হাজারি অপ্ৰসন্নমুখে বলিল–নাঃ, যতো সব ছেলেমানুষের ব্যাপার।
আহারাদির পর হাজারির বিশ্রামের ব্যবস্থা করিয়া দিয়া কুসুম খাইতে গেল। গত রাত্রে ভাল ঘুম হয় নাই–ইতিমধ্যে হাজারি কখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছে, যখন ঘুম ভাঙিল তখন প্রায় বিকাল হইয়া গিয়াছে।
কুসুম ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া বলিল–কাল ঘুম হয় নি মোটেই ইষ্টিশানের বেঞ্চিতে শুয়ে– তা বুঝতে পেরেচি। ঘুমিয়েচেন ভাল তো? চা ক’রে আনি, উঠে মুখ ধুয়ে নিন।
চায়ের সঙ্গে কোথা হইতে কুসুম গরম জিলিপি আনাইয়া দিল। বলিলেও শোনে না, বলিল–এই তো ওই মোড়ে হারান ময়রার দোকানে এ সময় বেশ গরম জিলিপি ভাজে, চায়ের সঙ্গে বেশ লাগবে–শুধু চা খাবেন?
ইহার উপর আর কত অত্যাচার করা চলিতে পারে। আজই এখান হইতে সরিয়া না পড়িলে উপায় নাই। হাজারি ঠিক করিল চা খাইয়া আর একটু বেলা গেলেই এখান হইতে রওনা হইবে।
কুসুম পান সাজিয়া আনিয়া হাজারির সামনে মেঝেতে বসিল।–তারপর এখন কি করবেন ভেবেছেন?
–ওই তো বল্লাম গোয়াড়ি গিয়ে চাকরির চেষ্টা করি।
–যদি সেখানে না পান?
–তবে কলকাতা যাবো। তবে পাড়াগাঁয়ের মানুষ, কলকাতায় যাতায়াত অভ্যাস নেই -অত বড় শহরে থাকাও অভ্যাস নেই–ভয় করে।
–আমার একটা কথা শুনবেন জ্যাঠামশায়?
–কি?
–শোনেন তো বলি।
–বল না মা কি বলবে?
–আমার সেই গহনা বাঁধা দিয়ে কি বিক্রি করে আপনাকে দু’শো টাকা এনে দিই। আপনি তাই নিয়ে হোটেল খুলুন। আপনার রান্নার সুখ্যাতি দেশ জুড়ে। হোটেল খুললে দেখবেন কেমন পর জমে–এই রাণাঘাটেই খুলুন, ওই চক্কত্তির হোটেলের পাশেই খুলুন। পদ্ম চোখ টাটিয়ে মরুক। মেয়ের পরামর্শ শুনুন জ্যাঠামশায়–আপনার উন্নতি হবে–কোথায় যাবেন এ বয়সে পরের চাকরি করতে।
হাজারির চোখে প্রায় জল আসিল। কি চমৎকার, এই অদ্ভুত মেয়ে কুসুম! মেয়েই বটে তাহার। কিন্তু তাহা হইবার নয়–নানা কারণে। কুসুমের টাকায় রাণাঘাটে হোটেল খুলিলে পাঁচজন পাঁচরকম বদনাম রটাবে উভয়ের নামে। তাহার উপকার করিয়া নিরপরাধিনী কুসুম কলঙ্ক কুড়াইতে গেল কেন? ওই পদ্ম ঝি-ই সাতরকম রটাইয়া বেড়াইবে গাত্রদাহের জ্বালায়।
তা ছাড়া যদি লোকসানই হয়, ধরো–(যদিও হাজারির দৃঢ় বিশ্বাস সে হোটেল খুলিলে লোকসান হইবে না) তাহা হইলে কুসুমের টাকাগুলি মারা পড়বে। না, তার দরকার নাই।
–-মা কুসুম, একবার তো তোমাকে বলেছিলাম তোমার ও টাকা নেওয়া হবে না। আবার কেন সে কথা? আমাকে এই গাড়ীতে গোয়াড়ি যেতে হবে, উঠি।
কুসুম গড় হইয়া প্রণাম করিয়া বলিল–আচ্ছা, কথা দিয়ে যান যদি গোয়াড়িতে চাকুরি না জোটাতে পারেন তবে আবার আমার কাছে ফিরে আসবেন?
–তোমার কাছে মা? কেন বলো তো?
