কিন্তু অপর্ণা আর একবার আসিয়াছিল ঘণ্টাখানেক পরে, চা দেওয়া হইবে কিনা জিজ্ঞাসা করিতে—অপু তখন ঘুমাইতেছে। খোলা জানালা দিয়া মুখে রৌদ্র লাগিতেছে। অপর্ণা সন্তর্পণে জানালাটা বন্ধ করিয়া দিল। ঘুমন্ত অবস্থায় স্বামীকে এমন দেখায়!—এমন একটা মায়া হয় ওর ওপরে! সিঁড়ি দিয়া নামিবার সময় ভাবিল, মা সত্যিই বলে বটে, পটের মুখ-পটে আঁকা ঠাকুরদেবতার মতো মুখ—
চলিয়া আসিবার সময়ে কিন্তু অপর্ণার সঙ্গে দেখা হইল না। অপুর আগ্রহ ছিল, কিন্তু আত্মীয় কুটুম্ব পরিজনে বাড়ি সরগরম-কাহাকে যে বলে অপর্ণাকে একবার ডাকিয়াই দিতে? মুখচোরা অপু ইচ্ছাটা কাহাকেও জানাইতে পারিল না। নৌকায় উঠিয়া মুরারির ছোট ভাই বিশু বলিল—আসবার সময় দিদির সঙ্গে দেখা করে এলেন না কেন, জামাইবাবু? দিদি সিঁড়ির ঘরে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল, আপনি যখন চলে আসেন
কিন্তু নৌকা তখন জোর ভাটার টানে যশাইকাটির বাঁকের প্রায় কাছাকাছি আসিয়া পৌঁছিয়াছে।
এবার কলিকাতায় আসিয়া অনেকদিন পরে দেওয়ানপুরের বাল্যবন্ধু দেবব্রতের সঙ্গে দেখা হইল। সে আমেরিকা যাইতেছে। পরস্পরের দেখাসাক্ষাৎ না হওয়ায় কেহ কাহারও ঠিকানা জানিত না । অথচ দেবব্রত এখানেই কলেজে পড়িতেছিল, এবার বি.এসসি. পাস করিয়াছে।…অপুর কাছে ব্যাপারটা আশ্চর্য ঠেকিল, আনন্দ হইল, হিংসাও হইল। প্রতি শনিবারে বাড়ি না যাইয়া যে থাকিতে পারিত না, সেই ঘর-পাগল দেবব্রত আমেরিকা চলিয়া যাইতেছে!
মাস দুই-তিন বো কষ্টে কাটিল। আজ এক বছরের অভ্যাস-আপিস হইতে বাসায় ফিরিয়া অপর্ণার হাসিভরা মুখ দেখিয়া কর্মক্লান্ত মন শান্ত হইত। আজকাল এমন কষ্ট হয়। বাসায় না ফিরিয়াই সোজা ছেলে পড়াইতে যায় আজকাল, বাসায় মন লাগে না, খালি খালি ঠেকে।
লীলারা কেহ এখানে নাই। বর্ধমানের বিষয় লইয়া কি সব মামলা-মকদ্দমা চলিতেছে, অনেকদিন হইতে তাহারা সেখানে।
একদিন রবিবারে সে বেলুড় মঠ বেড়াইয়া আসিয়া অপর্ণাকে এক লম্বা চিঠি দিল, ভারি ভালো লাগিয়াছিল জায়গাটা, অপর্ণা এখানে আসিলে একদিন বেড়াইয়া আসিবে। এসব পত্রের উত্তর অপর্ণা খুব শীঘ্র দেয়, কিন্তু পত্ৰখানার কোন জবাব আসিল না—দু-দিন, চারদিন, সাতদিন হইয়া গেল। তাহার মন অস্থির হইয়া উঠিল—কি ব্যাপার? অপর্ণা হয়তো নাই, সে মারা গিয়াছে-ঠিক তাই। রাত্রে নানা রকম স্বপ্ন দেখে—অপর্ণা ছলছল চোখে বলিতেছে—তোমায় তো বলেছিলাম আমি বেশিদিন বাঁচব না, মনে নেই? …সেই মনসাপোতায় একদিন রাত্রে?-আমার মনে কে বলত। যাই—আবার আর জন্মে দেখা হবে।
পরদিন পড়িবে শনিবার। সে আপিসে গেল না, চাকুরির মায়া না করিয়াই সুটকেস গুছাইয়া বাহির হইয়া যাইতেছে এমন সময় শশুরবাড়ির পত্র পাইল। সকলেই ভালো আছে। যাক-বাঁচা গেল? উঃ, কি ভয়ানক দুর্ভাবনার মধ্যে ফেলিয়াছিল উহাবা! অপর্ণার উপর একটু অভিমানও হইল। কি কাণ্ড, মন ভালো না থাকিলে এমন সব অদ্ভুত কথাও মনে আসে। কয়দিন সে ক্রমাগত ভাবিয়াছে, ওগো মাঝি তরী হেথা গানটা কলিকাতায় আজকাল সবাই গায়। কিন্তু গানটার বর্ণনাব সঙ্গে তার শ্বশুরবাড়ির এত হুবহু মিল হয় কি করিয়া? গানটা কি তাহার বেলায় খাটিয়া যাইবে?
