বর্ষাকালের মাঝামাঝি অপুর চাকরিটি গেল। অর্থের এমন কষ্ট সে অনেক দিন ভোগ কবে নাই। ভালো স্কুলে দিতে না পারিয়া সে ছেলেকে কর্পোরেশনের ফ্রি স্কুলে ভর্তি করিয়া দিল। ছেলেকে দুধ পর্যন্ত দিতে পারে না। বইয়ের বিশেষ কিছু আয় নাই। হাত এদিকে কপর্দকশূন্য।
কাজলের মধ্যে অপু একটা পৃথক জগৎ দেখিতে পায়। দুটা টিনের চাকতি, গোটা দুই মার্বেল, একটা কল-টেপা খেলনা, মোটর গাড়ি, খান দুই বই-হইতে যে মানুষ কিসে এত আনন্দ পায~~ অপু তাহা বুঝিতে পারে না। চঞ্চল ও দুষ্ট ছেলে—পাছে হারাইয়া যায়, এই ভয়ে অপু তাহাকে মাঝে মাঝে ঘরে চাবি দিয়া রাখিয়া নিজের কাজে বাহির হইয়া যায়—এক-একদিন চার-পাঁচ ঘণ্টাও হইয়া যায়-কাজলের কোনো অসুবিধা নেই—সে রাস্তার ধারের জানালাটায় দাঁড়াইয়া পথের লোকজন দেখিতেছেনা হয়, বাবার বইগুলো নাড়িয়া চাড়িয়া ছবি দেখিতেছে—মোটর উপর আনন্দেই আছে।
এই বিরাট নগরীর জীবনস্রোত কাজলের কাছে অজানা দুর্বোধ্য। কিন্তু তাহার নবীন মন ও নবীন চক্ষু যে-সকল জিনিস দেখে ও দেখিয়া আনন্দ পায়—বয়স্ক লোকের ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাহা অতি তুচ্ছ। হয়তো আঙুল দিয়া দেখাইয়া বলে—দ্যাখো বাবা, ওই চিলটা কিসের ডাল মুখে করে নিয়ে যাচ্ছিল, সামনের ছাদের আলসেতে লেগে ডালটা-ওই দ্যাখো বাবা রাস্তায় পড়ে গিয়েছে।
বাবার সঙ্গে বেড়াইতে বাহির হইয়া এত ট্রাম, মোটর, লোকজনের ভিড়ের মাঝখানে কোথায় একটা কাক ফুটপাতের ধারে ড্রেনের জলে স্নান করিতেছে তাই দেখিয়া তাহার মহা আনন্দ-তাহা আবার বাবাকে না দেখাইলে কাজলের মনে তৃপ্তি হইবে। সব বিষয়েই বাবাকে আনন্দের ভাগ না দিতে পারিলে, কাজলের আনন্দ পূর্ণ হয় না। খাইতে খাইতে বেগুনিটা, কি তেলেভাজা কচুরিখানা এক কামড় খাইয়া ভালো লাগলে বাকি আধখানা বাবার মুখে খুঁজিয়া দিবে-অপুও তাহা তখনই খাইয়া ফেলেছি, আমার মুখে দিতে নেই—একথা বলিতে তার প্রাণ কেমন করে-কাজেই পিতৃত্বের গাম্ভীর্যভরা ব্যবধান অকারণে গড়িয়া উঠিয়া পিতা-পুত্রের সহজ সরল মৈত্রীকে বাধা দান করে নাই, কাজল জীবনে বাবার মতো সহচর পায় নাই–এবং অপুও বোধ হয় কাজলের মতো বিশ্বস্ত ও একান্ত নির্ভরশীল তরুণ বন্ধু খুব বেশি পায় নাই জীবনে।
আর কি সরলতা!…পথে হয়তো দুজনে বেড়াইতে বাহির হইয়াছে, কাজল বলিল—শোনো বাবা, একটা কথা শোনো, চুপি চুপি বলব—পবে পথের এদিক ওদিক চাহিয়া লাজুক মুখে কানে কানে বলে-ঠাকুর বড়ো দুটাখানি ভাত দ্যায় হোটেলে—আমার খেয়ে পেট ভরে না—তুমি বলবে বাবা? বললে আর দুটো দেবে না?
