হাজারি কৃতজ্ঞতার সহিত বেচু চক্কত্তিকে আর একবার ঘাড় খুব নীচু করিয়া হাত জোড় করিয়া প্রণাম করিয়া কলের পুতুলের মত রান্নাঘরের দিকে চলিল।
সামনেই বংশীঠাকুর।
তাহাকে দেখিয়া বংশী অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল।
হাজারি বলিল–বাবু ডেকে বহাল করলেন যে ফের! ভাল আছ বংশী? তোমার সেই ভাগ্নেটি ভাল আছে?
বংশী বলিল–আরে এস এস হাজারি-দা! তোমার কথা প্রায়ই হয়। তুমি বেশ ভাল আছ? এতদিন ছিলে কোথায়?
–ডেকে কি চাপিয়েছ? সরো, হাতাটা দাও। এখনও মাছ হয়নি বুঝি? যাও, তুমি গিয়ে মাছটা চড়িয়ে দাও! তেলের বরাদ্দ সেই রকমই আছে না বেড়েচে?
বংশী বলিল–একবার টেনে নিও একটু। অনেক দিন পরে যখন এলে। দাঁড়াও ডালটায় নুন দেওয়া হয়নি এখনও–দিয়ে দাও।
বলিয়া সে দরমার আড়ালে গাঁজা সাজিতে গেল।
চুপি চুপি বলিল–তোমায় বহাল করেছে কি আর সাধে? এদিকে তুমি চলে যাওয়াতে হোটেলের ভয়ানক দুর্নাম। সেই কলকাতার বাবুরা দু’তিন দল এসেছিল, যেই শুনলে তুমি এখানে নেই–তারা বল্লে সেই ঠাকুরের রান্না খেতেই এখানে আসা। সে যখন নেই, আমরা রেলের হোটেলে খাবো। হাটুরে খদ্দেরও অনেক ভেঙ্গে গিয়েছে–যদু বাঁড়ুয্যের হোটেলে। তোমায় বাবু বহাল করলেন কেন জান? যদু বাঁড়ুয্যের হোটেলে তোমাকে পেলে লুফে নেয় এক্ষুনি। তোমার অনেক খোঁজ করেছে ওরা।
বংশীর হাত হইতে গাঁজার কলিকা লইয়া দম মারিয়া হাজারি কিছুক্ষণ চক্ষু বুজিয়া চুপ করিয়া রহিল। কি হইতে কি হইয়া গেল! চাকুরি লইতে সে তো রাণাঘাট আসে নাই। কিন্তু পুরাতন জায়গায় পুরাতন আবেষ্টনীর মধ্যে আসিয়া সে বুঝিয়াছে এতদিন তাহার মনে সুখ ছিল না। এই বেচু চক্কত্তির হোটেল, এই দরমার বেড়া দেওয়া রান্নাঘর, এই পাথুরে কয়লার স্তূপ, এই হাতাবেড়ি এই তার অতি পরিচিত স্বর্গ। ইহাদের ছাড়িয়া কোথায় সে যাইবে? ভগবান এমন সুখের দিনও মানুষের জীবনে আনিয়া দেন?
বংশীর হাতে কলিকা ফিরাইয়া দিয়া সে খুশির সহিত বলিল–নাও, আর একবার টান দিয়ে নাও। ডালে সম্বরা দিই গে–এবেলা এখনও বাজার আসে নি নাকি?
বংশী বলিল–মাছটা কেবল এসেছে। তরকারিপাতি এল বলে, গোবরা গিয়েছে। গোবরা নতুন চাকর–বেশ লোক, আমার ওপর ভারি ভক্তি। এলে দেখো এখন।
এই সময় তৃতীয় শ্রেণীর টিকিট লইয়া জন দুই খরিদ্দার খাইবার ঘরে ঢুকিতেই হাজারি অভ্যাস মত পুরাতন দিনের ন্যায় হাঁকিয়া বলিল–বসুন বাবু, জায়গা করাই আছে–নিয়ে যাচ্ছি। বসে পড়ুন। মাছ এখনও হয়নি এত সকালে কিন্তু–শুধু ডাল আর ভাজা–বংশী ভাত নিয়ে এস হে–ডালটায় সম্বর দিয়ে নিই– বেলাও এদিকে প্রায় দশটা বাজে। কেষ্টনগরের গাড়ী আসবার সময় হোল। আজকাল ইষ্টিশনের খদ্দের আনে কে?
