স্টিমার ছাড়িয়া দুজনে নৌকায় চড়িল। অপর্ণার খুড়তুতো ভাই মুরারি উহাদের নামাইয়া লইতে আসিয়াছিল। সে-ও গল্প করিতে করিতে চলিল। অপর্ণা ঘোমটা দিয়া একপাশে সরিয়া বসিয়াছিল। হেমন্ত-অপরাহের সিন্ধু ছায়া নদীর বুকে নামিয়াছে, বাঁ দিকের তীরে সারি সারি গ্রাম, একখানা বড়ো হাঁড়ি-কলসি বোঝাই ভড় যশাইকাটির ঘাটে বাঁধা।
অপুর মনে একটা মুক্তির আনন্দ-আর মনেও হয় না যে জগতে শীলেদের আপিসের মতো ভয়ানক স্থান আছে। তাহার সহজ আনন্দ-প্রবণ মন আবার নাচিয়া উঠিল, চারিধারের এই শ্যামলতা, প্রসার, নদীজলের গন্ধের সঙ্গে তাহার যে নাড়ীর যোগ আছে।
কৌতুক দেখিবার জন্য অপর্ণাকে লক্ষ করিয়া হাসিমুখে বলিল—ওগো কলাবৌ, ঘোমটা খোলো, চেয়ে দ্যাখো, বাপের বাড়ির দ্যাশটা চেয়ে দ্যাখো গো
মুরারি হাসিমুখে অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া রহিল। অপর্ণা লজ্জায় আরও জড়সড় হইয়া বসিল। আরও খানিকটা আসিয়া মুরারি বলিল—তোমরা যাও, এইখানের হাটে যদি বড়ো মাছ পাওয়া যায়, জ্যাঠাইমা কিনতে বলে দিয়েছেন! এইটুকু হেঁটে যাব এখন।
মুরারি নামিয়া গেলে অপর্ণা বলিল—আচ্ছা তুমি কি? দাদার সামনে ওইরকম করে আমায়-তোমার সেই দুষ্টুমি এখনও গেল না? কি ভাবলে বলো তো দাদা-ছিঃ। পরে রাগের সুরে বলিল—দুই কোথাকার, তোমার সঙ্গে আমি আর কোথাও কখনও যাব না-কখখনো না, থেকো একলা বাসায়!
—বয়েই গেল! আমি তোমাকে মাথার দিব্যি দিয়ে সেধেছিলম কিনা! আমি নিজে মজা করে বেঁধে খাব!
—তাই খেয়ো। আহা-হা, কি রান্নার ছাঁদ, তবু যদি আমি না জানতাম! আলু ভাতে, বেগুন ভাতে, সাত রকম তরকারি সব ভাতে—কি রাঁধুনী!
—নিজের দিকে চেয়ে কথা বলল। প্রথম যেদিন খুলনার ঘাটে বেঁধেছিলে, মনে আছে সব আলুনি?
-ওমা আমার কি হবে! এত বড় মিথ্যেবাদী তুমি, সব আলুনি! ওমা আমি কোথায়—
–সব। বিলকুল। মায় পটলভাজা পর্যন্ত।
অপর্ণা রাগ করিতে গিয়া হাসিয়া ফেলিল, বলিল–তুমি ভাঙন মাছ খাও নি? আমাদের এ নোনা গাঙের ভাঙন মাছ ভারি মিষ্টি। কাল মাকে বলে তোমায় খাওযাব।
লজ্জা করবে না তার বেলায়? কি বলবে মাকেও মা, এই আমার–
অপর্ণা স্বামীর মুখে হাত চাপা দিয়া বলিল—চুপ।
ঠিক সন্ধ্যার সময় অপর্ণাদের ঘাটে নৌকা লাগিল। দুজনেরই মনে এক অপূর্ব ভাব। শটিবনের সুগন্ধভরা স্নিগ্ধ হেমন্ত-অপরাহু তার সবটা কারণ নয়, নদীতীরেব ঝুপসি হইয়া থাকা গোলগাছের সবুজ সাবিও নয়, কারণ—তাহাদের আনন্দ-প্রবণ অনাবিল যৌবন–ব্যগ্র, নবীন, আগ্রহভরা যৌবন।
