হাজারি সত্যই অবাক হইয়া গেল, ভাবিল–এইটুকু মেয়ে, কি উঁচু মন দ্যাখো একবার। বড় বংশ নইলে আর বলেছে কাকে? এ কি আর বেচুবাবুর হোটেলের পদ্মঝি?
হাজারি বলিল–আচ্ছা মা আমাকে টাকা দেবার তোমার ঝোঁক কেন হোল বল তো? তোমরা মেয়েরা যদি ভাল হও তো খুবই ভাল, আর মন্দ হও তো খুবই মন্দ।–আমায় তুমি বিশ্বাস কর মা?
–আপনি বুঝে দেখুন। না হোলে আপনাকে টাকা দিতে চাইব কেন?
–তোমার বাবাকে না জানিয়ে দেবে?
–বাবাকে জানালে দিতে দেবেন না। অথচ আমার টাকা পড়ে রয়েছে, আপনার উপকার হবে, আমি জানি আপনাদের সংসারের কষ্ট। টেঁপির বিয়ে দিতে হবে। কোথায় পাবেন টাকা, কোথায় পাবেন কি! আপনার রান্নার যেমন সুখ্যাতি, আপনার হোটেল খুব ভাল চলবে। ছ-বছরের মধ্যে আমার টাকা আপনি আমায় ফেরত দিয়ে দেবেন।
হাজারি মুগ্ধ হইয়া গেল অতসীর হৃদয়ের পরিচয় পাইয়া। বলিল–আচ্ছা তুমি দিও টাকা, আমি নেবো। হোটেল এই মাসেই আমি খুলবো–তোমার মুখ দিয়ে ভগবান এ কথা বলেছেন মা, তোমরা নিষ্পাপ ছেলেমানুষ, তোমাদের মুখেই ভগবান কথা কন।
অতলী হাসিয়া বলিল–তা হোলে নেবেন ঠিক?
–ঠিক বলচি। এবার ঘুরে জায়গা দেখে আসি। রাণাঘাট যাচ্ছি কাল সকালেই, হয় সেখানে, নয় তো গোয়াড়ির বাজারে জায়গা দেখবো। খবর পাবে তুমি, আবার ঘুরে আসচি তিন-চার দিনের মধ্যেই।
অতসী বলিল–বাবার আহ্নিক করা হয়ে গিয়েছে, বাবা আসবেন, আপনি বসুন, আমি আপনাদের চা নিয়ে আসি। শুনুন কাকাবাবু, আপনি যেদিন বাবার কাছে হোটেলের জন্যে টাকা চান, আমি সেদিন বাইরে দাঁড়িয়ে সব শুনেছিলাম। সেই থেকে আমি ঠিক করে রেখেছি আমার যা টাকা জমানো আছে আপনাকে তা দেবে।
–আচ্ছা বল তো মা একটা সত্যি কথা–আমার ওপর তোমার এত দয়া হোল কেন?
–বলবো কাকাবাবু? আপনার দিকে চেয়ে দেখে আমার মনে হোত আপনি খুব সরল লোক আর ভালো লোক। আমার মনে বড় কষ্ট হয় আপনাকে দেখলে সত্যি বলচি–তবে দয়া বলছেন কেন? আমি আপনার মেয়ের মত না?
