এরকম ধারণা সে বিদ্বেষবশত করিতেছে না, গত ছ বৎসর হাজারি পদ্ম ঝিয়ের এমন অনেক কাণ্ড দেখিয়াছে যাহা সে প্রথম প্রথম তত বুঝিত না–কিন্তু এখন দুয়ে দুয়ে যোগ দিয়া সে অনেকটাই বুঝিয়াছে।
বৃদ্ধ বেচু চক্কত্তি পদ্ম ঝিয়ের একেবারে হাতের মুঠার মধ্যে–দেখিয়াও দেখেন না, বুঝিয়াও বোঝেন না, হোটেলটির যে কি সর্বনাশ করিতেছে পদ্ম দিদি, তাহা তিনি এখন না বুঝিলেও পরে বুঝিবেন।
রতন ঠাকুর ও সেদিন ভাত দিতে আসিয়া অনেক কথা বলিয়া গিয়াছে।
–হাজারিদা, হোটেলের অর্ধেক জিনিস পদ্মদিদির ঘরে–আজকাল বাজারের জিনিস পর্যন্ত যেতে আরম্ভ করেছে। সেদিন দেখলে তো কুমড়োর কাণ্ড? চুষে খাবে এমন সাজানো হোটেলটা বলে দিচ্চি। পদ্ম দিদির কেন অত টান বাড়ীর ওপরে–তাও আমি জানি। তবে বলিনে, যাহোক আট টাকা মাইনের চাকরিটা করি–এ বাজারে হঠাৎ চাকরিটা অনত্থক খোয়াবো?
সন্ধ্যার পরে হাজারি হোটেলের গদিঘর দিয়া ঢুকিতে সাহস না করিয়া রান্নাঘরের দিকের দরজা দিয়া হোটেলে ঢুকিল। ভাবিয়াছিল রান্নাঘরে রতন ঠাকুরকে দেখিতে পাইবে–কিন্তু একজন অপরিচিত উড়িয়া ঠাকুরকে ভাত রাঁধিতে দেখিয়া সে যে-পথে আসিয়াছিল, সেই পথেই বাহির হইয়া যাইবার জন্য পিছন ফিরিয়াছে–এমন সময় খরিদ্দারদের খাবার ঘর হইতে পদ্ম ঝি বলিয়া উঠিল–কে ওখানে? কে যায়?
হাজারি ফিরিয়া বলিল–আমি পদ্মদিদি
পদ্ম তাড়াতাড়ি ঘরের বাহির হইয়া আসিয়া বলিল–আমি?-কে আমি?-ও। হাজারি ঠাকুর।…তুমি কি মনে করে? চলে যাচ্চ কোথায় অত তাড়াতাড়ি? ঢুকলেই বা কেন আর বেরুচ্ছই বা কেন?
–আজ হাজত থেকে খালাস পেয়েছি পদ্মদিদি। কোথায় আর যাবো, যাবার তো জায়গা নেই কোথাও–হোটেলেই এলাম, খিদে পেয়েচে–দুটো ভাত খাবো বলে। রান্নাঘরে এসে দেখি রতন ঠাকুর নেই, তাই সামনে দিয়ে গদিঘরে যাই–
–তা যাও গদিঘরে! এই খদ্দেরের খাবার ঘর দিয়েই যাও—
হাজারি সঙ্কুচিত অবস্থায় হোটেলের খাবার ঘরের দরজা দিয়া ঢুকিয়া গদির ঘরে গেল। পদ্ম ঝি গেল পিছু পিছু।
বেচু চক্কত্তি বলিলেন– এই যে, হাজারি যে! কি মনে করে?
হাজারি বলিল–আজ্ঞে কৰ্ত্তামশায়, পুলিসে ছেড়ে দিলে আজ–তাই এলাম। যাবো আর কোথায়? আপনার দরজায় দুটো ক’রে খাই। তা ছেড়ে আর কোথায় যাবো বলুন?
বেচু চক্কত্তি কোনো উত্তর দিবার আগেই পদ্ম ঝি আগাইয়া আসিয়া বেচু চক্কত্তিকে বলিল–ওকে আর একদণ্ড এখানে থাকতে দিও না কর্তাবাবু–এখুনি বিদেয় করো। বাসন ও আর মতি যোগসাজসে নিয়েছে। পাকা চোর, পুলিসে কি করবে ওদের?
হাজারি এবার রাগিল। পদ্ম ঝিকে কখনও সে এ সুরে কথা বলে নাই। বলিল–তুমি দেখেছিলে বাসন নিতে পদ্ম দিদি?
