তিনি উঠিয়া যাইবার পব আসিলেন গাঙ্গুলি-গৃহিণী। বয়সে প্রবীণা হইলেও ইনি কখনও অপুর সঙ্গে সাক্ষাৎভাবে কথাবার্তা বলেন নাই। আধ-ঘোমটা দিয়া তিনি দোরের আড়াল হইতে বলিতে লাগিলেন—আহা, জলজ্যান্ত বৌটা, এমন হবে তা তত কখনও জানি নি, ভাবি নিকাল আমায় আমার বড় ছেলে নবীন বলছে রাত্তিবে, যে, মা শুনেছ এইবকম, অপূর্ববাবুর স্ত্রী মারা গিয়েছেন এই মাত্তর খবর এল—তা বাবা আমি বিশ্বাস করি নি। আজ সকালে আবার বাঁটুল বললে—তা বলি, যাই জেনে আসি–আসব কি বাবা, দুই ছেলেব আপিসেব ভাত, বাঁটুলের আজকাল আবার দমদমার গুলির কারখানায় কাজ, দুটো নাকে-মুখে খুঁজেই দৌড়ায়, এখন আড়াই টাকা হপ্তা, সাহেব বলেছে বোশেখ মাস থেকে দেড় টাকা বাড়িয়ে দেবে। ওই এক ছেলে বেখে ওব মা মারা যায়, সেই থেকে আমারই কাছে—আহা তা ভেবো না বাবা—সবারই ও কষ্ট আছে,—তুমি পুরুষ মানুষ, তোমার ভাবনা কি বাবা? বলে
বজায় থাকুক চুড়ো-বাঁশি
মিলবে কত সেবাদাসী—
–একটা ছেড়ে দশটা বিয়ে করো না কেন?—তোমার বয়েসটাই বা কি এমন–
অপু ভাবিল —এরা লোক ভালো তাই এসে এসে বলছে। কিন্তু আমায় কেন একটু একা থাকতে দেয় না? কেউ না আসে ঘরে সেই আমার ভালো। এবা কি বুঝবে?
সন্ধ্যা হইয়া গেল। বাবান্দার যে কোণে ফুলেব টব সাজানো, দু-একটা মশা সেখানে বিন্ বিন করিতেছে। অন্যদিন সে সেই সময়ে আলো জ্বালে, স্টোভ জ্বালিয়া চা ও হালুয়া করে, আজ অন্ধকারের মধ্যে বারান্দার চেয়াবখানাতে বসিযাই রহিল, একমনে সে কি একটা ভাবিতেছিলগভীরভাবে ভাবিতেছিল।
ঘরের মধ্যেই দেশলাই জ্বালার শব্দে সে চমকিয়া উঠিল। বুকের ভিতরটা যেন কেমন করিয়া উঠিল—মুহূর্তের জন্য মনে হইল যেন অপর্ণা আছে। এখানে থাকিলে এই সময় সে স্টোভ ধরাইত, সন্ধ্যা দিত। ডাকিয়া বলিল—কে?
পিন্টু আসিয়া বলিল—ও কাকাবাবু-মা আপনাদেব কেরোসিনের তেলের বোতলটা কোথায় জিজ্ঞেস করলে
অপু বিস্ময়ের সুরে বলিল—ঘরে কে রে, পিন্টু? তোর মা?…ও! বউ-ঠাকরুন?—বলিতে বলিতে সে উঠিয়া দেখিল পিন্টুর মা মেজেতে স্টোভ মুছিতেছে।
বউ-ঠাকরুন, তা আপনি আবার কষ্ট করে কেন মিথ্যে—আমিই বরং ওটা
তেলের বোতলটা দিয়া সে আবার আসিয়া বারান্দাতে বসিল। পিন্টুর মা স্টোভ জ্বালিয়া চা ও খাবার তৈরি করিয়া পিন্টুর হাতে পাঠাইয়া দিল ও রাত্রি নয়টার পর নিজের ঘর হইতে ভাত বাড়িয়া আনিয়া অপুদের ঘরের মেজেতে খাইবার ঠাই করিয়া ভাতের থালা ঢাকা দিয়া রাখিয়া গেল।
