হোটেল হইতে খাওয়া-দাওয়া সারিয়া হাজারি বাহির হইয়া মোড়ের দোকানে এক পয়সার বিড়ি কিনিয়া ধরাইল। চূর্ণীর ধারে তাহার সেই পরিচিত গাছতলাটায় কতদিন বসা হয় নাই–সেখানে গিয়া আজ বসিতে হইবে। পথে রাধাবল্লভতলায় সে ভক্তিভরে প্রণাম করিল। আজ তাহার মনে যথেষ্ট আনন্দ, রাধাবল্লভ ঠাকুর জাগ্রত দেবতা, এমন দিনও তাহাকে জুটাইয়া দিয়াছেন! আজ ভোরে যখন বাড়ী হইতে বাহির হইয়াছিল, সে কি ইহা ভাবিয়াছিল? অস্বপনের স্বপন। চোর বলিয়া বদনাম রটাইয়া যাহারা তাড়াইয়াছিল, আজ তাহারাই কিনা যাচিয়া তাহাকে চাকুরিতে বহাল করিল।
চূর্ণী নদীর ধারে পরিচিত গাছতলাটায় বসিয়া সে বিড়ি টানতে টানিতে এক পয়সার বিড়ি শেষ করিয়া ফেলিল মনের আনন্দে। কুসুমের বাড়ী এখন সব ঘুমাইতেছে, গৃহস্থ বাড়ীতে দেখাশুনা করিবার এ সময় নয়–বেলা কখন পড়িবে? অন্ততঃ চারটা না বাজিলে কুসুমের ওখানে যাওয়া চলে না। এখনও দেড় ঘণ্টা দেরি।
গোপালনগরের কুণ্ডুবাড়ী হইতে তাহার কাপড়ের পুঁটুলিটা এক দিন গিয়া আনিতে হইবে। গত মাসের মাহিনা বাকি আছে, দেয় ভালো, না দিলে আর কি করা যাইবে?
আজ একটু রাত থাকিতে উঠিবার দরুন ভাল ঘুম হয় নাই–তাহার উপরে অনেক দিন পরে হোটেলের খাটুনি, পাঁচক্রোশ পায়ে হাঁটিয়া স্বগ্রাম হইতে রাণাঘাট আসা প্রভৃতির দরুন হাজারির শরীর ক্লান্ত ছিল–গাছতলার ছায়ায় কখন সে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। যখন ঘুম ভাঙিল তখন সূর্যের দিকে চাহিয়া তাহার মনে হইল চারিটা বাসিয়া গিয়াছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে সে কুসুমের বাড়ীর দরজায় গিয়া কড়া নাড়ল।
কুসুম নিজে আসিয়াই খিল খুলিল এবং হাজারিকে দেখিয়া অবাক হইয়া বলিল–জ্যাঠা মশায়! কোথা থেকে? আসুন—আসুন–
তার পরেই সে নীচু হইয়া হাজারির পায়ের ধূলা লইয়া প্রণাম করল। হাজারি হাসিমুখে বলিল–এস এস মা, কল্যাণ হোক। ছেলেপিলে সব ভাল তো? এত রোগা হয়ে গিয়েছ, ইস। তোমার কাকার মুখে তোমার বড্ড অসুখের কথা শুনলাম।
কুসুম বাড়ীর মধ্যে তাহাকে লইয়া গিয়া ঘরের মেঝেতে শতরঞ্জি পাতিয়া বসাইল। বলিল–ভয় নেই জ্যাঠামশায় মরচি নে অত শীগগির। আপনি সেই যে গেলেন, আর কোনো খবর নেই। অসুখের সময় আপনার কথা কত ভেবেছি জানেন জ্যাঠামশায়? মরেই যদি যেতাম, দেখা হোত আর? অখদ্দে আপদ না হোলে মরেই তো–
–ছি ছি, মা, ও রকম কথা বলতে আছে?
–কোথায় ছিলেন এতদিন আপনি? আজ কোথা থেকে এলেন?
–এঁডোশোলা থেকে।
কুসুম ব্যস্ত হইয়া বলিল–হেঁটে এসেছেন বুঝি? খাওয়া হয়নি?