জ্যোৎস্নারাত্রে উপরের ঘরে ফুলশয্যার সেই পালঙ্কে বাতি জ্বালিয়া বসিয়া পড়িতে পড়িতে সে অপর্ণার প্রতীক্ষায় থাকে। নারিকেলশাখায় দেবীপক্ষের বকের পালকের মতো শুভ্র চাঁদের আলো পড়ে, বাইরের রাত্রির দিকে চাহিয়া কত কথা মনে আসে, কত সব পুবাতন স্মৃতি কোথায় যেন এই ধরনের সব পুরানো দিনের কত জ্যোৎস্না ঝরা রাত। এ যেন সব আরব্য-উপন্যাসের কাহিনী সে ছিল কোন্ কুঁড়েঘরে, পেট পুরিয়া সব দিন খাইতেও পাইত না—সে আজ এত বড়ো প্রাচীন জমিদার ঘরের জামাই, অথচ আশ্চর্য এই যে, এইটাই মনে হইতেছে সত্য। পুরানো দিনের জীবনটা অবাস্তব, অস্পষ্ট, ধোঁয়া ধোঁয়া মনে হয়।
হেমন্তের রাত্রি। ঠাণ্ডা বেশ। কেমন একটা গন্ধ বাতাসে, অপুর মনে হয় কুয়াশার গন্ধ। অনেক রাত্রে অপর্ণা আসে। অপু বলে—এত রাত যে!–আমি কতক্ষণ জেগে বসে থাকি।
অপর্ণা হাসে। বলে—নিচে কাকাবাবুর শোবার ঘর। আমি সিঁড়ি দিয়ে এলে পায়ের শব্দ ওঁর কানে যায়—এই জন্য উনি ঘরে খিল না দিলে, আসতে পারি নে। ভারী লজ্জা করে।
অপু জানালার খড়খড়িটা সশব্দে বন্ধ করিয়া দিল। অপর্ণা লাজুক মুখে বলিল—এই শুরু হল বুঝি দুষ্টুমি? তুমি কী!কাকাবাবু এখনও ঘুমোন নি যে!…
অপু আবার খটাস্ করিয়া খড়খড়ি খুলিয়া অপেক্ষাকৃত উচ্চসুরে বলিল—অপর্ণা, এক গ্লাস জল আনতে ভুলে গেলে যে!…ও অপর্ণা-অপর্ণা?…
অপর্ণা লজ্জায় বালিশের মধ্যে মুখ খুঁজড়াইয়া পড়িয়া রহিল।
ভোর রাত্রেও দুজনে গল্প করিতেছিল।
সকালের আলো ফুটিল। অপর্ণা বলিল—তোমার কটায় স্টিমার?…সারারাত তো নিজেও ঘুমুলে না, আমাকেও ঘুমুতে দিলে না—এখন খানিকটা ঘুমিয়ে থাকো—আমি অনাদিকে পাঠিয়ে তুলে দেবখন বেলা হলে। গিয়েই চিঠি দিয়ো কিন্তু। জানালার পর্দাগুলো বোপর বাড়ি দিয়ো—আমি
গেলে আর সাবান কে দেবে? সস্নেহে স্বামীর গায়ে হাত বুলাইয়া বলিল-কি রকম রোগা হয়ে গিয়েছ—এখন তোমাকে কাছছাড়া করতে ইচ্ছে করে না কলকাতায় না মেলে দুধ, না মেলে কিছু। এখানে এ-সময়ে কিছুদিন থাকলে শরীরটা সারত। বোজ আপিস থেকে এসে মোহনভোগ খেয়োপিন্টুর মাকে বলে এসেছি—সে-ই করে দেবে। এখন তো খরচ কমল? বেশি ছেলে পড়ানোতে কাজ নেই। যাই তাহলে?
অপু বলিল—বোসো বোসো—এখনও কোথায় তেমন ফরসা হয়েছে?-কাকার উঠতে এখনও দেরি!
অপর্ণা বলিল—হ্যাঁ আর একটা কথা দ্যাখো, মনসাপোতার ঘরটা এবার খুঁচি দিয়ে রেখো। নইলে বর্ষার দিকে বড্ড খরচ পড়ে যাবে, কলকাতার বাসায় তো চিরদিন চলবে না—ওই হল আপন ঘরদোর। এবার মনসাপোতায় ফিরব, বাস না করলে খড়ের ঘর টেকে না। যাই এবার, কাকা এবার উঠবেন। যাই?
অপর্ণা চলিয়া গেলে অপুর মন খুঁত খুঁত করিতে লাগিল। এখনও বাড়ির কেহই উঠে নাইকেন সে অপর্ণাকে ছাড়িয়া দিল? কেন বলিল—যাও! তাহার সম্মতি না পাইলে অপর্ণা কখনই যাইত না।
