–না, আমার টাকাও খাটিয়ে দিতে হবে। সে শুনছি নে।
–আমি দুজনের টাকাই নেবো। কাল থেকে জায়গা দেখছি রও। তবে টাকা গেলে আমায় দোষ দিও না।
–জ্যাঠামশায়, আপনি হোটেল খুললে টাকা ডুববে না–আমি বলচি। এর পরেও যদি ডোবে, তবে আর কি হবে। আপনার দোষ দেবো না।
উঠিবার সময় কুসুম বলিল, জ্যাঠামশায়, পরশু সংক্রান্তির দিন বাড়ীতে সত্যনারায়ণের সিন্নি দেবো ভাবছি, আপনি এখানে রাত্রে সেবা করবেন।
–তা কি করে হবে মা? আমি রাতে বারটার কম ছুটি পাবো না!
–তবে তার পর দিন দুপুরে? বেলা একটার সময় আসবেন। আমি লুচি ভেজে রাখবো, আপনি এসে তরকারি করে নেবেন। কথা রইলো, আসতেই হবে কিন্তু জ্যাঠামশায়।
হোটেলে ফিরিয়া সে বড় ডেকে রান্না চাপাইয়া দিল। বংশী ঠাকুর এবেলা এখনো আসে নাই, হাজারি অত্যন্ত খুশির সহিত চারদিকে চাহিয়া দেখিতে লাগিল–সেই অত্যন্ত পরিচিত পুরাতন রান্নাঘর, এমন কি একখানা পুরানো লোহার খুন্তি পাঁচমাস আগে টিনের চালের বাতার গায়ে সেই গুঁজিয়া রাখিয়া গিয়াছিল এখনও সেখান সেই স্থানেই মরিচা-পড়া অবস্থায় গোঁজাই রহিয়াছে। সেই বংশী, সেই রতন, সেই পদ্মদিদি।
বংশী আসিয়া ঢুকিল। হাজারি বলিল–আজ পেঁপে কুটিয়ে দাও তো বংশী, একবার পেঁপের তরকারী মন দিয়ে রাঁধি অনেক দিন পরে। একদিনে বাঁড়ুজ্যে মশায়ের হোটেল কানা করে দেবো।
গদির ঘরে পদ্মঝিয়ের গলার আওয়াজ পাইয়া বংশী বলিল–ও পদ্মদিদি, শোনো ইদিকে–ও পদ্মদিদি—
পদ্মঝি থার্ডক্লাসের খাওয়ার ঘর পার হইয়া রান্নাঘরের মধ্যে আসিয়া ঢুকিয়া বলিল–কি হয়েছে?
বংশী বলিল–কি কি রান্না হবে এবেলা? হাজারি বলেছে পেঁপের তরকারি রাঁধবে ভাল করে। দু-একটা ভালমন্দ আমাদের দেখাতে হবে আজ থেকে। পেঁপে তো রয়েছে কি বল?
পদ্মঝি বলিল–না পেঁপে কাল হবে। আজ এবেলা বিলিতি কুমড়ো হোক। আর কুচো মাছের ঝাল করো। সাত আনা সের চিংড়ি ওবেলা গিয়েছে–এবেলা দেখি কি মাছ পাওয়া যায়।
হাজারি বলিল–পদ্মদিদি, আজ একটু মাংস হোক না?
পদ্মঝি এতক্ষণ পর্যন্ত হাজারির সঙ্গে সরাসরিভাবে বাক্যালাপ করে নাই। সারাদিনের মধ্যে এই প্রথম তাহার দিকে চাহিয়া বলিল–মাংস বুধবার হয়ে গিয়েছে। আজ আর হবে না–বরং শনিবার দিনে হবে।
হাজারি অত্যন্ত পুলকিত হইয়া উঠিল পদ্ম তাহার সহিত কথা বলাতে এবং পুলকের প্রথম মুহূর্ত কাটিতে না কাটিতে তাহাকে একেবারে বিস্মিত ও চকিত করিয়া দিয়া পদ্মঝি জিজ্ঞাসা করিল–এতদিন কোথায় ছিলে ঠাকুর?
হাজারি সাগ্রহে বলিল–আমার কথা বলছ পদ্মদিদি?
–হ্যাঁ।
–গোপালনগরে কুণ্ডুবাবুদের বাড়ী। আমি ছুটি নিয়ে বাড়ী এসেছিলাম–তারপর রাণাঘাটে আজ এসেছিলাম বেড়াতে। তা বাবু বল্লেন–
–হুঁ, বেশ থাকো না। তবে বাইরে জিনিসপত্তর নিয়ে যেতে পারবে না বলে দিচ্ছি। ওসব একদম বন্ধ করে দিয়েছেন বাবু। যা পারো এখানে খেও–বুঝলে?