পিন্টুর বাবা সারিয়া উঠিয়াহেন, তবে এখনও বড়ো দুর্বল, লাঠি ধরিয়া সকালে বিকালে একটু-আধটু গোলদিঘিতে বেড়াইতে যান, নিচের একঘর ভাড়াটে উঠিয়া যাওয়াতে সেই ঘরেই আজকাল ইহারা থাকেন। ডাক্তার বলিয়াছে, আর মাসখানেকের মধ্যে দেশে ফেরা চলিবে। পরদিন সকালেও পিন্টুর মা ভাত দিয়া গেল। বৈকালে আপিস হইতে আসিয়া কাপড় জামা না ছাড়িয়াই বাহিরে বারান্দাতে বসিয়াছে। বউটি স্টোভ ধরাইতে আসিল।
অপু উঠিয়া গিয়া বলিল-বোজ বোজ আপনাকে এ কষ্ট করতে হবে না, বউদি। আমি এই গোলদিঘির ধারের দোকান থেকে খেয়ে আসব চা।
বউদি বলিল—আপনি অত কুষ্ঠিত হচ্ছেন কেন ঠাকুরপো, আমার আর কি কষ্ট? টুলটা নিয়ে এসে এখানে বসুন, দেখুন চা তৈরি করি।
এই প্রথম পিন্টুর মা তাহার সহিত কথা কহিল। পিন্টু বলিল—কাকাবাবু আমাকে গোলদিঘিতে বেড়াতে নিয়ে যাবে? একটা ফুলের চারা তুলে আনব, এনে পুঁতে দেব।
বউটির বয়স ত্রিশের মধ্যে, পাতলা একহারা গড়ন, শ্যামবর্ণ, মাঝামাঝি দেখিতে, খুব ভালোও নয়, মন্দও নয়। অপু টুলটা দুয়ারের কাছে টানিয়া বসিল। বউটি চায়ের জল নামাইয়া বলিল—এক কাজ করি ঠাকুরপো, একেবারে চাট্টি ময়দা মেখে আপনাকে খানকতক লুচি ভেজে দি—কখানাই বা খান—একেবারে রাতের খাবারটা এই সঙ্গেই খাইয়ে দি—সারাদিন ক্ষিদেও তো পেয়েছে।
মেয়েটির নিঃসংকোচ ব্যবহারে তাহার নিজের সংকোচ ক্রমে চলিয়া যাইতেছিল। সে বলিল— বেশ করুন মন্দ কি। ওরে পিন্টু, ওই পেয়ালাটা নিয়ে আয়
-–থাক, থাক ঠাকুরপো, আমি ওকে আলাদা দিচ্ছি। কেটলিতে এখনও চা আছে—আপনি খান। আপনাদের বেলুনটা কোথায় ঠাকুবপো?
–সত্যি আপনি বড় কষ্ট করছেন, বউ-ঠাকরুন-আপনাকে এত কষ্ট দেওয়াটা
পিন্টুর মা বলিল—আপনি বার বার ওরকম বলছেন কেন? আপনারা আমার যা উপকার করেছেন, তা নিজের আত্মীয়ও করে না আজকাল। কে পরকে থাকবার জন্যে ঘর ছেড়ে দেয়? কিন্তু আমার সে বলবার মুখ তত দিলেন না ভগবান, কি কবি বলুন। আমি বুগী সামলে মেয়েকে যদি খাওয়াতে না পারি, তাই সে দুবেলা আপনি খেয়ে আপিসে গেলেই পিন্টুকে নিজে গিয়ে ডেকে এনে আপনার পাতে খাওয়াত। এক-একদিন
কথা শেষ না করিয়াই পিন্টুর মা হঠাৎ চুপ করিল। অপুর মনে হইল ইহার সঙ্গে অপর্ণার কথা কহিয়া সুখ আছে, এ বুঝিবে, অন্য কেহ বুঝিবে না।
সারাদিন অপু কাজকর্মে ভুলিয়া থাকিতে প্রাণপণ চেষ্টা করে, যখনই একটু মনে আসে অমনি একটা কিছু কাজ দিয়া সেটাকে চাপা দেয়। আগে সে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হইয়া বসিয়া কি ভাবিত, খাতাপত্রে গল্প কবিতা লিখিত কাজ ফাঁকি দিয়া অন্য বই পড়িত। কিন্তু অপর্ণার মৃত্যুর পর হইতে সে দশগুণ খাটিতে লাগিল, সকলের কাছে কাজের তাগাদা করিয়া বেড়ায়, সারাদিনের কাজ দু-ঘন্টায় করিয়া ফেলে, তাহার লেখা চিঠি টাইপ করিতে করিতে নৃপেন বিরক্ত হইয়া উঠিল।