–এসে ওই টাকা নিতে হবে। হোটেল খুলতে হবে। ও টাকা আপনার হোটেলের জন্যে তোলা আছে। শুধু আপনার ভালোর জন্যেই বলচি তা ভাববেন না জ্যাঠামশায়। আমার স্বার্থ আছে। আমার টাকাগুলো আপনার হাতে খাটলে তা থেকে দু’পয়সা আমিও পাবো তো। গরীব মেয়ের একটা উপকার করলেনই বাঁ?
হাজারি হাসিয়া বলিল–আচ্ছা কথা দিয়ে গেলাম। তবে আসি মা আজ। এসো, এসো, কল্যাণ হোক।
–মনে রাখবেন মেয়ের কথা।
–তুমিও মনে রেখো তোমার বুড়ো জ্যাঠামশায়ের কথা—
–ইস! আমার জ্যাঠামশায় বুড়ো বৈকি?
–না, ছ’চল্লিশ বছর বয়েস হয়েচে–বুড়ো নয় তো কি?
–দেখায় না তো বুড়োর মত। বয়েস হলেই হোলো? আসবেন আবার কিন্তু তা হোলে।
–আচ্ছা মা। হাজারি পুঁটুলি লইয়া বাটির বাহির হইল। কুসুম তাহার সঙ্গে সঙ্গে বড় রাস্তা পর্যন্ত আসিয়া আগাইয়া দিয়া গেল।
০৫. রাণাঘাট হইতে বাহির হইয়া হাজারি
রাণাঘাট হইতে বাহির হইয়া হাজারি হাঁটাপথে চাকদার দিকে রওনা হইল। প্রথমে ডাকঘর হইতে বাড়ীতে দু’টি টাকা মনিঅর্ডার পাঠাইবার ইচ্ছা ছিল কিন্তু ডাকঘরে গিয়া দেখিল মনিঅর্ডার নেওয়া বন্ধ হইয়া গিয়াছে।
ডাকঘর খোলা না থাকার জন্য পরে হাজারি ভগবানকে ধন্যবাদ দিয়াছিল। চাকদা যাইবার মাঝপথে সেগুন-বাগানের মধ্যে সন্ধ্যার অন্ধকার নামিল। একটা সেগুন গাছের তলায় দু’খানি গরুর গাড়ী দাঁড়াইয়া আছে। লোকজন নামিয়া গাছতলায় রান্না চড়াইয়াছে। হাজারি জিজ্ঞাসা করিয়া জানিল, সম্মুখের পূর্ণিমায় কালীগঞ্জে গঙ্গাস্নানের মেলা উপলক্ষ্যে উহারা মেলায় দোকান করিতে যাইতেছে। হাজারি তাহাদের সঙ্গ লইল।
রাত্রে আহারাদির পরে সবাই গাছতলায় শুইয়া রাত্রি কাটাইল–দোকানের মালিকের নাম প্রিয়নাথ ধর, জাতিতে সুবর্ণ বণিক, মনোহারি দোকান লইয়া ইহারা মেলায় যাইতেছে। হাজারির পরিচয় পাইয়া ধর মহাশয় প্রস্তাব করিল মেলায় কয়দিন তাহারা কেনাবেচা লইয়া ব্যস্ত থাকিবে এই কয়দিন হাজারি যদি রান্না করিয়া সকলকে খাওয়ায়–তবে সে দৈনিক খোরাকি ও মেলা অন্তে কয়দিনের মজুরি স্বরূপ দুই টাকা পাইবে।
প্রিয়নাথ ধরের দোকান তিনখানি–একখানি তার নিজের, অপর দুইখানি তাহার জামাই ও ভ্রাতৃপুত্রের। কম মাহিনায় যে ওস্তাদ রাঁধুনী পাইয়াছে, হাজারির প্রথম দিনের রন্ধনেই তাহা সপ্রমাণ হইয়া গেল। সকলেই খুব খুশি।
মেলায় পৌঁছিয়া কিন্তু হাজারি দেখিল, রান্নার চেয়েও অধিকতর লাভের একটি ব্যবসা এই মেলাতেই তাহার অন্য অপেক্ষা করিয়া আছে। সে জিনিসপত্র কিনিয়া আনিয়া তেলেভাজা কচুরি সিঙ্গাড়ার দোকান খুলিয়া বসিল ধর মহাশয়দের বাসার একপাশে। বিনামূল্যে কচুরি খাইবার লোভে ধর মহাশয় কোন আপত্তি করিলেন না।
