বিমলেন্দু শুষ্কমুখে বলিল–কাল রঘুয়ার মুখে খবর পেয়ে এসে দেখি এই অবস্থা। এখন কি করি বলুন তো? বাড়ির কেউ আসবে না, আমি কাউকে বলতেও যাব না, মাকে একখানা টেলিগ্রাম করে দেব?
অপু বলিল—মা যদি না আসেন?
-কি বলেন? এক্ষুনি ছুটে আসবেন—দিদি-অন্ত প্রাণ। তিনি যে আজ চার বছর কলকাতামুখো হন নি, সে এই দিদির কাণ্ডেই তো। মুশকিল হয়েছে কি জানেন, কাল রাত্রেও বকেছে, শুধু খুকি, খুকি, অথচ তাকে আনানো অসম্ভব।
অপু বলিল,-আর এক কাজ করতে হবে, একজন নার্স আমি নিয়ে আসি ঠিক করে। মেয়েমানুষের নার্সিং পুরুষ দিয়ে হয় না। বোসোতোমরা।
দুই তিন দিনে সবাই মিলিয়া লীলাকে সাবাইয়া তুলিল। জ্ঞান হইলে সে একদিন কেবল অপুকে ঘরের মধ্যে দেখিতে পাইয়া কাছে ডাকিয়া ক্ষীণ সুরে বলিল—কখন এলে অপূর্ব?
রোগ হইতে উঠিয়াও লীলার স্বাস্থ্য ভালো হইল না। শুই আছে তো শুইয়াই আছে, বসিয়া আছে তো বসিয়াই আছে। মাথাব চুল উঠিযা যাইতে লাগিল। আপন মনে গুম হইয়া বসিয়া থাকে, ভালো করিয়া কথাও বলে না, হাসেও না। কোথাও নড়িতে চড়িতে চায় না। ইতিমধ্যে কাশী হইতে লীলার মা আসিলেন। বাপের বাড়ি থাকেন, মোজ মোটরে আসিয়া দু-তিন ঘণ্টা থাকেন—আবার চলিয়া যান। ডাক্তার বলিযাছে, স্বাস্থ্যকর জায়গায় না লইযা গেলে রোগ সারিবে না।
দুপুর বেলাটা কিন্তু একটু মেঘ করার দরুন রৌদ্র নাই কোথাও। অপু লীলার বাসায় গিযা দেখিল লীলা জানালার ধারে বসিয়া আছে। সে সব সময় আসিতে পারে না, কাজলকে একা বাসায় রাখিয়া আসা চলে না। ভারি চঞ্চল ও বীতিমতো নির্বোধ ছেলে। তাহা ছাড়া রান্নাবান্না ও সমুদ কাজ করিতে হয় অপুর, কাজলকে দিয়া কুটাগাছটা ভাঙিবার সাহায্য নাই, সে খেলাধুলা লইয়া সারাদিন মহা ব্যস্ত-অপু তাহাকে কিছু করিতে বলেও না, ভাবে–আহা, খেলুক একটু। পুওর মাদারলে চাইল্ড।
লীলা ম্লান হাসিয়া বলিল—এসো।
—এরা কোথায়? বিমলেন্দু কোথায়? মা এখনও আসেন নি?
–বসো। বিমলেন্দু এই কোথায় গেল। নার্স তো নিচে, বোধ হয় খেয়ে একটু ঘুমুচ্ছে।
–তারপর কোথায় যাওয়া ঠিক হল—সেই ধরমপুরেই? সঙ্গে যাবেন কে–
–মা আর বিমল।
খানিকক্ষণ দুজনেই চুপ করিয়া রহিল। পরে লীলা তাহার দিকে ফিরিয়া বলিল–আচ্ছা অপূর্ব, বর্ধমানের কথা মনে হয় তোমার?
অপু ভাবিল, আহা, কি হয়ে গিয়েছে লীলা!
মুখে বলিল-মনে থাকবে না কেন—খুব মনে আছে।
লীলা অন্যমনস্কভাবে বলিল—তোমরা সেই ওদিকের একটা ঘরে থাকতে—সেই আমি যেতুম–
—তুমি আমাকে একটা ফাউন্টেন পেন দিয়েছিলে মনে আহে লীলা? তখন ফাউন্টেন পেন নতুন উঠেছে। মনে নেই তোমার?
লীলা হাসিল।
অপু হিসাব করিয়া বলিল—তা ধরো প্রায় আজ বিশ-বাইশ বছর আগেকার কথা।
লীলা খানিকটা চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল—অপূর্ব, কেউ মোটরটা কিনবে বলতে পারো, তোমার সন্ধানে আছে?