হাজারি যেন দেহে-মনে নতুন বল ও উৎসাহ পাইয়াছে। হাজার হোক, শহর বাজার জায়গা রাণাঘাট, কত লোকজন, গাড়ী, হৈ হৈ, ব্যস্ততা, রেলগাড়ী, গাড়ী-ঘোড়া –এখানে একবার কাটাইয়া গেলে কি অন্য জায়গা কারো ভালো লাগে? একটা জায়গার মত জায়গা।
এমন সময় একজন কালোমত ছোকরা চাকর তরকারি বোঝাই ঝুড়ি মাথায় রান্নাঘরে নীচু হইয়া ঢুকিল–পিছনে পিছনে পদ্মঝি।
পদ্মঝি বলিতে বলিতে আসিতেছিল–বাবাঃ, বেগুন আর কেনবার জো নেই রাণাঘাটের বাজারে। আট পয়সা করে বেগুনের সের ভূভারতে কে শুনেছে কবে–যত ব্যাটা ফড়ে জুটে বাজার একেবারে আগুন করে রেখেচে–সব চল্লো কলকেতা, সব চল্লো কলকেতা–তা গরীর গুরবো লোক কেনেই বা কি আর খায়ই বা কি–ও বংশী, ঝুড়িটা ধরে নামাও ওর মাথা থেকে–দরজার চৌকাঠে পা দিয়াই সে সম্মুখে থালায় অন্নপরিবেশনরত হাজারিকে দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইয়া একেবারে যেন কাঠ হইয়া গেল।
হাজারি পদ্মঝিকে দেখিয়াই থতমত খাইয়া গেল। তাহার পুরাতন ভয় কোথা হইতে সেই মুহূর্তেই আসিয়া জুটিল। সে কাষ্ঠ হাসি হাসিয়া আমতা আমতা সুরে বলিল–এই যে পদ্মদিদি ভাল আছ বেশ? হে-হে-আমি–
পদ্মঝি বিস্ময়ের ভাবটা সামলাইয়া লইয়া বংশী ঠাকুরের দিকে চাহিয়া বলিল–ঝুড়িটা নামিয়ে নেও না ঠাকুর? ও সঙের মত দাঁড়িয়ে রইল ঝুড়ি মাথায়–মাছ হোল? তারপর হাজারির দিকে তাচ্ছিল্যের ভাবে চাহিয়া বলিল–কখন এলে?
–আজই এলাম পদ্মদিদি।
–আজ এবেলা এখানে থাকবে?
বংশী ঠাকুর বলিল–হাজারিকে যে বাবু বহাল করেছেন আবার। ও এখানে কাজ করবে।
পদ্মঝি কঠিন মুখে বলিল–তা বেশ। রান্নাঘরে আর না দাঁড়াইয়া সে বাহিরে চলিয়া গেল।
বংশী ঠাকুর অনুচ্চস্বরে বলিল–পদ্মদিদি চটেছে–বাবুর সঙ্গে এইবার একচোট বাধবে–
পদ্মকে সারাদুপুর আর রান্নাঘরের দিকে দেখা গেল না। হাজারির মন ছটফট করিতে ছিল, কতক্ষণে কাজ সারিয়া কুসুমের সঙ্গে গিয়া দেখা করবে। সে দেখিল সত্যই হোটেলের খরিদ্দার কমিয়া গিয়াছে–পূর্বে যেখানে বেলা আড়াইটার কমে কাজ মিটিত না, আজ সেখানে বেলা একটার পরে বাহিরের খরিদ্দার আসা বন্ধ হইয়া গেল।
হাজারি বলিল–হ্যাঁ বংশী, থার্ড ক্লাসের টিকিট মোট ত্রিশখানা! আগে যে সত্তর-পঁচাত্তর খান একবেলাতেই হোত? এত খদ্দের গেল কোথায়?
বংশী বলিল–তবুও তো আজকাল একটু বেড়েছে। মধ্যে আরও পড়ে গিয়েছিল, কুড়িখান থার্ড ক্লাসের টিকিট হয়েছে এমন দিনও গিয়েছে। লোক সব যায় যদু বাঁড়ুয্যের হোটেলে। ওদের এবেলা একশো ওবেলা ষাট-সত্তর খদ্দের। হাটের দিন আরও বেশ। আর খদ্দের থাকে কোথা থেকে বলো! মাছের মুড়ো কোনোদিন খদ্দেররা চেয়েও পাবে না। বড় মাছ কাটা হোলেই মুড়ো নিয়ে যাবেন পদ্মদিদি। আমাদের কিছু বলবার জো নেই। তার ওপর আজকাল যা চুরি শুরু করেছে পদ্মদিদি–সে সব কথা এরপর বলবো এখন। খেয়ে নাও আগে।
