সোম ও মঙ্গলবার দুটি, ট্রেনে স্টিমারে বেজায় ভিড়। খুলনার স্টিমার এবারও ফেল করিল। শ্বশুরবাড়ি পৌঁছিতে বেলা দুপুর গড়াইয়া গেল।
নৌকা হইতে দেখে কাজল ঘাটে হার অপেক্ষায় হাসিমুখে দাঁড়াইয়া-নৌকা থামিতে-নাথামিতে সে ছুটিয়া আসিয়া তাহাকে জড়াইয়া ধরিল। মুখ উঁচু করিয়া বলিল—বাবা, আমার আরব্য উপন্যাস?-অপু সেকথা একেবারেই ভুলিয়া গিয়াছে। কাজল কঁাদকঁদ সুরে বলিল-উ-বাবা, এত করে লিখলাম, তুমি ভুলে গেলে-লণ্ঠন? অপু বলিল,-আচ্ছা তুমি পাগল নাকি লণ্ঠন কি করবি?–কাজল বলিল, সে লণ্ঠন নয় বাবা!…হাতে ঝুলানো যায়, রাঙা কাচ, সবুজ কাচ বের করা যায় এমনি ধারা। ইউ, তুমি আমার কোন কথা শোনো না। একটা আরশি আনবে বাবা?
–আরশি?-কি করবি আরশি?
—আমি আরশিতে ছিয়া দেখবো—
অপর্ণার দিদি মনোরমা অনেকদিন পরে বাপের বাড়ি আসিয়াছেন। বেশ সুন্দরী, অনেকটা অপর্ণার মতো মুখ। ছোট ভগ্নীপতিকে পাইয়া খুব আহ্লাদিত হইলেন, স্বর্ণগত মা ও বোনের নাম করিয়া চোখের জল ফেলিলেন। অপু তাহার কাছে একটা সত্যকার স্নেহ-ভালোবাসা পাইল। সন্ধ্যাবেলা অপু বলিল—আসুন দিদি, ছাদের উপর বসে আপনার সঙ্গে একটু গল্প করি।
ছাদ নির্জন, নদীর ধারেই, অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায়।
অপু বলিল–আমার বিয়ের রাতের কথা মনে হয় মনোরমাদি?
মনোরমা মৃদু হাসিয়া বলিলেন-সেও যেন এক স্বপ্ন। কোথা থেকে কি যেন সব হয়ে গেল ভাইএখন ভেবে দেখলে—সেদিন তাই এই ছাদের উপর বসে অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিলুম-তোমাকেও তো আমি সেই বিয়ের পর আর কখনও দেখি নি। এবার এসেছিলাম ভাগ্যিস, তাই দেখাটা হল।
হাসির ভঙ্গি ঠিক অপর্ণাব মতে, মুখের কত কি ভাব, ঠিক তাহারই মতো—বিস্মৃতির জগৎ হইতে সে-ই যেন আবার ফিরিয়া আসিয়াছে।
মনোমা অনুযোগ করিয়া বলিলেন-তুমি তো দিদি বলে খোঁজও করো না ভাই। এবার পুজোর সময় বরিশালে যেয়ো–বলা রইল, মাথার দিব্যি। আর তোমার ঠিকানাটা আমায় লিখে দিয়ো তো।
কোথা হইতে কাজল আসিয়া বলিল—বাবা একটা অর্থ জানো?…
–অর্থ? কি অর্থ?
কাজলের মুখ তাহার অপূর্ব সুন্দর মনে হয়-কেমন একধরনের ঘাড় একধারে বাঁকাইয়া চোখে খুশির হাসি হাসিয়া কথাটা শেষ কবে, আবার তখন বোকাব মতোই হাসে-হঠাৎ যেন মুখখানা করুণ ও অপ্রতিভ দেখায়। ঠিক এই সময়েই অপুর মনে ওই স্নেহের বেদনাটা দেখা দেয় কাজলের ওই ধরনের মুখভঙ্গিতে।
–বলো দেখি, বাবা, এখান থেকে দিলাম সাড়া, সাড়া গেল সেই বামুনপাড়া? কি অর্থ?
অপু ভাবিয়া ভাবিয়া বলিল-পাখি।
কাজল ছেলেমানুষি হাসির খই ফুটাইয়া বলিল, ইল্লি! পাখি বুঝি? শাক তো—শাঁকের ডাক। তুমি কিছু জানো না বাবা।
অপু বলিল—ছিঃ বাবা, ওরকম ইল্লি-টিল্লি বোলো না, বলতে নেই ও-কথা, ছিঃ।
-কেন বলতে নেই বাবা?…
-ও ভালো কথা নয়।
আসিবার আগের দিন রাত্রে কাজল চুপি চুপি বলিল–এবার আমায় নিয়ে যাও বাবা, আমার এখানে থাকতে একটুও ভালো লাগে না।
তঅপু ভাবিল–নিয়েই যাই এবারে, এখানে ওকে কেউ দেখে না, তাছাড়া লেখাপড়াও এখানে থাকলে যা হবে!
