সরকার বাড়ি হইতে ফিরিতে একটু বেলা হইয়া গেল। উঠানে পা দিয়া ডাকিল–ও খোক–কাজল দুপুরে ঘুমাইতেছিল, কখন ঘুম ভাঙিয়া উঠিয়াছে এবং তেলি-বাড়ি হইতে আঁকশি জোগাড় করিয়া আনিয়া উঠানের গাছের চাপা ফুল পাড়িবার জন্য নিচের একটা ডালে আঁকশি বাধাইয়া টানাটানি করিতেছে।
দৃশ্যটা তাহার কাছে অদ্ভুত মনে হইল। অপর্ণার পোঁতা সেই চাপাফুল গাছটা। কবে তাহার ফুল ধরিয়াছে, কবে গাছটা মানুষ হইয়াছে, গত সাত বৎসরের মধ্যে অপুর সে খোঁজ লওয়ার
অবকাশ ছিল না—কিন্তু কেমন করিয়া
সে বলিল-খোকা ফুল পাড়ছিস তো, গাছটা কে পুঁতেছিল জানিস?
কাজল বাবার দিকে চাহিয়া হাসিয়া বলিল—–তুমি এসো না বাবা, ওই ডালটা চেপে ধরো না। মোট দুটো পড়েছে।
অপু বলিলকে পুঁতেছিল জানিস গাছটা? তোর মা।
কিন্তু মা বলিলে কাজল কিছুই বোঝে না। জ্ঞান হইয়া অবধি সে দিদিমা ছাড়া আর কাহাকেও চিনিত না, দিদিমাই তাহার সব। মা একটা অবাস্তব কাল্পনিক ব্যাপার মাত্র। মায়ের কথায় তার মনে কোনও বিশেষ সুখ বা দুঃখ জাগায় না।
অনেকদিন পরে মনসাপোতা আসা। সকলেই বাড়িতে ডাকে, নানা সদুপদেশ দেয়। ক্ষেত্র কাপালি অপুকে ডাকিয়া অনেকক্ষণ কথাবার্তা কহিল, দুধ পাঠাইয়া দিল–ঘর ছাইবার জন্য ভড়েরা একগাড়ি উলুখড় দিতে চাহিল।
রাত্রে আবার কি কাজে সরকার-বাড়ির সামনের পথ দিয়া আসিতে হইল। বাড়িটার দিকে যেন চাওয়া যায় না। গোটা মনসাপোতাটা নিরুদির অভাবে ফাঁকা হইয়া গিয়াছে তাহার কাছে। নিরুদি, আজ খোকাকে নিয়ে এসেছি, তুমি এসে ওকে দেখবে না, আদর করবে না, খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেবে না?
রাত্রে অপু আর কিছুতেই ঘুমাইতে পারে না। চোখের সামনে নিরুপমার সেই হাসি-হাসি মুখ, সেই অনুযোগের সুর কানে। আর একটি বার দেখা হয় না তাহার সঙ্গে?
কাজলকে সে কলিকাতায় লইয়া আসিল পরদিন বৈকালের ট্রেনে। সন্ধ্যার পর গাড়িখানা শিয়ালদহ স্টেশনে ঢুকিল। এত আলো, এত বাড়িঘর, এত গাড়িঘোড়া–কি কাণ্ড এ সব! কাজল বিস্ময়ে একেবারে নির্বাক হইয়া গেল। সে শুধু বাবার হাত ধরিয়া চারিদিকে ডাগর চোখে চাহিতে চাহিতে চলিল।
হ্যারিসন রোডের বড়ো বড়ো বাড়িগুলা দেখাইয়া একবার সে বলিল—ওগুলো কাদের বাড়ি, বাবা? অত বাড়ি?
আবার বাসাটায় ঢুকিয়া কাপড়-চোপড় ছাড়িয়া সে গলির মোড়ে দাঁড়াইয়া বড়ো রাস্তার গাড়িঘোড়া দেখিতে লাগিল। অবাক-জলপান জিনিসটা কি? বাবার দেওয়া দুটা পয়সা কাছে ছিল, এক পয়সার অবাক-জলপান কিনিয়া খাইয়া সে সত্যই অবাক হইয়া গেল। মনে হইল, এমন অপূর্ব জিনিস সে জীবনে আর কখনও খায় নাই। চাল-ছোলা ভাজা সে অনেক খাইয়াছে। কিন্তু কি মশলা দিয়া ইহারা তৈরি করে এই অবাক-জলপান?