বলিয়াই অতসী এক প্রকার কুণ্ঠা ও লজ্জা মিশ্রিত হাসি হাসিল।
হাজারি বলিল–তুমি আর জন্মে আমার মা ছিলে তাই দয়ার কথা বলচি। নইলে কি সন্তানের ওপর এত মমতা হয়? তুমি সুখে থাকো, রাজরাণী হও–এই আশীর্বাদ করচি। আমি তোমার গরীব কাকা, এর বেশী আর কি করতে পারি।
অতসী আগাইয়া আসিয়া হঠাৎ নীচু হইয়া হাজারির পায়ের ধূলা লইয়া প্রণাম করিল এবং আর একটুও না দাঁড়াইয়া তৎক্ষণাৎ বাড়ীর মধ্যে চলিয়া গেল।
০৬. সারারাত্রি হাজারি ঘুমাইতে পারিল না
রাত্রে সারারাত্রি হাজারি ঘুমাইতে পারিল না। অতসীর মত বড়ঘরের সুন্দরী মেয়ের স্নেহ আদায় করার মধ্যে একটা নেশা আছে, হাজারিকে সে নেশায় পাইয়া বসিল। তাহার জীবনের এক অদ্ভুত ঘটনা।
সকালে উঠিয়া সে রাণাঘাটে রওনা হইল। বেশী নয় পাঁচ ছ’ মাইল রাস্তা, হাঁটিয়া বেলা সাড়ে আটটার সময় স্টেশনের নিকটে সেগুন-বনে গিয়া পৌঁছিল।
রেল-বাজারের মধ্যে ঢুকিতেই তাহার ইচ্ছা হইল একবার তাহার পুরাতন কৰ্মস্থানে উঁকি মারিয়া দেখিয়া যায়। আজ প্রায় পাঁচ মাস সে রাণাঘাট ছাড়া। দূর হইতে বেচু চক্রবর্ত্তীর হোটেলের সাইনবোর্ড দেখিয়া তাহার মন উত্তেজনায় ও কৌতূহলে পূর্ণ হইয়া উঠিল। গত ছয় বৎসরের কত স্মৃতি জড়ানো আছে ওই টিনের চালওয়ালা ঘরখানার সঙ্গে।
হোটেলের গদিঘরে ঢুকিয়া প্রথমেই সে বেচু চক্কত্তির সম্মুখে পড়িয়া গেল। বেলা প্রায় সাড়ে দশটা, খরিদ্দার আসিতে আরম্ভ করিয়াছে, বেচু চক্কত্তি পুরোনো দিনের মত গদিঘরে তক্তপোষের উপর হাতবাক্সের সামনে বসিয়া তামাক খাইতেছেন।
হাজারি প্রণাম করিয়া দাঁড়াইতেই তিনি বলিলেন–আরে এই যে হাজারিঠাকুর! কি মনে করে? কোথায় আছ আজকাল? ভাল আছ বেশ?
হাজারি এক মুহূর্তে আবার যেন বেচু চক্রবর্তীর বেতনভুক রাঁধুনী বামুনে পরিণত হইল, তেমনি ভয়, সঙ্কোচ ও মনিবের প্রতি সম্ভ্রমের ভাব তার সারা দেহমনে হঠাৎ কোথা হইতে যেন উড়িয়া আসিয়া ভর করিল।
সে পুরোনো দিনের মত কাঁচুমাচু ভাবে বলিল–আজ্ঞে তা আপনার কৃপায় এক রকম– আজ্ঞে, তা বাবু বেশ ভাল আছেন?
–আজকাল আছ কোথায়?
–আজ্ঞে গোপালনগরে কুণ্ডুবাবুদের বাড়ীতে আছি।
–বাড়ীর কাজ? কদ্দিন আছ?
–এই চার মাস আছি বাবু।
–তা বেশ, তবে সেখানে মাইনে আর কত পাও? হোটেলের মত মাইনে কি করে দেবে গেরস্ত ঘরে?
বেচু চক্কত্তির এই কথার মধ্যে হাজারি এক ধরণের সুরের আঁচ পাইল। ব্যাপার কি? বেচু চক্কত্তি কি আবার তাহাকে হোটেলে রাখিতে চান? তাহার কৌতূহল হইল শেষ পর্যন্ত দেখাই যাক না কি দাঁড়ায়।
সে বিনীত ভাবে বলিল–ঠিক বলেছেন বাবু, তা তো বেশী নয়। গেরস্তবাড়ী কোথা থেকে বেশী মাইনে দেবে?
–তারপর কি এখন আমাদের এখানে এসেছ ঠাকুর?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, বাবু।
–কি মনে করে বলো তো? থাকবে এখানে?
হাজারি কিছুমাত্র না ভাবিয়াই বলিল–সে বাবুর দয়া।
–তা বেশ বেশ, থাকো না কেন, পুরোনো লোক, বেশ তো। যাও কাজে লেগে যাও। তোমার কাপড়-চোপড় এনেছ? কই?
–না বাবু, আগে থেকে কি করে আনি। সে সব গোপালনগরে রয়েছে। চাকুরিতে দয়া করে রাখবেন কি না রাখবেন না জেনে কি করে সে-সব–
–আচ্ছা আচ্ছা, যাও ভেতরে যাও। রতন ঠাকুরের অসুখ করেছে, বংশী একা আছে, তুমি কাজে লাগো এবেলা থেকে। ভাঙা ভাংটো এ মাসের ক’টা দিনের মাইনে তুমি আগাম নিও।
