অপুর গলায় যেন একটা ডেলা আটকাইয়া গেল। সে যতদূর সম্ভব সহজ সুরে বলিল-এ ধরনের কথা সে এ পর্যন্ত কোনো দিন লীলার কাছে বলে নাই, কোনও দিন না-দ্যাখো লীলা, অন্য লোকের কথা জানি নে, তবে আমার কথা শুনবে?…আমি তোমাকে আমার চেয়ে অনেক বড়ো তো ভাবিই—অনেকের চেয়ে বড়ো ভাবি-তোমাকে কেউ চেনে নি, চিনলে না, এই কথা ভাবি।আজ নয় লীলা, এতটুকু বেলা থেকে তোমায় আমি জানি, অন্য লোকে ভুল করতে পারে, কিন্তু আমি
লীলা যেন অবাক হইয়া গেল, কখনও সে এরকম দেখে নাই অপুকে। সে জিজ্ঞাসা করিতে যাইতেছিল—সত্যি বলছ? কিন্তু অপুর মুখ দেখিয়া হয়তো বুঝিল প্রশ্নটা অনাবশ্যক। পরক্ষণেই খেয়ালী অপু আর একটা কাজ করিয়া বসিল—এটাও সে ইহার আগে কখনও করে নাই-লীলার খুব কাছে সরিয়া গিয়া তার ডান হাতখানা নিজের দুহাতের মধ্যে লইয়া লীলাকে নিজের দিকে টানিয়া তার মুখ ফিরাইল। পরে গভীর স্নেহে তার উত্তপ্ত ললাটে, কানের পাশের চূর্ণ কুন্তলে হাত বুলাইতে বুলাইতে দৃঢ়স্বরে বলিল-তুমি আমি ছেলেবেলার সাথী, লীলা—আমরা কেউ কাউকে ভুলব নাকোনো অবস্থাতেই না। এতদিন ভুলি নি-ও কখনও লীলা।
লীলার সারাদেহ শিহরিয়া উঠিল…যাহা আজ অপুর মুখে, কথার সুরে ডাগর চোখের অকপট দৃষ্টিতে পাইল—জীবনে কোনো দিন কাহারও কাছ হইতে তাহা সে কখনও পায় নাই—আজ সে দেখিল অপুকে সে চিরকাল ভালোবাসিয়া আসিয়াছে–বিশেষ করিয়া অপুর মাতৃবিয়োগের পর লালদীঘির সামনের ফুটপাতে তাকে যেদিন শুল্কমুখে নিরাশ্রয় ভাবে বেড়াইতে দেখিয়াছিল— সেদিনটি হইতে।
…অপুর চমক ভাঙিল লীলা কখন তাহার বক্ষে মুখ লুকাইয়াছিল—তাহার অশ্রুপ্লাবিত পাণ্ডুর মুখখানি।…
অপু বাহিরে চলিয়া আসিলসে অনুভব করিতেছিল, লীলার মতো সে কাহাকেও ভালোবাসে না—সেই গভীর অনুকম্পামিশ্রিত ভালোবাসা, যা মানুষকে সব ভুলাইয়া দেয়, আত্মবিসর্জনে প্রণোদিত করে।
লীলাকে যে করিয়া হউক সে সুখী করিবে। লীলাকে এতটুকু কষ্টে পড়িতে দিবে না; নিজেকে ছোট ভাবিতে দিবে না। যাহার ইচ্ছা লীলাকে ছাড়ুক, সে লীলাকে ছাড়িতে পারিবে না। সে লীলাকে কোথাও লইয়া যাইবেই—এ অবস্থায় কলিকাতায় থাকিলে লীলা বাঁচিবে না। বিশ্ব একদিকে-লীলার মুখের অনুরোধ আর একদিকে।
সারাপথ ভাবিতে ভাবিতে ফিরিল।
দিন তিনেক পরে।
বেলা আটটা। অপু সকালে স্নান সারিয়া কাজলকে সঙ্গে করিয়া বেড়াইতে বাহির হইবেএমন সময়ে মিঃ লাহিড়ীর ছোট নাতি অরুণ ঘরে ঢুকিল—এককোণে ডাকিয়া লইয়া চুপি চুপি উত্তেজিত সুরে বলিল-শিগগির আসুন, দিদি কাল রাত্রে বিষ খেয়েছে।
বিষ। সর্বনাশ।—শীলা বিষ খাইয়াছে।
কাজলকে কি করা যায়?-খোকা তুই বরং-ঘরে থাক একা। আমি একটা কাজে যাচ্ছি। দেরি হবে ফিরতে।
কিন্তু কাজলের চোখে ধুলা দেওয়া অত সহজ নয়। কেন বাবা? কি কাজ? কোথায়? কত দেরি হইতে পারে?…কোনোমতে ভুলাইয়া তাহাকে রাখিয়া দুজনে ট্যাক্সি ধরিয়া লীলার বাসায় আসিল। আরও দুখানা মোটর দাঁড়াইয়া আছে। ঢুকিতেই লীলাদের বাড়ির ডাক্তার বৃদ্ধ কেদারবাবুর সঙ্গে দেখা। অরুণ ব্যস্তসমস্ত ভাবে জিজ্ঞাসা করিলকি অবস্থা এখন?