হাজারি হাসিয়া বলিল–ব্যস্ত হয়ো না মা। বলচি সব। সকালে বেরিয়েছিলাম এঁড়োশোলা থেকে, বলি যাই একবার রাণাঘাট, তোমার সঙ্গে দেখা করবার ইচ্ছে খুব হোল। বেল বাজারে যেমন বাবুর হোটেলে দেখা করতে যাওয়া, অমনি বাবু বহাল করলেন কাজে। সেখানে কাজ সাঙ্গ করে চূর্ণীর ধারে বেড়িয়ে এই আসছি।
–ওমা আমার কি হবে? ওরা আবার আপনাকে ডেকে বহাল করেছে। তবে মিথ্যে চুরির অপবাদ দিয়েছিল কেন? পদ্ম আছে তো?
–পদ্ম নেই তো যাবে কোথায়? আছে বলে আছে! খুব আছে।
পরে গর্বের সুরে বলিল–আমায় না নিলে হোটেল যে ইদিকে চলে না। খদ্দেরপত্তর তো আদ্ধেক ফর্সা। সব উঠেছে গিয়ে বাঁডুয্যে মশায়ের হোটেলে।
হাজার হোক, হোটেলের মালিক, সুতরাং তাহার মনিবের সমশ্রেণীর লোক। হাজারি যদু বাঁড়ুয্যের নামটা সমীহ করিয়াই মুখে উচ্চারণ করিল।
কুসুম যেন অবাক হইয়া খানিকটা দাঁড়াইয়া রহিল। পরে হঠাৎ ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া বলিল–বসুন, জ্যাঠামশায়, আসছি আমি–
–না, না, শোনো। এখন খাওয়া-দাওয়ার জন্যে যেন কিছু কোরো না
–আপনি বসুন তো। আসছি আমি–
কোনো কথাই খাটিল না। কুসুম কিছুক্ষণ পরে এক বাটি গরম দুধ ও দু-খানি বরফি সন্দেশ রেকাবিতে করিয়া আনিয়া হাজারির সামনে রাখিয়া বলিল–একটু জল সেবা করুন।
–ওই তো তোমাদের দোষ, বারণ করে দিলেও শোনো না—
কুসুম হাসিমুখে বলিল–কথা শুনবো এখন পরে–দুধটা সেবা করুন সবটা–ভালো দুধ–বাড়ীর গরুর। ঘন করে জ্বাল দিয়েছি, দুপুর থেকে আকার ওপর বসানো ছিল।
–তুমি বড় মুশকিলে ফেললে দেখচি মা!…নাঃ
হাজারিকে পান সাজিয়া দিয়া কুসুম বলিল–জ্যাঠামশায় হোটেল ভাল লাগছে?
–তা মন্দ লাগছে না। আজ বেশ ভালই লাগলো। তবে ভাবছি কি জানো মা, এই রেল বাজারে আর একটা হোটেল বেশ চলে।
–শুধু বেশ চলে না। জ্যাঠামশায়, খুব ভাল চলে। আপনার নিজের নামে হোটেল দিলে সব হোটেল কানা পড়ে যাবে।
–তোমার তাই মনে হয় মা?
–হ্যাঁ, আমার তাই মনে হয়। খুলুন আপনি হোটেল।
–আর একজনও একথা বলেছে কালই। তোমার মত সেও আর এক মেয়ে আমার। আমাদের গাঁয়েই–
–কে জ্যাঠামশায়?
–হরিবাবুর মেয়ে, অতসী ওর নাম, টেঁপির বন্ধু। খুব ভাব দুজনে। সে আমায় কাল বলচিল–
আমাদের বাবুর মেয়ে? আমি দেখিনি কখনো। বয়েস কত?
–ওরা নতুন এসেছে গাঁয়ে, কোথা থেকে দেখবে। বয়েস ষোল-সতেরো হবে। বড় ভাল মেয়েটি।
–সবাই যখন বলছে, তাই করুন আপনি। টাকা আমি দেব–
–অতসীও দেবে বলেছে। দু-জনের কাছে টাকা নিলে জাঁকিয়ে হোটেল দেবে। কিন্তু ভয় হয় তোমার ব্যাঙের আধুলি নিয়ে শেষে যদি লোকসান যায়, তবে একুল ওকূল দুকুল গেল। বরং অতসী বড় মানুষের মেয়ে–তার দুশো টাকা গেলে কিছু তার আসে যাবে না–