পরদিন সকালে ছেলেকে লইয়া সে নৌকায় উঠিল। অপর্ণার তোরঙ্গ ও হাতবাক্সটা এখানে আট-নয় বৎসর পড়িয়া আছে, তাহার বড় শালী সঙ্গে দিয়া দিলেন। ইহাদের তুলিয়া দিতে আসিয়া ঘাটে দাঁড়াইয়া চোখের জল ফেলিলেন। অপুকে বার বার বরিশালে যাইতে অনুরোধ করিলেন। সকালের নবীন বোদ ভাঙা নাটমন্দিরের গায়ে পড়িয়াছে। নদীজল হইতে একটা আমিষ গন্ধ আসিতেছে। শশুর মহাশয়ের তামাক খাওয়ার কয়লা পোড়ানোর জন্য শুকনা ডালপালায় আগুন দেওয়া হইয়াছে নদীর ধারটাতেই। কুণ্ডলী পাকাইয়া ধোঁয়ার রাশ উপরে উঠিতেছে। সকালের বাতাসটা বেশ ঠাণ্ডা। আজ বহু বৎসর আগে যেদিন বন্ধু প্রণবের সঙ্গে বিবাহের নিমন্ত্রণে এ বাটী আসিয়াছিল তখন সে কি ভাবিয়াছিল এই বাড়িটার সহিত তাহার জীবনে এমন একটি অদ্ভুত যোগ সাধিত হইবে, আজও সেদিনটার কথা বেশ স্পষ্ট মনে হয়। মনে আছে, আগের দিন একটা গ্রামোফোনের দোকানে গান শুনিয়াছিল—বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি। শুনিয়া গানটা মুখস্থ করিয়াছিল ও সারাপথে ও স্টিমারে আপন মনে গাহিয়াছিল। এখনও গুন্ গুন্ করিয়া গান গাহিলে সেই দিনটা আবার ফিরিয়া আসে।
ছেলেকে সঙ্গে লইয়া অপু প্রথমে মনসাপোতা আসিল। বছর ছয়-সাত এখানে আসা ঘটে নাই। এই সময়ে দিনকয়েকের ছুটি আছে, এইবার একবার না দেখিয়া গেলে আর আসা ঘটিবে না অনেকদিন।
ঘরদোরের অবস্থা খুব খারাপ। অপুর মনে পড়িল, ঠিক এই রকম অপরিষ্কার ভাঙা ঘরে এই বালকের মাকে সে একদিন আনিয়া তুলিয়াছিল। তেলিদের বাড়ি হইতে চাবি আনিয়া ঘরের তালা খুলিয়া ফেলিল। খড় নানাস্থানে উড়িয়া পড়িয়াছে, ইঁদুরের গর্ত, পাড়ার গরু-বাছুর উঠিয়া দাওয়া ভাঙিয়া নষ্ট করিয়া ফেলিয়াছে, উঠানে বনজঙ্গল।
কাজল চারদিকে চাহিয়া চাহিয়া অবাক হইয়া বলিল-বাবা, এইটে তোমাদের বাড়ি!
অপু হাসিয়া বলিল-তোমাদের বাড়ি বাবা। মামার বাড়ির কোটা দেখেছ জন্মে অবধি, তাতে তো চলবে না, পৈতৃক সম্পত্তি তোমার এই।
সকালে উঠিয়া একটি খবরে সে স্তম্ভিত হইয়া গেল। নিরুপমা আর নাই। সে গত পৌষ মাসে তীর্থ করিতে গিয়াছিল, পথে কলেরা হয়, সেখানেই মারা যায়। নিরুপমার জ্যাঠা বৃদ্ধ সরকার মহাশয় বলিতেছেন—আর দাদাঠাকুর, তমরা লেখাপড়া শিখে দেশে তো আর আসবে না? মেয়েটার কথা মনে হলে আর অন্ন মুখে ওঠে না। হল কি জানো, বললে কুড়লের পাটে মেলা দেখতে যাব। তার তো জানো পুজো-আচ্চা এক বাতিক ছিল। পাড়ার সবাই যাচ্ছে, আমি বলি, তা যাও। ওমা, তিন দিন পর সকালে খবর এলো নিরু-মা মো-মরো, শান্তিপুবের পথে একটা দোকানে—কি সমাচার, না কলেরা। গেলুম সবাই ছুটে। পৌছুতে সন্ধে হয়ে গেল। আমরা যখন গেলুম তখন বারোধ হয়ে গিয়েছে, চিনতে পারলে, চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। দাদাঠাকুরমা আমার পাড়াসুদ্ধ সবারই উপকার করে বেড়াত—তুমি সবই জানোআর অসুখ দেখে সেই পাড়ার লোকই…যারা সঙ্গে ছিল, পথের ধারের একটা দোচালা ভাঙা ঘরে মাকে আমার ফেলে সবাই পালিয়েছে। পাশের দোকানীটা লোক ভালো—সেই একটু দেখাশুনা করেছে। চিকিৎসে হয়নি, পত্তরও হয়নি, বেঘোরে নিরু-মাকে হারাম।
