অপু বসিয়া বলিল—কাবুলীর টাকাটা শোধ দিয়েছ?
-কোথা থেকে দেব দাদা? সে এলেই পালাই, নয় তো মিথ্যে কথা বলি। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনের দেনার দরুন-ছোট আদালতে নালিশ করেছিল, পরশু এসে বাক্সপত্র আদালতের বেলিফ সীল করে গিয়েছে। তোমার কাছে বলতে কি, এবেলার বাজার খরচটা পর্যন্ত নেই–তার ওপর ভাই বাড়িতে সুখ নেই। আমি চাই একটু ঝগড়াঝাঁটি হোক, মান-অভিমান হোক—তা নয়, বৌটা হয়েছে এমন ভালো মানুষ সাত চড়ে রা নেই
অপু হাসিয়া উঠিয়া বলিল—বলল কি হে, সে তোমার ভালো লাগে না বুঝি?…
—রামোঃ—পাসে লাগে, ঘোর পাসে। আমি চাই একটু দুষ্টু হবে, একগুঁয়ে হবে—স্মার্ট হবে—তা নয় এত ভালো মানুষ, যা বলছি তাই করছে—সংসারের এই কষ্ট, হয়তো একবেলা খাওয়াই হল না—মুখে কথাটি নেই! কাপড় নেই—তাই সই, ডাইনে বললে তক্ষুনি ডাইনে, বাঁয়ে বললে বাঁয়ে-না, অসহ্য হয়ে পড়েছে।—বৈচিত্র্য নেই রে ভাই। পাশের বাসার বৌটা সেদিন কেমন স্বামীর উপর রাগ করে কাচের গ্লাস, হাতবাক্স দুমদাম করে আছাড় মেরে ভাঙলে, দেখে হিংসে হল, ভাবলুম হায় রে, আর আমার কি কপাল! না, হাসি না আমি তোমাকে সত্যি সত্যি প্রাণের কথা বলছি ভাই—এরকম পানসে ঘরকন্না আর আমার চলছে না-বিলিভ মি—অসম্ভব! ভালোমানুষ নিয়ে ধুয়ে খাব?…একটা দুষ্ট মেয়ের সন্ধান দিতে পারো?
–কেন আবার বিয়ে করবে নাকি?—একটাকে পারো না খেতে দিতে–তোমার দেখছি সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়
–না ভাই, এ সুখ আমার আর—জীবনটা এখন দেখছি একেবারে ব্যর্থ হল, মনের কোনও সাধ মিটল না।—এক এক সময় ভাবি ওর সঙ্গে আমার ঠিক মিলন হয়নি-মিলন যদি ঘটত তা হলে দ্বন্দ্বও হতবুঝলে না?…কে, টেপি?—এই আমার বড়ো মেয়ে—শোন, তোর মার কাছ থেকে দুটো পয়সা নিয়ে দু-পয়সার বেগুনি কিনে নিয়ে আয় তো আমাদের জন্যে, আর অমনি চায়ের কথা বলে দে
—আচ্ছা মরণের পর মানুষ কোথায় যায় জানো? বলতে পারো?
—ওসব ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাই নি কখনও। পাওনাদার কি করে তাড়ানো যায় স্বলতে পারো? এখুনি কাবুলিওয়ালা একটা আসবে নেবুতলা থেকে। আঠারো টাকা ধার নিয়েছি, চার আনা টাকা পিছু সুদ হপ্তায়। দু হপ্তার সুদ বাকি, কি যে আজ তাকে বলি?-স্কাউলেটা এলো বলে দিতে পারো দুটো টাকা ভাই?