লীলার অত সাধের গাড়িটা…এত কষ্টে পড়িয়াছে সে!–
লীলা বলিল—আমি সে সব গ্রাহ্য করি নে কিন্তু মা-ও ভাবেন-যাক সে সব কথা। তুমি আমাকে কোথাও নিয়ে যাবে অপূর্ব?
–কোথায়?
—যেখানে হোক। তোমার সেই পোর্তো প্লাতায়—মনে নেই, সেই যে সমুদ্রের মধ্যে কোন্ ডুবো জাহাজ উদ্ধার করে বলেছিলে সোনা আনবে? সেই যে মুকুল-এ পড়ে বলেছিলে?
কথাটা অপুর মনে পড়িল। হাসিয়া বলিল, হ্যাঁ সেই—ঠিক। উঃ, সে কথা মনে আছে। তোমার!
—আমি বলেছিলাম, কেমন করে যাবে? তুমি বলেছিলে, জাহাজ কিনে সমুদ্রে যাবে।
অপু হাসিল। শৈশবের সাধ-আশার নিশ্বলতা সম্বন্ধে সে কি একটা বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু হঠাৎ তাহার মনে পড়িয়া গেল, লীলাও এ ধরনের নানা আশা পোষণ করিত, বিদেশে যাইবে, বড়ো আর্টিস্ট হইবে ইত্যাদি-ওর সামনে আর সে কথা বলাব আবশ্যক নাই।
কিন্তু লীলাই আবার খানিকটা চুপ করিযা থাকিয়া বলিল—যাবে না? যাও যাও—পবে— হি-হি করিয়া হাসিয়া কেমন একটা অদ্ভুত সুরে বলিল–সমুদ্র থেকে সোনা আনবে তো তোমরাইপোর্তো প্লাতা থেকে, না?…দ্যাখো, এখনও ঠিক মনে কবে রেখেছি—রাখি নি? হি-হি-একটু চা খাবে?
লীলার মুখে শীর্ণ হাসি ও তাহার বাঁধুনিহারা উভ্রান্ত আলগা ধবনের কথাবার্তা অপুর বুকে তীক্ষ তীরের মতো বিধিল। সঙ্গে সঙ্গে বুঝিল এত ভালোবাসে নাই সে লীলাকে আর কোনো দিন আজ যত বাসিয়াছে।
—দুপুর বেলা চা খাব কি?—সেজন্যে ব্যস্ত হয়ো না লীলা।
লীলা বলিল—তোমার মুখে সেই পুরোনো গানটা শুনি নি অনেকদিন–সেই আমি চঞ্চল হে—গাও তো?
মেঘলা দিনে দুপুর। বাহিরের দিকে একটা সাহেব-বাড়িব কম্পাউন্ডে গাছের ডালে অনেকগুলি পাখি করব করিতেছে। অপু গান আরম্ভ করিল, লীলা জানালার ধারেই বসিয়া বাহিরের দিকে মুখ রাখিয়া গানটা শুনিতে লাগিল। লীলার মনে আনন্দ দিবার জন্য অপু গানটা দু-তিনবার ফিরাইয়া ফিরাইয়া গাহিল। গান শেষ হইয়া গেল, তবু লীলা জানালাব বাহিরেই চাহিয়া আছে, অন্যমনস্কভাবে যেন কি জিনিস লক্ষ করিতেছে।
খানিকক্ষণ কাটিয়া গেল। দুজনেই চুপ করিয়া ছিল। হঠাৎ লীলা বলিল—একটা কথার উত্তব দেবে?
লীলার গলার স্বরে অপু বিস্মিত হইল। বলিল—কি কথা?…
—আচ্ছা, বেঁচে লাভ কি?
অপু এ প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না—বলিল—এ কথার কি—এ কথা কেন?
–বলো না?…
–না লীলা। এ ধরনের কথাবার্তা কেন? এর দরকার নেই।
–আচ্ছা, একটা সত্যি কথা বলবে
—কি বলো?
—আচ্ছা, আমাকে লোকে কি ভাবে?
সেই লীলা! তাহার মুখে এ রকম দুর্বল ধরনের কথাবার্তা, সে কি কখনও স্বপ্নেও ভাবিয়াছিল। অপু এক মুহূর্তে সব বুঝিল-অভিমানিনী তেজস্বিনী শীলা আর সব সহ্য করিতে পারে, লোকের ঘৃণা তাহার অসহ্য। গত কয়েক বৎসরে ঠিক তাহাই জুটিয়াছে তাহার কপালে। এতদিন সেটা বোঝে নাই—সম্প্রতি বুঝিয়াছে—জীবনের উপর টান হারাইতে বসিয়াছে।