শনিবার আপিস হইতে ফিরিয়া দেখিল, মুরারি তাহার বাসায় বার-বারান্দায় চেয়াবখানাতে বসিয়া আছে। শ্যালককে দেখিয়া অপু খুশি হইল—হাসিমুখে বলিল, এ কি, বাস বে! সাক্ষাৎ বড়োকুটুম যে। কার মুখ দেখে না জানি যে আজ সকালে
মুরারি খামে-আঁটা একখানা চিঠি তাহার হাতে দিল—কোন কথা বলিল না। অপু পত্রখানা হাত বাড়াইয়া লইতে গিয়া দেখিল, মুরারির মুখ কেমন হইয়া গিয়াছে। সে যেন চোখের জল চাপিতে প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছে।
অপুর বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন হিম হইয়া গেল। কেমন করিয়া আপনা-আপনি তাহার মুখ দিয়া বাহির হইল—অপর্ণা নেই?
মুরারি নিজেকে আর সামলাইতে পারিল না।
–কি হয়েছিল?
–কাল সকালে আটটার সময় প্রসব হল—সাড়ে নটার সময়–
—জ্ঞান ছিল?
—আগাগোড়া। ছোট কাকিমার কাছে চুপি চুপি নাকি বলেছিল ছেলে হওয়ার কথা তোমাকে তার করে জানাতে। তখন ভালোই ছিল। হঠাৎ নটার পর থেকে।
ইহার পরে অপু অনেক সময় ভাবিয়া আশ্চর্য হইত—সে তখন স্বাভাবিক সুরে অতগুলি প্রশ্ন একসঙ্গে করিয়াছিল কি করিয়া! মুরারি বাড়ি ফিরিয়া গল্প করিয়াছিল—অপূর্বকে কি করে খবরটা শোনাব, সারা রেল আর স্টিমারে শুধু তাই ভেবেছিলাম কিন্তু সেখানে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম, আমায় বলতে হল না—ওই খবর টেনে বার করলে।
মুরারি চলিয়া গেলে সন্ধ্যার দিকে একবার অপুর মনে হইল, নবজাত পুত্রটি বাঁচিয়া আছে না নাই? সে কথা তো মুরারিকে জিজ্ঞাসা করা হয় নাই বা সে-ও কিছু বলে নাই। কে জানে, হয়তো নাই।
কথাটা ক্রমে বাসার সকলেই শুনিল। পরদিন যথারীতি আপিসে গিয়াহে, আপিস হতে ফিরিয়া হাতমুখ ধুইতেছে, উপরের ভাড়াটে বন্ধু সেন মহাশয় অপুদের ঘরের বারান্দাতে উঠিলেন।
অপু বলিল-এই যে সেন মশায়, আসুন, আসুন।
সেন মহাশয় জিহ্বা ও তালুর সাহায্যে একটা দুঃখসূচক শব্দ উচ্চারণ করিয়া টুলখানা টানিয়া হতাশভাবে বসিয়া পড়িলেন।
-আহা-হা, রূপে সরস্বতী গুণে লক্ষ্মী! কলের কাছে সেদিন মা আমার সাবান নিয়ে কাপড় ধুচ্ছেন, আমি সকাল সকাল স্নান করব বলে ওপরের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখি। বললামকে বৌমা! তা মা আমার একটু হাসলেন—বলি তা থাক, মায়ের কাপড় কাঁচা হয়ে যাক! স্নানটা না হয় নটার পরেই করা যাবে এখন—একদিন ইলিশ মাছের দুইমাছ বেঁধেছেন, অমনি তা বাটি করে ওপরে পাঠিয়ে দিয়েছেন—আহা কি নরম কথা, কি লক্ষ্মীশ্রী,—সবই শ্রীহরির ইচ্ছে! সবই তাঁর