পদ্ম ঝি বলিল–তোমার ও চোখ-রাঙানির ধার ধারে না পদ্ম, তা বলে দিচ্ছি হাজারি ঠাকুর। অমন ভাবে আমার সঙ্গে কথা বলো না–বাসন তোমাকে নিতে দেখলে হাতের দড়ি তোমার খুলতো না তা জেনে রেখো।
হাজারি নিজেকে সামলাইয়া লইয়াছে ততক্ষণ। নীচু হওয়াই তাহার অভ্যাস-যাহারা বড়, তাহাদের কাছে আজীবন সে ছোট হইয়াই আসিতেছে–আজ চড়া গলায় তাহাদের সঙ্গে কথা কহিবার সাহস তাহার আসিবে কোথা হইতে?
সেরকম সুরে বলিল–না না, রাগ করছো কেন পদ্ম দিদি–আমি এমনিই বলচি, বাসন নিতে যখন তুমি দ্যাখোনি–তখন আমি গরীব বামুন, তোমাদের দোরে দুটো করে খাই– কেন আর আমাকে–
এইবার বেচু চক্কত্তি কথা বলিলেন।
একটু নরম সুরে বলিলেন–যাক, যাক, কথা কাটাকাটি করে লাভ নেই। আমার বাসন তাতে ফিরবে না। দুজনেই থামো। তারপর তুমি বলছ কি এখন হাজারি?
–বলচি, কৰ্ত্তা, আমায় যেমন পায়ে রেখেছিলেন, তেমনি পায়ে রাখুন। নইলে না খেয়ে মারা যাবো। বাবু, চোর আমি নই, চোর যদি হতাম, আপনার সামনে এসে দাঁড়াতে পারতাম না আর।
পদ্ম ঝি বলিল–চোর কিনা সে কথায় দরকার নেই–কিন্তু তোমার এখানে জায়গা আর হবে না। তা হোলে খদ্দের চলে যাবে।
বেচু বলিলেন–তা ঠিক।–খদ্দের চলে গেলে হোটেল চালাবো কি করে আমি? হাজারি এ যুক্তির অর্থ বুঝিতে পারিল না। হোটেলের ঠাকুর চোর হইলে সে না হয় হোটেলের জিনিস চুরি করিতে পারে, কিন্তু খরিদ্দারদের গায়ের শাল খুলিয়া বা তাহাদের পকেট মারিয়া লইতেছে না তো–তবে খরিদ্দারের আসিতে আপত্তি কি?
কিন্তু হাজারি এ প্রশ্ন উঠাইতে পারিল না। তাহার জবাব হইয়া গেল। সে কিছু খাইয়াছে কি না এ কথাও কেহ জিজ্ঞাসা করিল না।
অবশেষে সে বলিল–তা হোলে আমার মাইনেটা দিয়ে দিন বাবু, দু’মাসের তো বাকী পড়ে রয়েচে, হাওলাত নেই কিছু। খাতা দেখুন।
বেচু চক্কত্তি বলিলেন–সে এখন হবে না, এর পরে এসো।
পদ্ম একটু বেশী স্পষ্ট কথা বলে। সে বলিল–ওর আশা ছেড়ে দাও, মাইনে পাবে না।
–কেন পাব না?
পদ্ম ঝাঁঝের সঙ্গে বলিল–সে তককো তোমার সঙ্গে করবার সময় নেই এখন। পাবে না মিটে গেল। নালিশ করো গিয়ে–আদালত তো খোলা রয়েছে।
হাজারি চক্ষে অন্ধকার দেখিল।
বেচু চক্কত্তির দিকে চাহিয়া বিনীত স্বরে বলিল–কর্তামশায়, আজ আপনার দোরে ছ’বছর খাটসি। আমার হাতে একটিও পয়সা নেই–বাড়ীতে দুমাস খরচ পাঠাতে পারিনি, বাড়ী যাবার রেলভাড়া পর্যন্ত আমার হাতে নেই–আমায় কিছু না দিলে না খেয়ে মরতে হবে।
বেচু চক্কত্তি দ্বিরুক্তি না করিয়া ক্যাশবাক্স খুলিয়া একটি আধুলি ফেলিয়া দিয়া বলিলেন –এই নিয়ে যাও। এখানে ঘ্যান ঘ্যান কোরো না–খদ্দের আসতে আরম্ভ করচে, বাইরে যাও গিয়ে