–না বাইরে নিয়ে যাবো কেন পদ্মদিদি? তা নিয়ে যাবো না।
–তোমার সেই কুসুম কেমন আছে? দেখা করতে যাওনি? পদ্মঝিয়ের কণ্ঠস্বরে বিদ্রূপ ও শ্লেষের আভাস।
হাজারি লজ্জিত ও অপ্রতিভভাবে উত্তর দিল–কুসুম? হ্যাঁ তা কুসুম—ভালই–
পদ্মঝি অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া বোধ হয় যেন হাসিল। অন্ততঃ হাজাবির তাহাই মনে হইল। পদ্মঝি ঘর হইতে বাহির হইয়া যাইতেই বংশী বলিল–যাক চাকরি তোমার পাকা হয়ে গেল হাজারিদা–দুপুরের পর আমরা চলে গেলে বোধ হয় কৰ্ত্তা-গিন্নীতে পরামর্শ হয়েছে–চলো এক ছিলিম সাজা যাক।
হাজারি হাসিল। সব দিকেই ভালো, কিন্তু পদ্মদিদি কুসুমের কথাটা তুলিল কেন আবার ইহার মধ্যে? ভারি ছোট মন—ছিঃ।
বংশী বাহির হইতে চাপা গলায় ডাকিল–ও হাজারিদা, এসো–-টেনে নাও একটান–
গাঁজায় কষিয়া দম মারিয়া হাজারি আসিয়া আবার রান্নাঘরে বসিতেই হঠাৎ অতসীর মুখখানা তাহার চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিল। দুর্গা-প্রতিমার মত মেয়ে অতসী। কি মনটি চমৎকার। তাহার কাকাবাবু গাঁজা খায়, অতসী যদি দেখিত। ওই জন্যেই তো গ্রামে সে কখনো গাঁজা খায় না। ছেলেপিলের সামনে বড় লজ্জার কথা।
অতসী টাকা দিতে চাহিয়াছে, হোটেল তাহাকে খুলিতে হইবেই। কথাটা একবার বংশীকে বলিবে? বংশী ও রতন ভাল লোক দু-জনেই, তাহাদের বিশ্বাস করা যায়। দুজনেই তাহাকে ভালবাসে।
বংশীকে বলিল–আজকাল রাত্তিরে টক হয়?
–সব দিন হয় না। এখন নেবু সস্তা, নেবু দেওয়া হয়। পয়সায় ছ’সাতটা পাতিনেবু।
-একটা কিছু করে দেখাতে হবে তো? বড়ির টক্ করবো ভেবেছিলাম–
–তুমি ভাবলে কি হবে? পদ্মদিদি পাস করলে তবে তো হাঁড়িতে উঠবে। ভুলে গেলে নাকি আইনকানুন, হাজারি?
হাজারি হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। বলল–বংশী, একটু চা করে খেয়ে নিলে হোত না? আছে তোড়জোড়?
বংশী বলিল–খাবে? আমি দিচ্ছি সব ঠিক করে। ডাল চড়িয়ে গরম জল এই ঘটিতে কেটে রেখো হাতা দিয়ে। চিনি আছে, চা আনিয়ে নিচ্ছি–মনে আছে আর বছর আমাদের চা খাওয়া? আদার রস করেও দেবে এখন–
আধঘণ্টার মধ্যে হাজারি ও বংশী মনের আনন্দে কলাইকরা বাটি করিয়া চা খাইতেছিল। ভূতগত খাটুনির মধ্যেও ইহাতেই আনন্দ কি কম? হাজারি একদৃষ্টে আগুনের দিকে চাহিয়া চিন্তিত মুখে বলিল–যেখানেই যার মন টেকে, বুঝলে বংশী। গোপালনগরে সন্দেবেলা রোজ ওদের মন্দিরে ঠাকুরের শেতল হয়–তার সন্দেশ, ফল কাটা, মুগের ডাল ভিজে খেতে দিত আমাকে। চা আমি করে নিতাম উনুনে। কিন্তু তাতে কি এমন মজা ছিল। একা একা বসে রান্নাঘরে চা আর খাবার খেতাম, মন হু হু করতো। খেয়ে সুখ ছিল না–আজ শুধু চা খাচ্ছি, তাই যেন কত মিষ্টি!
