকে কাচা খেয়ে ফেলবে। তাকে দেখে আপনি বিভ্রান্ত হয়েছেন। ভেবেছেন। নেড়ি কুকুর।
নেড়ি কুকুর না?
পাগল হয়েছেন? আয়না মজিদ নেড়ি কুকুর নিয়ে ঘোরে না। খাবার দিতে বলুন।
তোষকের উপর খবরের কাগজ বিছিয়ে আমাকে খেতে দেয়া হয়েছে। রাজসিক খাবার না, তামসিক খাবারও না; প্রায় সাত্বীক খাবার।