অপু তাহাকে ডাকিয়া বাসার মধ্যে লইয়া গেল—ওরকম একলা কোথাও যাস নে খোকা। হারিয়ে যাবি, কি, কি হবে। যাওয়ার দরকার নেই।
কাজলের দুঃস্বপ্ন কাটিয়া গিয়াছে। আর দাদামশায়ের বকুনি খাইতে হইবে না, একা গিয়া দোতলার ঘরে রাত্রিতে শুইতে হইবে না, মামিমাদের ভয়ে পাতের প্রত্যেক ভাতটি খুটিয়া গুছাইয়া খাইতে হইবে না। একটি ভাত পাতের নিচে পড়িয়া গেলে বড়ো মামিমা বলিত—পেয়েছ পরের, দেদার ফেলল আর ছড়াও-বাবার অন্ন তো খেতে হল না কখনও?
ছেলেমানুষ হইলেও সব সময় এই বাবার খোঁটা কাজলের মনে বাজিত–
অপু বাসায় আসিয়া দেখিল, কে একখানা চিঠি দিয়াছে তাহার নামে—অপরিচিত হস্তাক্ষর। আজ পাঁচ-ছয় দিন পত্ৰখানা আসিয়া চিঠির বাক্সে পড়িয়া আছে। খুলিয়া পড়িয়া দেখিল একজন অপরিচিত ভদ্রলোক তাহাকে লিখিতেছেন তাহার বই পড়িয়া মুগ্ধ হইয়াছেন, শুধু তিনি নহেন, তাঁহার বাড়িসুদ্ধ সবাই-প্রকাশকের নিকট হইতে ঠিকানা জানিয়া এই পত্র লিখিতেছেন, তিনি তাহার সহিত দেখা করিতে চাহেন।
দু-তিনবার চিঠিখানা পড়িল। এতদিন পরে বোঝা গেল যে, অন্তত একটি লোকেরও ভালো লাগিয়াছে তাহার বইখানা!…
পরের প্রশংসা শুনিতে অপু চিরকালই ভালোবাসে, তবে বহু দিন তাহার অদৃষ্টে সে জিনিসটা জোটে নাই-প্রথম যৌবনের সেই সরল হামবড়া ভাব বয়সের অভিজ্ঞতার ফলে দূর হইয়া গিয়াছিল, তবুও সে আনন্দের সহিত বন্ধুবান্ধবের নিকট চিঠিখানা দেখাইয়া বেড়াইল।
পরের দিন কাজল চিড়িয়াখানা দেখিল, গড়ের মাঠ দেখিল। মিউজিয়ামের অধুনালুপ্ত সেকালের কচ্ছপের প্রস্তরীভূত বৃহৎ খোলা দুটি দেখিয়া সে অনেকক্ষণ অবাক হইয়া চাহিয়া দাঁড়াইয়া কি ভাবিল। পরে অপু ফিরিয়া যাইতেছে, কাজল বাবার কাপড় ধরিয়া টানিয়া দাঁড় করাইয়া বলিল— শোনো বাবা!-কচ্ছপ দুটোর দিকে আঙুল দিয়া দেখাইয়া বলিল–আচ্ছা, এ দুটোর মধ্যে যদি যুদ্ধ হয় তবে কে জেতে বাবা?…
অপু গম্ভীর মুখে ভাবিয়া ভাবিয়া বলে—ওই বাঁ দিকেরটা জেতে।-কাজলের মনের দ্বন্দ্ব দূর হয়।
কিন্তু গোলদিঘিতে মাছের ঝাক দেখিয়া সে সকলের অপেক্ষা খুশি। এত বড়ো বড়ো মাছ আর এত একসঙ্গে! মেলা ছেলেমেয়ে মাছ দেখিতে জুটিয়াছে বৈকালে, সেও বাবার কথায় এক পয়সার মুড়ি কিনিয়া জলে ছড়াইয়া দিয়া অধীর আগ্রহে মাছের খেলা দেখিতে লাগিল।
-তুমি ছিপে ধরবে বাবা? কত বড়ো বড়ো মাছ?
অপু বলিল—চুপ চুপ–-ও মাছ ধরতে দেয় না।
ফুটপাতে একজন ভিখারি বসিয়া। কাজল ভয়ের সুরে বলিল—শিগগির একটা পয়সা দাও বাবা, নইলে ছুঁয়ে দেবে।—তাহার বিশ্বাস, কলিকাতার যেখানে যত ভিখারি বসিয়া আছে ইহাদেব পয়সা দিতেই হইবে, নতুবা ইহারা আসিয়া দুইয়া দিবে, তখন তোমাকে বাড়ি ফিবিয়া স্নান করিতে হইবে-সে এক মহা হাঙ্গামা।