-এখন তো নেই কাছে, একটা আছে রেখে দাও। কাল সকালে আর একটা টাকা দিয়ে যাব এখন। এই যে টেপি, বেশ বেগুনি এনেছিস-না না, আমি খাব না, তোমরা খাও, আচ্ছা এই একখানা তুলে নিলাম, নিয়ে যা টেঁপি।
বন্ধুর দোকান হইতে বাহির হইয়া সে খানিকটা লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরিল। লীলা এখানে আছে? একবার দেখিয়া আসিবে? প্রায় একবৎসর লীলারা এখানে নাই, তাহার দাদামহাশয় মামলা করিয়া লীলার পৈতৃক সম্পত্তি কিছু উদ্ধার করিয়াছেন, আজকাল লীলা মায়ের সঙ্গে আবার বর্ধমানের বাড়িতেই ফিরিয়া গিয়াছে। থার্ড ইয়ারে ভর্তি হইয়া এক বৎসর পড়িয়াছিল—পরীক্ষা দেয় নাই, লেখাপড়া ছাড়িয়া দিয়াছে।
সন্ধ্যার কিছু পূর্বে ভবানীপুরে লীলাদের ওখানে গেল। রামলগন বেয়ারা তাহাকে চেনে, বৈঠকখানায় বসাইল, মিঃ লাহিড়ী এখানে নাই, রাঁচি গিয়াছেন। লীলা দিদিমণি? কেন, সেকথা কিছু বাবুর জানা নাই? দিদিমণির তো বিবাহ হইয়া গিয়াছে গত বৈশাখ মাসে। নাগপুরে জামাইবাবু বড়ো ইঞ্জিনিয়ার, বিলাতফেরত—একেবারে খাঁটি সাহেব, দেখিলে চিনিবার জো নাই। খুব বড়োলোকের ছেলে—এদের সমান বড়োলোক। কেন, বাবুর কাছে নিমন্ত্রণেব চিঠি যায় নাই?
অপু বিবর্ণমুখে বলিল-কই না, আমার কাছে, হ্যাঁ-না আর বসব না—আচ্ছা।
বাহিরে আসিয়া জগৎটা যেন অপুর কাছে একেবারে নির্জন, সঙ্গীহীন, বিস্বাদ ও বৈচিত্র্যহীন ঠেকিল। কেন এরকম মনে হইতেছে তাহার? লীলা বিবাহ করিবে ইহার মধ্যে অসম্ভব তো কিছু নাই। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তবে তাহাতে মন খারাপ করিবার কি আছে? ভালোই তো। জামাই ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষিত, অবস্থাপন্নলীলার উপযুক্ত বব জুটিয়াছে, ভালোই তো।
রাস্তা ছাড়িয়া ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সম্মুখের মাঠটাতে অর্ধ অন্ধকারের মধ্যে সে উদ্ভ্রান্তের মতো অনেকক্ষণ ঘুরিয়া বেড়াইল।
লীলার বিবাহ হইয়াছে, খুবই আনন্দের কথা, ভালো কথা। ভালোই তো।
১৫. কলিকাতা আর ভালো লাগে না
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
কলিকাতা আর ভালো লাগে না, কিছুতেই না—এখানকার ধরাবাঁধা রুটিনমাফিক কাজ, বদ্ধতা, একঘেয়েমি—এ যেন অপুর অসহ্য হইয়া উঠিল। তা ছাড়া একটা যুক্তিহীন ও ভিত্তিহীন অস্পষ্ট ধারণা তাহার মনের মধ্যে ক্রমেই গড়িয়া উঠিতেছিল–কলিকাতা ছাড়িলেই যেন সব দুঃখ দূর হইবে—মনের শান্তি আবার ফিরিয়া পাওয়া যাইবে।
শীলেদের আফিসের কাজ ছাড়িয়া দিয়া অবশেষে সে চাপদানির কাছে একটা গ্রাম্য স্কুলের মাস্টারি লইয়া গেল। জায়গাটা না-শহর, না-পাড়াগাঁ গোছের—চারিধারে পাটের কল ও কুলিবস্তি, টিনের চালাওয়ালা দোকানঘর ও বাজার, কয়লার গুঁড়োফেলা রাস্তায় কালো ধুলা ও ধোঁয়া, শহরের পারিপাট্যও নাই, পাড়াগাঁয়ের সহজ শ্রীও নাই।
বড়োদিনের ছুটিতে প্রণব ঢাকা হইতে কলিকাতায় অপুর সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিল। সে জানিত অপু আজকাল কলিকাতায় থাকে না—সন্ধ্যার কিছু আগে সে গিয়া চাপদানি পৌঁছিল।
খুঁজিয়া খুঁজিয়া অপুর বাসাও বাহির করিল। বাজারের একপাশে একটা ছোট্ট ঘর—তার অর্ধেকটা একটা ডাক্তারখানা, স্থানীয় একজন হাতুড়ে ডাক্তার সকালে বিকালে রোগি দেখেন। বাকি অর্ধেকটাতে অপুর একখানা তক্তপোশ, একা আধময়লা বিছানা, খানকতক কাপড় ঝুলানন। তক্তপোশের নিচে অপুর স্টিলের তোরটা।
