পূর্ণিমা তিথিটা…অপর্ণা ছাদের আলিসার ধারে দাঁড়াইয়া, এই তো গত কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রিতে লক্ষ্মীর মতো মহিমময়ী, কি সুন্দর ডাগর চোখ দুটি, কি সুন্দর মুখশ্রী। অপুর মনে হইয়াছিল, ওর ঘাড় ফেরাইবার ভঙ্গিটা যেন রানীর মতো—এক এক সময় সম্রম আসে মনে। অপর্ণা হাসিয়া বলে আমার যে লজ্জা করে, নইলে সকালে তোমার খাবার করে দিতে ইচ্ছে করে, আমার হোট বোন লুচি ভাজতে জানে না,সেজ খুড়িমা ছেলে সামলে সময় পান না-মা থাকেন ভাড়ারে, তোমার খাবার কষ্ট হয়না? হঠাৎ অপুর মনে হয়—দূর ছাইকি লিখে যাচ্ছি মিছে-কি হবে আর এসবে?
কি বিরাট শূন্যতা কি যেন এক বিরাট ক্ষতি হইয়া গিয়াছে, জীবনে আর কখনও তাহা পূর্ণ হইবার নহে–কখনও না, কাহারও দ্বারা না–সম্মুখে বৃক্ষ নাই, লতা নাই, ফুলফল নাই—শুধু এক রুক্ষ, ধূসর বালুকাময় বহুবিস্তীর্ণ মরুভূমি!
মাসখানেক পরে পিন্টুর মা বলিল—কখনও ভাই দেখি নি, ঠাকুরপো। আপনাকে সেই ভাইয়ের মতো পেলুম, কিন্তু করতে পারলাম না কিছু দিদি বলে যদি মাঝে মাঝে আমাদের ওখানে যান—তবে জানব সত্যিই আমি ভাই পেয়েছি।
অপু সংসারের বহু দ্রব্য পিন্টুদের জিনিসপত্রের সঙ্গে বাধিয়া দিল—ডালা, কুলো, ধামা, বঁটি, চাকি, বেলুন। পিন্টুর মা কিছুতেই সে সব লইতে রাজি নয়—অপু বলিল, কি হবে বউদি, সংসার তো উঠে গেল, ওসব আর হবে কি, অন্য কাউকে বিলিয়ে দেওয়ার চেয়ে আপনারা নিয়ে যান, আমার মনে তৃপ্তি হবে তবুও।
মৃত্যুর পর কি হয় কেহই বলিতে পাবে না? দু-একজনকে জিজ্ঞাসাও করিল—ওসব কথা ভাবিয়া তো তাহাদের ঘুম নাই। মেসে বরদাবাবুর উপর তাহার শ্রদ্ধা ছিল, তাহার কাছেও একদিন কথাটা পাড়িল। বরদাবাবু তাহাকে মামুলি সান্ত্বনাব কথা বলিয়া কর্তব্য সমাপন করিলেন। একদিন পল ও ভার্জিনিয়ার গল্প পড়িতে পড়িতে দেখিল মৃত্যুর পর ভার্জিনিয়া প্রণয়ী পলকে দেখা দিয়াছিল-হতাশ মন একটুকু সূত্রকেই ব্যগ্র আগ্রহে আঁকড়াইয়া ধবিতে ব্যস্ত হইয়া উঠিল। তবুও তত এতটুকু আলো!—সে আপিসে, মেসে, বাসায় যেসব লোকের সঙ্গে কারবার করে—তাহারা নিতান্ত মামুলি ধরনের সাংসারিক জীব-অপুর প্রশ্ন শুনি তাহারা আড়ালে হাসে, চোখ টেপাটেপি কবে-কবুণার হাসি হাসে। এইটাই অপু বরদাস্ত করিতে পারে না আদৌ। একদিন একজন সন্ন্যাসীর সন্ধান পাইয়া দরমাহাটার এক গলিতে তাহার কাছে সকালের দিকে গেল। লোকের খুব ভিড়, কেহ দর্শনপ্রার্থী, কেহ ঔষধ লইতে আসিয়াছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিবার পর অপুর ডাক পড়িল। সন্ন্যাসী গেরুয়াধারী নহেন, সাদা ধুতি পরনে, গায়ে হাত-কাটা বেনিয়ান, জলচৌকিব উপব আসন পাতিয়া বসিয়া আছেন। অপুর প্রশ্ন শুনিয়া গম্ভীরভাবে বলিলেন–আপনার স্ত্রী কতদিন মারা গেছেন? মাস দুই?—তার পুনর্জন্ম হয়ে গিয়েছে।
অপু অবাক হইয়া জিজ্ঞাসা করিলকি করে আপনি—মানে—