কেদারবাবু বলিলেন—অবস্থা তেমনি। আর একটা ইনজেকশান করেছি। হিলকক সাহেব এলে যে বুঝতে পারি। অপুর প্রশ্নের উত্তরে বলিলেন-বড় স্যাড ব্যাপার-বড় স্যাড। জিনিসটা? মরফিয়া। রাত্রে কখন খেয়েছে, তা তত বোঝা যায় নি, আজ সকালে তাও বেলা হলে তবে টের পাওয়া গেল। কর্নেল হিলকককে আনতে লোক গিয়েছে তিনি না আসা পর্যন্ত
অরুণের সঙ্গে সঙ্গে উপরের সেই ঘরটাতে গেল—মাত্র দিন তিনেক আগে যেটাতে বসিয়া সে লীলাকে গান শুনাইয়া গিয়াছে। প্রথমটা কিন্তু সে ঘরে ঢুকিতে পারিল না, তাহার হাত কঁপিতেছিল, পা কাঁপিতেছিল। ঘরটা অন্ধকার, জানালার পর্দাগুলো বন্ধ, ঘরে বেশি লোক নাই, কিন্তু বারান্দাতে আট-দশজন লোক। সবাই পদ্মপুকুরের বাড়ির সবাই চুপি চুপি কথা কহিতেছে, পা টিপিয়া টিপিয়া হাঁটিতেছে। কিছু বিশেষ অস্বাভাবিক ব্যাপার ঘটিয়াছে এখানে, এমন বলিয়া কিন্তু অপুর মনে হইল না। অথচ একজন-যে পৃথিবীর সুখকে এত ভালোবাসিত, আকাঙ্ক্ষা করিত, আশা করিতউপেক্ষায় মুখ বাঁকাইয়া পৃথিবী হইতে ধীরে ধীরে বিদায় লইতেছে।
সেদিনকার সেই জানালার পাশের খাটেই লীলা শুইয়া। সংজ্ঞা নাই, পাণ্ডুর, কেমন যেন বিবর্ণ ঠোঁট ঈষৎ নীল। একখানা হাত খাটের বাহিরে ঝুলিতেছিল—সে তুলিয়া দিল। গায়ে রেশমের বরফি কাটা বিলাতী লেপ। কি অপূর্ব যে দেখাইতেছে লীলাকে! …মরণাহত মৃত্যুপার মুখের সৌন্দর্য যেন এ পৃথিবীর নয়—কিংবা হরিদ্রাভ হাতির দাঁতে খোদাই মুখ যেন। দেবীর মতো সৌন্দর্য আরও অপার্থিব হইয়া উঠিয়াছে।
তাহার মনে হইল লীলা ঘামিতেছে। তবে বোধ হয় আর ভয় নাই, বিপদ কাটিয়া গিয়াছে। চুপি চুপি বলিল-ঘামছে কেন?
ডাক্তারবাবু বলিলেন—ওটা মরফিয়ার সিম্টম্।
মিনিট দশ কাটিল। অপু বাহিরের বারান্দাতে আসিয়া দাঁড়াইল। পাশের ঘবে লোকেরা একবার ঢুকিতেছে, আবার বাহির হইতেছে, অনেকেই আসিয়াছে, কেবল মিঃ লাহিড়ী ও লীলার মা নাই। মিঃ লাহিড়ী দার্জিলিং-এ, লীলার মা মাত্র কাল এখান হইতে বর্ধমানে কি কাজে গিয়াছেন। লীলা সত্যই অভাগিনী!
এমন সময় নিচে একটা গোলমাল। একখানা গাড়ির শব্দ উঠিল। ডাক্তার সাহেব আসিয়াছেন—তিনি উপরে উঠিয়া আসিলেন, পিছনে কেদারবাবু ও বিমলেন্দু। অনেকেই ঘরে ঢুকিতে যাইতেছিল, কেদারবাবু নিষেধ করিলেন। মিনিট সাতেক পরে ডাক্তার সাহেব চলিয়া গেলেন। বলিয়া গেলেন—Too late, কোনও আশা নাই।
