বেশ ছিল। পদ্ম ঝিয়ের বকুনিও যেন এখন সুমিষ্ট বলিয়া মনে হইতেছে। পদ্ম খারাপ লোক নয়–কাল রাত্রে খাইতে বলিয়াছিল, টাকা দিয়াছে। রতন ঠাকুরও বড় ভাল লোক। তাহার সেই ভাগিনেয়টিও বড় ভাল। সবাই ভাল লোক। রতনের সেই ভাগিনেয় তাহার টেঁপির উপযুক্ত বর। দুজনে সুন্দর মানাইত। ছেলেটিকে বড় পছন্দ হইয়াছিল। আকাশকুসুম। মিথ্যা আশা, টেঁপিকে খাওয়াইয়া বাঁচাইয়া রাখিতে পারিলে তবে তার বিয়ে।
গত ছ’বছরে হাজারির একটা বড় কুঅভ্যাস হইয়া গিয়াছে–সকালে বিকালে চা খাওয়া।
এখন চা খাইতে হইবে পয়সা খরচ করিয়া–সেজন্য হাজারি চা খাওয়ার ইচ্ছাকে দমন করিল।
হঠাৎ তাহার মনে হইল কুসুমের সঙ্গে একবার দেখা করা একান্ত আবশ্যক। আজ সাত আট দিন কুসুমের সঙ্গে তার দেখা হয় নাই। চুরির জন্য হাজতে যাওয়ার সংবাদ বোধ হয় কুসুম শোনে নাই–কে তাহাকে সে খবর দিয়াছে? চা ওখানেই খাওয়া চলিতে পারে। কুসুমের সঙ্গে একটা পরামর্শও করা দরকার। তাহার নিজের মাথায় কিছুই আসিতেছে না।
কুসুম কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুলিয়া হাজারিকে দেখিয়া বিস্মিত কণ্ঠে বলিল–আপনি জ্যাঠামশায়? এমন অসময় যে। এতদিন আসেন নি কেন?
–চলো, ভেতরে বসি। অনেক কথা আছে।
কুসুম ঘরের মেঝেতে শতরঞ্জি পাতিয়া দিল। হাজারি বসিয়া বলিল–মা কুসুম, একটু চা খাওয়াবে।
–এখুনি করে দিচ্চি জ্যাঠামশায়, একটু বসুন আপনি।
চা শুধু নয়–চায়ের সঙ্গে আসিল একখানা রেকাবিতে খানিকটা হালুয়া। হাজারি চা খাইতে খাইতে বলিল–কুসুম মা, আমার চাকরি গিয়েছে।
কুসুম বিস্ময়ের সুরে বলিল -কেন?
চুরি করেছিলাম বলে।
চুরি করেছিলেন!
–ওরা তাই বলে। পাঁচ-ছ’দিন হাজতে ছিলাম।
–হাজতে ছিলেন! হ্যাঁ! মিথ্যে কথা।
কুসুম দাঁড়াইয়া ছিল–হাজারির সামনে মাটির উপর ধপাস করিয়া বসিয়া পড়িয়া কৌতূহল ও অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে হাজারির মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।
না কুসুম, মিথ্যে নয়, সত্যিই হাজতে ছিলাম চুরির আসামী হিসেবে।
–হাজতে থাকতে পারেন জ্যাঠামশায়–কিন্তু চুরি আপনি করেন নি–করতে পারেন না। সেইটেই মিথ্যে কথা, তাই বলচি।
–আমি চুরি করতে পারি নে?
–কক্ষনো না জ্যাঠামশায়। আপনাকে আমি জানি নে? চিনি নে?
–তোমার মা, এত বিশ্বাস আছে আমার ওপর!
কুসুম অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া চুপ করিয়া রহিল। মনে হইল সে কান্না চাপিবার চেষ্টা করিতেছে।
হাজারি বঁচিল। কুসুম সত্যই তার মেয়ে বটে। তাহার বড় ভয় ছিল কুসুম জিনিসটা কি ভাবে লইবে। যদি বিশ্বাস করিয়া বসে যে সত্যিই সে চোর! জগতে তাহা হইলে হাজারির একটা অবলম্বন চলিয়া গেল।
–আপনি এখন কোথা থেকে আসছেন জ্যাঠামশায়?
