হাজারি আধুলিটা কুড়াইয়া লইয়া চাদরের খুঁটে বাঁধিল। তারপর হাত জোড় করিয়া মাজা হইতে শরীরটা খানিকটা নোয়াইয়া বেচু-চক্কত্তিকে প্রণাম করিয়া আবার সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া কাঁচুমাচু হইয়া বলিল, তাহোলে বাবু, মাইনের জন্যে কবে আসবো?
–এসো–এসো এর পরে যখন হয়। সে এখন দেখা যাবে–
ইহা যে অত্যন্ত ছেঁদো কথা হাজারির তাহা বুঝিতে বিলম্ব হইল না। বরং পদ্ম ঝি যাহা বলিয়াছে তাহাই ঠিক। মাহিনা ইহারা তাহাকে দিবে না। তাহার মাথায় আসিল একবার শেষ চেষ্টা করিবে। মরীয়ার শেষ চেষ্টা। বেচু চক্কত্তির নিকট হইতে বিদায় লইয়া সে পিছন দিয়া হোটেলের রান্নাঘরে আসিল। সেখানে পদ্ম ঝি একটু পরে আসিতেই সে হাত জোড় করিয়া বলিল–পদ্মদিদি, গরীব বামুন–চাকুরি করচি এতকাল, একখানা রেকাবী কোন দিন চুরি করিনি। আমি বড় গরীব। তুমি একটু বলে কর্তামশাইকে আমার মাইনের ব্যবস্থা করে দেও–নইলে বাড়ীতে ছেলেপুলে না খেয়ে মরবে। এই আধুলিটা সম্বল, দোহাই বলচি রাধাবল্লভের–এতে আমি কি খাবো, আর রেলভাড়া কি দেব, বাড়ীর জন্যেই বা কি নিয়ে যাবো।
–আমি হোটেলের মালিক নই যে তোমায় টাকা দেবো। কর্তামশায় যা বলেছেন তার ওপর আমার কি কথা আছে?
দয়া করে পদ্মদিদি তুমি একবার বলো ওঁকে। না খেয়ে মারা যাবে ছেলেপিলে।
–কেন তোমার পেয়ারের কুসুমের কাছে যাও না, পদ্মদিদিকে কি দরকার এর বেলা?
হাজারির ইচ্ছা হইল আর একদণ্ডও সে এখানে দাঁড়াইবে না। সে চায় না যে এই সব জায়গায় যার-তার মুখে কুসুমের নাম উচ্চারিত হয়, বিশেষত পদ্ম ঝিয়ের মুখে। সে চুপ করিয়া রহিল। পদ্ম রান্নাঘর হইতে চলিয়া গেল।
একটুখানি দাঁড়াইয়া সে চলিয়াই যাইতেছিল, পদ্ম ঝি আসিয়া বলিল–যাচ্ছ যে? খাওয়া হয়েছে তোমার?
হাজারি অবাক হইয়া পদ্ম ঝিয়ের মুখের দিকে চাহিল। কখনো সে এমন কথা তাহার মুখে শোনে নাই। আমতা আমতা করিয়া বলিল–না–খাওয়া—ইয়ে–না হয় নি ধরো।
–তা হোলে বোসো। এখনও মাছটা নামে নি। মাছ নামলে ভাত খেয়ে তবে যাও। দাঁড়িয়ে কেন? বসো না পিঁড়ি একখানা পেতে।
হাজারি কলের পুতুলের মত বসিল। পদ্মদিদি তাহাকে অবাক করিয়া দিয়াছে! পদ্মদিদির দরদ!…সাত বছরের মধ্যে একদিনও যা দেখে নাই!…আশ্চর্য্য কাণ্ডই বটে!