সন্ন্যাসীজী বলিলেন-মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই হয়। এতদিন থাকে না—আপনাকে বলে দিচ্ছি, বিশ্বাস করতে হয় এসব কথা। ইংরিজি পড়ে আপনারা তো এ সব মানেন না। তাই হতে হবে।
অপুর একথা আদৌ বিশ্বাস হইল না। অপর্ণা, তাহার অপর্ণা, আর মাস আট-নয় পরে অন্য দেশে কোন গৃহস্থের ঘরে সব ভুলিয়া ঘোট খুকি হইয়া জন্মিবে?…এত স্নেহ, এত প্রেম, এত মমতা—এসব ভুয়োবাজি? অসম্ভব।…সারারাত কিন্তু এই চিন্তায় সে ছটফট করিতে লাগিলএকবার ভাবে, হয়তো সন্ন্যাসী ঠিকই বলিযাছেন—কিন্তু তাব মন সায় দেয় না, মন বলে, ও-কথাই নয়-মিথ্যা, মিথ্যা, মিথ্যা…স্বয়ং পিতামহ ব্রহ্মা আসিয়া বলিলেও সে-কথা বিশ্বাস করিবে না। দুঃখের মধ্যে হাসিও পাইল—ভাবিল অপর্ণার পুনর্জন্ম হয়ে গেছে, ওর কাছে টেলিগ্রাম এসেছে। হামবাগ কোথাকার—দ্যাখো না কাণ্ড!
এত ভয়ানক সঙ্গীহীনতার ভাব গত দশ-এগারো মাস তাহার হয় নাই। পিন্টুরা চলিয়া যাওয়ার পর বাসা ভালো লাগে না, অপর্ণার সঙ্গে বাসাটা এতখানি জােনন যে, আর সেখানে থাকা অসম্ভব হইয়া উঠিল। তদুপরি বিপদ, গাঙ্গুলি-গিন্নি তাহার কোন্ বোনঝির সঙ্গে তাহার বিবাহের যোগাযোগের জন্য একেবারে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছেন। তাহাকে একা একটু বসিতে দেখিলে সংসারের অসারত্ব, কথিত বোনঝিটির রূপগুণ, সম্মুখের মাঘ মাসে মেয়েটিকে একবার দেখিয়া আসিবার প্রস্তাব, নানা বাজে কথা।
নিজে রাঁধিয়া খাওয়ার ব্যবস্থা—অবশ্য ইতিপুর্বে সে বরাবরই রাঁধিয়া খাইয়া আসিয়াছে বটে, কিন্তু এবার যেন রাঁধিতে গিয়া কাহার উপর একটা সুতীব্র অভিমান। ঘরটাও বড়ো নির্জন, রাত্রিতে প্রাণ যেন হাঁপাইয়া উঠে। পাষাণভারের মতো দারুণ নির্জনতা সব সময় বুকের উপর চাপিয়া বসিয়া থাকে। এমন কি, শুধু ঘরে নয়, পথে-ঘাটে, আপিসেও তাই-মনে হয় জগতে কেহ কোথাও আপনার নাই।
তাহার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে কে কোথায় চলিয়া গিয়াছে ঠিকানা নাই-প্রণবও নাই এখানে। মুখের আলাপী দু-চারজন বন্ধু আছে বটে কিন্তু ও-সব বে-দরদী লোকের সঙ্গ ভালো লাগে না। রবিবার ও ছুটির দিনগুলি তো আর কাটেই না-অপুর মনে পড়ে বৎসরখানেক পূর্বেও শনিবারের প্রত্যাশায় সে-সব আগ্রহভরা দিন গণনা—আর আজকাল? শনিবার যত নিকটে আসে তত ভয় বাড়ে।
বৌবাজারের এক গলির মধ্যে তাহার এক কলেজ বন্ধুর পেটেন্ট ঔষধের দোকান। অপর্ণার কথা ভুলিয়া থাকিবার জন্য সে মাঝে মাঝে সেখানে গিয়া বসে। এ রবিবার দিনটাও বেড়াইতে বেড়াইতে গেল। কারবারের অবস্থা খুব ভালো নয়। বন্ধুটি তাহাকে দেখিয়া বলিল—ও, তুমি আমার আজকাল হয়েছে ভাই-কে আসিল বলে চমকিয়ে চাই, কাননে ডাকিলে পাখি—সকাল থেকে হরদম পাওনাদার আসছে আর যাচ্ছে—আমি বলি বুঝি কোন্ পাওনাদার এলো, বোসো বোসো।