কাল রাত্রে স্টেশনে শুয়ে ছিলাম–যাবো আর কোথায়? সেখান থেকে উঠে আসচি। ভাবলাম তোমার সঙ্গে একবার দেখা করাটা দরকার মা, হয়তো আবার কতদিন–
–কেন, আপনি যাবেন কোথায়?
–একটা কিছু হিল্লে লাগাতে তো হবে–বসে থাকলে চলবে না বুঝতেই পারো। দেখি কি করা যায়।
–এখানে আর কোনো হোটেলে–
–চুরির অপবাদ রটেছে যখন, তখন এখানকার কোনো হোটেলে নেবে না। দেখি, একবার ভাবচি গোয়াড়ি যাই না হয়– সেখানে অনেক হোটেল আছে, খুঁজে দেখি সেখানে।
কুসুম খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল–আচ্ছা, সে যা হয় হবে এখন। আপাতোক আপনি নেয়ে আসুন, তেল এনে দিই। তারপর রান্নার যোগাড় করে দিচ্ছি, এখানে দু’টি ভাতেভাত চড়িয়ে খান।
–না মা, ওসব হাঙ্গামে আর দরকার নেই–থাক, খাওয়ার জন্যে কি হয়েছে–আমি তোমার সঙ্গে দুটো কথা কই বসে। ভাবলাম কুসুমের সঙ্গে একবার পরামর্শ করি গিয়ে, তাই এলাম। একটা বুদ্ধি দাও তো মা খুঁজে–একার বুদ্ধিতে কুলোয় না–তারপর বুড়োও হয়ে পড়েছি তো!
কুসুম হাসিয়া বলিল–পরামর্শ হবে এখন। না যদি খান, তবে আমিও আজ সারাদিন দাঁতে কুটো কাটবো না বলে দিচ্ছি কিন্তু জ্যাঠামশায়। ওসব শুনবো না–আগে নেয়ে আসুন–তারপর ভাত চাপান, আমিও আপনার প্রসাদ দু’টি পাই। মেয়ের বাড়ী এসেছেন, যতই গরীব হই, আপনাকে না খাইয়ে ছেড়ে দেবো ভেবেচেন বুঝি–ভারি টান তো মেয়ের ওপর?
অগত্যা হাজারি চূর্ণীয় ঘাটে স্নান করিতে গেল। ফিরিয়া দেখিল গোয়ালঘরের এক কোণ ইতিমধ্যে কুসুম কখন লেপিয়া পুঁচিয়া পরিষ্কার করিয়া ইট দিয়া উনুন পাতিয়া ফেলিয়াছে।
একটা পেতলের মাজা বোগনো দেখাইয়া বলিল, এতেই হবে জ্যাঠামশায়, না নতুন হাঁড়ি কাড়বেন?
–না নতুন হাঁড়ির দরকার নেই। ওতেই বেশ হবে এখন।
ভাত নামিবার কিছু পূর্বে একটি ছেলে গোয়ালঘরের দোরে আসিয়া উঁকি মারিয়া ইঙ্গিতে কুসুমকে বাহিরে ডাকিল। হাজারি দেখিল, তাহার হাতে একখানা গামছায় বাঁধা হাটবাজার–অন্য হাতে একটা বড় ইলিশ মাছ ঝোলানো।
–-একটুখানি দাঁড়ান জ্যাঠামশায়, মাছ কুটে আনি।
হাজারি অত্যন্ত লজ্জিত ও বিপন্ন হইয়া উঠিল কুসুমের কাণ্ড দেখিয়া। পাশের বাড়ীর ছেলেটিকে ডাকিয়া কুসুম কখন বাজার করিতে দিয়াছে–থাক দিয়াছে দিয়াছে–কুসুম গরীব মানুষ, এত বড় মাছ কিনিতে দেওয়ার কারণ কি ছিল? নাঃ, বড় ছেলেমানুষ এখনও। এদের জ্ঞানকাণ্ড আর হবে কবে?
কুসুম হাজারির তিরস্কারের কোনো জবাব দিল না। মৃদু মৃদু হাসিয়া বলিল–আপনার রান্না ইলিশ মাছ একদিন খেতে যদি সাধ হয়ে থাকে তবে মেয়েকে অমন করে বকতে নেই জ্যাঠামশায়।