মাছ নামিলে নতুন ঠাকুর হাজারিকে ভাত বাড়িয়া দিল। পদ্ম ঝিকে আর এদিকে দেখা গেল না–সে এখন খরিদ্দারদের খাওয়ার ঘরে ব্যস্ত আছে। নতুন ঠাকুর যদিও হাজারিকে চেনে না তবুও ইহাদের কথাবার্তা শুনিয়া সে বুঝিয়াছিল, হাজারি হোটেলের পুরোনো ঠাকুর–চাকুরিতে জবাব হইয়া চলিয়া যাইতেছে। সে হাজারিকে খুব যত্ন করিয়া খাওয়াইল।
যাইবার সময় হাজারি পদ্মকে ডাকিয়া বলিল–পদ্মদিদি, চললাম তবে। কিছু মনে কোরো না।
পদ্ম ঝি দোরের কাছে আসিয়া বলিল–হ্যাঁ দাঁড়াও ঠাকুর। এই দুটো টাকা রাখো, কৰ্ত্তামশায় দিয়েছেন মাইনের দরুন। এই শেষ কিন্তু–আর কিছু পাবে না বলে দিলেন তিনি।
হাজারি টাকা দুইটি লইয়া আগের আধুলিটির সঙ্গে চাদরের খুঁটে রাখিল কিন্তু সে খুব অবাক হইয়া গিয়াছে–সত্যই অবাক হইয়া গিয়াছে।
–আচ্ছা, তবে আসি।
–এসো। খাওয়া হয়েছে তো? আচ্ছা।
রাত সাড়ে ন’টার কম নয়।
এত রাত্রে সে কোথায় যায়!
চাকুরি গেল। তবুও হাতে আড়াইটা টাকা আছে।
বাড়ী যাইয়া কি হইবে? চাকুরি খুঁজিতে হইবেই তাহাকে। বাড়ী গিয়া বসিয়া থাকিলে চলিবে না। চাকুরি চলিয়া যাইবে–একথা হাজারি ভাবে নাই। সত্য সত্যই চাকুরি গেল শেষকালে!
সে জানে রাণাঘাটে কোনো হোটেলে তাহার চাকুরি আর হইবে না। যদু বাঁড়ুয্যে একবার তাহাকে হোটেলে লইতে চাহিয়াছিলেন বটে, কিন্তু এখন চুরির অপবাদে হাজত বাস করিয়া আসিয়াছে, কেহই তাহাকে চাকুরি দিবে না।
হাজারি দেখিল সে নিজের অজ্ঞাতসারে চূর্ণী নদীর ধারে চলিয়াছে–তাহার সেই প্রিয় গাছতলাটিতে গিয়া বসিবে–বসিয়া ভাবিবে। ভাবিবার অনেক কিছু আছে।
কিন্তু প্রায় দুই ঘণ্টা নদীর ধারে বসিয়া থাকিয়াও ভাবনার কোনো মীমাংসা হইল না। আজ রাত্রে অবশ্য স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শুইয়া থাকিবে–কিন্তু কাল যায় কোথায়?
আড়াই টাকার মধ্যে দুটি টাকা বাড়ী পাঠাইতে হইবে। টেঁপি–টেঁপির মুখে হয়তো তাহার মা দুটি ভাত দিতে পারিতেছে না।
এ চিন্তা তাহার পক্ষে অসহ্য।
না–কালই টাকা দুটি পাঠাইবে তাকে। মনি অর্ডার ফি দিবে আধুলিটা হইতে। পুরো দু’টাকা বাড়ী যাওয়া চাই।
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শেষ রাত্রের দিকে সামান্য ঘুম হইল। ফরিদপুর লোকালের শব্দে খুব ভোরে ঘুম গেল ভাঙিয়া। তবুও সে শুইয়াই রহিল। আজ আর তাড়াতাড়ি বড় উনুনে ডেকচি চাপাইতে হইবে না–উঠিয়া কি হইবে?
অনেকক্ষণ পর্যন্ত সে শুইয়াই রহিল। ডাউন দার্জিলিং মেল আসিল, চলিয়া গেল। বনগাঁ লাইনের ট্রেন ছাড়িল। রোদ উঠিয়াছে, প্ল্যাটফর্ম ঝাঁট দিতে আসিয়াছে ঝাড়ুদার। একখানা গাড়ীর ডাউন দিয়াছে আড়ংঘাটার দিকে। মুর্শিদাবাদ-লালগোলা প্যাজেঞ্জার।
–এই কোন্ নিদ যাতা রে, এই উঠো–হঠ যাও–ঝাড়ুদার হাঁকিল। হাজারি উঠিয়া হাই তুলিয়া কলে গিয়া হাতমুখ ধুইল।
সে কোথায় যায়– কি করে? গত ছ’সাত বছরের মধ্যে এমন নিষ্ক্রিয় জীবন সে কখনো যাপন করে নাই–কাজ, কাজ, উনুনে ডেকচি চাপাও, কৰ্ত্তামশায়ের চায়ের জল গরম কর আগে, বাজারে আজ কার পালা? হৈ চৈ–ঝাড়া বকুনি–পদ্ম ঝিয়ের চেঁচামেচি…