দিনকতক গলির একটা হোটলে পিতাপুত্রে দুজনে খায়—হোটেলের ঠাকুর হয়তো শহরের ছেলের হিসেবে ভাত দেয় কাজলকে কিন্তু পাড়াগাঁয়ের ছেলে কাজল বয়সের অনুপাতে দুটি বেশি ভাতই খাইয়া থাকে।
অপু মনে মনে হাসিয়া ভাবে—এই কথা আবার কানে কানে বলা!…রাস্তার মধ্যে ওকে চেনেই বা কে আর শুনছেই বা কে!…ছেলেটা বেজায় বোকা।
আর একদিন কাজল লাজুক মুখে বলিল-বাবা একটা কথা বলব?…
—কি?
–নাঃ বাবা-বলব না—
–বল্ না কি?
কাজল সরিয়া আসিয়া চুপি চুপি লাজুক সুরে বলিল—তুমি মদ খাও বাবা?
অপু বিস্মিত হইয়া বলিল–মদ?…কে বলেছে তোকে?
—সেই যে সেদিন খেলে? সেই বাস্তার মোড়ে একটা দোকান থেকে? পান কিনলে আর সেই যে–
অপু প্রথমটা অবাক হইয়া গিয়াছিল—ফের বুঝিয়া হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিয়া বলিল,দূর বোকা—সে হল লেমনেড়—সেই পানের দোকানে তো?…তোর ঠাণ্ডা লেগেছিল বলে তোকে দিই নি।…খাওয়াব তোকে একদিন, ও একরকম মিষ্টি শরবৎ। দূর–
কাজলের কাছে অনেক ব্যাপার পবিষ্কার হইয়া গেল। কলিকাতায় আসিয়া সে দেখিয়া অবাক হইয়া গিয়াছিল যে এখানে মোড়ে মোড়ে মদের দোকান-পান ও মদ এক্সঙ্গে বিক্রয় হয় প্রায় সর্বত্র। সোডা লেমনেড সে কখনও দেখে নাই ইহার আগে, জানিত না-কি করিয়া সে ধরিয়া লইয়াছে বোতলে ওগুলো মদ। তাই তো সেদিন বাবাকে খাইতে দেখিয়া অবাক হইয়া গিয়াছিল— এত দিন লজ্জায় বলে নাই। সেই দিনই অপু তাহাকে লেমনেড খাওয়াইয়া তাহার ভ্রম ঘুচাইয়া দিল।
এই অবস্থায় একদিন সে বিমলেন্দুর পত্র পাইল, একবার আলিপুরে লীলার ওখানে পত্রপাঠ আসিতে। লীলার ব্যাপার সুবিধা নয়। তাহারও আর্থিক অবস্থা বড়ো শোচনীয়। নিজের যাহা কিছু ছিল গিয়াছে, আর কেহ দেয়ও না, বাপের বাড়িতে তাহার নাম করিবার পর্যন্ত উপায় নাই। ইদানীং তাহার মা কাশী হইতে তাহাকে টাকা পাঠাইতেন। বিমলেন্দু নিজের খরচ হইতে বাঁচাইয়া কিছু টাকা দিদির হাতে দিয়া যাইত। তাহার উপর মুশকিল এই যে, লীলা বড়োমানুষের মেয়ে, কষ্ট করা অভ্যাস নাই, হাত ছোট করিতে জানে না।
এই রকম কিছুদিন গেল। লীলা যেন দিন দিন কেমন হইয়া যাইতেছিল। অমন হাস্যমুখী শীলা, তাহার মুখে হাসি নাই, মনমরা বিষয় ভাবাশরীরও যেন দিন দিন শুকাইয়া যাইতে থাকে। গত বর্ষাকাল এইভাবেই কাটে, বিমলেন্দু পূজার সময় পীড়াপীড়ি করিয়া ডাক্তার দেখায়। ডাক্তারে বলেন, থাইসিসের সূত্রপাত হইয়াছে, সতর্ক হওয়া দরকার।
বিমলেন্দু লিখিয়াছে-লীলার খুব জ্বর। ভুল বকিতেছে, কেহই নাই, সে একা ও একটি চাকর সারারাত জাগিয়াছে, আত্মীয়স্বজন কেহ ডাকিলে আসিবে না, কি করা যায় এ অবস্থায়। অপু এখানে আজকাল তত আসিতে পারে না, অনেকদিন লীলাকে দেখে নাই। লীলার মুখ যেন রাঙা, অস্বাভাবিকভাবে রাঙা ও উজ্জ্বল দেখাইতেছে।
